আগের মতো গৎবাঁধা নিয়মে ক্রিকেট খেললে হবে না

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক পেসার তালহা জুবায়ের ঢাকা লিগে কোচিং করাচ্ছেন প্রাইম ব্যাংককে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লিগের মান, বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পারফরম্যান্সসহ অনেক বিষয়েই তার সঙ্গে আলাপ করেছেন সামীউর রহমান

প্রশ্ন : গত মৌসুমে ছিলেন শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের কোচ, এবারে প্রাইম ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছেন। দুটো ভূমিকার মধ্যে পার্থক্যটা কেমন?

তালহা জুবায়ের : গতবারের শাইনপুকুর দলটা ভালো একটা দল ছিল, অভিজ্ঞ একটা দল ছিল, ভালো বাজেটের দল ছিল। তবে তার আগের শাইনপুকুর দলের কথা যদি চিন্তা করি আর এই বছরের প্রাইম ব্যাংক, তাহলে আকাশ পাতাল তফাৎ। তবে এই বছর যদি ঝামেলা না হতো, আমাদের খেলোয়াড় ছাড়তে না হতো, তাহলে শাইনপুকুর যে পর্যায়ের দল ছিল তাতে অন্যান্য দলকে হারাবার মতোই দল করেছিলাম। সে কারণেই বলব যে খুব একটা পার্থক্য নেই।

প্রশ্ন : আলাউদ্দিন বাবুর একটা অবিশ্বাস্য ইনিংস আপনাদের হারিয়ে দিয়েছে পারটেক্সের কাছে। ৭টা ছক্কা আর ৫ বাউন্ডারিতে ৩২ বলে ৭৮*, এ রকম ইনিংস বিপিএলে দেখা যায় না কেন?

তালহা : কাল (বৃহস্পতিবার) আমরা আলাউদ্দিন বাবুর একদম জোনে বল করেছি। আমরা চেঞ্জ অব পেস করিনি। আমাদের কার্যকারিতার ঘাটতি ছিল। আর বিকেএসপির মাঠটাও খুব একটা বড় না, একটা সাইডে হয়তো ৭০ গজ থাকে। অন্য দিকগুলোতে ৬০-৬১ গজ দূরেই বাউন্ডারি। বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটার থাকে, দলের একটা চাপ থাকে, মারতেই হবে এরকম একটা প্রবণতা থাকে। বাবু বিপিএলেও এমন করতে পারে, তবে সে এক্সট্রা অর্ডিনারি ব্যাটিং করেছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের পেস আক্রমণের উন্নতি নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। কিন্তু টুর্নামেন্টে আমাদের পেসারদের খুব ভালো বল করতে দেখা যায়নি। পেস বোলিং নিয়ে কি আত্মতৃপ্তি চলে এসেছে?

তালহা : একটা জিনিস দেখেন, স্কোরবোর্ডে প্রতিপক্ষকে রানের চাপে না রাখতে পারলে বোলিং দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব না। ভারত ও নিউজিল্যান্ড, ওরা যখন ব্যাটিং করেছে তখন কিন্তু তাসকিন ও নাহিদ রানাকে ঐ সমীহটা করেই তাদের ভালো বল ছেড়ে খেলেছে। ওদের বাড়তি আক্রমণাত্মকভাবে খেলতে দেখা যায়নি। বড় রান তাড়া করতে গেলেই প্রথম পাওয়ার প্লেতে বাড়তি আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়ে ব্যাট করতে হয়, তখন ভালো বলে চার্জ করতে গেলে ভুল করলে উইকেট পড়ে। প্রতিপক্ষের যেহেতু খুব বড় রান তোলার চাপ ছিল না, সে জন্য তারা নাহিদ রানা ও তাসকিনের ভালে ডেলিভারিগুলো দেখে খেলেছে। উইকেট না পেলেই যে ভালো বোলিং করেনি সেটা বলা যাবে না, তবে নতুন বলে পাওয়ার প্লেতে উইকেট বের করা এটা একটা বোলারের দায়িত্ব। পরে বোলিং করলে, প্রতিপক্ষকে রানের চাপে রাখতে না পারলে, ব্যাটসম্যান দেখে খেলার সুযোগ পায়। তবে আমাদের বোলারদের ভালো উইকেটে, মানে যেসব উইকেটে ব্যাটসম্যান সুবিধা পায় এ রকম উইকেটে আরও ভালো বোলিং করা উইকেট বের করা শিখতে হবে। ভালো বোলিং মানে এই নয় যে ইনসুইং আউটসুইং ইনকাটার আউট কাটার এসব করলাম, ভালো বোলিং বলতে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করা এবং সেই জায়গায় ক্রমাগত আক্রমণ করে যাওয়া। ধরলাম বিরাট কোহলির একটা দুর্বল জায়গা আছে, আমরা যেন টানা ঐ দুর্বল জায়গাতেই বল করে যাই। বোলিং পার্টনারশিপ হিসেবে দুই পাশ থেকেই একই রকম বোলিং হচ্ছে, তখন টানা ১০ বলে একটা ভুল হতে পারে। কিন্তু এ রকম যদি না হয়, হঠাৎ একটা দুইটা বল তার অস্বস্তির কারণ হয়, সেসব সে সামলে ফেলবে কারণে ব্যাটসম্যান নিজেও তো জানে কোনটা দুর্বল জায়গা। ফ্ল্যাট উইকেটে এভাবে জুটি বেঁধে বল করতে হবে, নিখুঁততা (অ্যাকিউরেসি) বাড়াতে হবে। ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করলেও যদি ব্যাটসম্যানকে অ্যাটাক না করা যায়, ব্যাটসম্যানের দুর্বল জায়গায় আঘাত না করা যায়, তাহলে উইকেট বের করা কঠিন হয়ে যায়।

প্রশ্ন : এখন টি-টোয়েন্টির প্রভাবে ওয়ানডেতে যেভাবে রান হচ্ছে, তাতে কি বোলারদের জন্য রান খরচের পাল্লাটা বেড়ে গেছে?

তালহা : উইকেটটা তো আসলে ব্যাটসম্যানের পক্ষে, বোলারদের জন্য কিছু নেই। এ রকম খেলায় কি হয়, প্রতিপক্ষ ৩০০ রান করলে আমাকেও ৩০১ রান করতে হবে। এ রকম উইকেটে কিন্তু কোনো দল ১০০ রানে  ম্যাচ জিতবে  না, জিতবে ১ রানে; ৫ রানে, ৭ রানে। অর্থাৎ খুব অল্প ব্যবধানে। এই অল্প রানে জেতানোই বোলার বা ফিল্ডারদের দায়িত্ব, এখান থেকেই চাপে ম্যাচ বের করতে হবে। এখন খেলাটা যেহেতু ব্যাটসম্যানদের দিকে ঝুঁকে গেছে, ব্যাটসম্যানদেরই বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রশ্ন : চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স কেমন দেখলেন, আপনার মূল্যায়ন কী?

তালহা : এখন নিয়মিত ৩০০-৩২০ রান করার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে ব্যাটসম্যানদের। এখন আর আগের মতো গৎবাঁধা নিয়মে ক্রিকেট খেললে হবে না। একজন দুজন ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স দিয়ে হবে না, পুরো দলীয় সংস্কৃতিতেই পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রশ্ন : তামিম ইকবাল বলেছিলেন, ঢাকা লিগ বাংলাদেশের ক্রিকেটের মেরুদন্ড। সেই মেরুদন্ডটা এখন কতটা মজবুত?

তালহা : সত্যি কথা যেটা, ঢাকা লিগ তো আমাদের  ক্রিকেটের প্রাণ। ঢাকা লিগটাই সবাই খেলে, এটাকেই যদি আমাদের আরও মানসম্মত করতে পারি। মাঠের সংকট, এই রোজার মধ্যে বিকেএসপি গিয়ে খেলা...। অনেকে বলে এখানে খেলার মান ভালো না,এখানে রান করলে বা উইকেট পেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে সাফল্য পায় না। আমাদের প্রিমিয়ার লিগের মানটা উন্নত করা তখনই সম্ভব যখন উইকেটগুলো ভালো হবে। আমাদের এই উইকেটে খেলেও যে পেসাররা এত ভালো করছে সেটা খুব বিরাট

একটা ব্যাপার। প্লেয়ার আসে তো এই জায়গা থেকেই ,আর কোথা থেকে আসবে। কিন্তু ভালো প্লেয়ার উঠে আসছে না।