৫৪ শতাংশ রেস্টুরেন্ট অগ্নিঝুঁকিতে

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ বহুতল ভবনে আগুন লাগে। এতে নিভে যায় ৪৬টি তাজা প্রাণ। এরপর সরকারি সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসলেও টনক নড়েনি রেস্টুরেন্ট মালিকদের। এখনো বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টে তৈরি হয়নি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। ফায়ার সার্ভিসের সবশেষ হিসাব বলছে, দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ রেস্টুরেন্ট অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এমন ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চলছে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টের কার্যক্রম।

২০২৪ সালে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে দেশের ৮৫৯টি রেস্টুরেন্ট পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৪২টি ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ ও ৪১৮টি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। ওই বছর সারা দেশে ১ হাজার ১৮১টি বহুতল ভবন পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস। তাদের তথ্যমতে, এর মধ্যে ৩৭ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুল-কলেজসহ ৭ হাজার ৫৬৮টি বাণিজ্যিক ভবনের মধ্যে ২ হাজার ৭৩১টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৫৪টি ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ।

গত বছর দেশজুড়ে অগ্নিকাণ্ডের নানাদিক নিয়ে তৈরি করা ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ৪০ শতাংশ হাসপাতাল ও ক্লিনিক, প্রায় ৩৯ শতাংশ মার্কেট ও শপিং মল, ৩২ শতাংশ শিল্পকারখানা এবং ১৮ শতাংশ গণমাধ্যম অফিস। তাছাড়া প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই। অগ্নিকাণ্ড রোধে অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি ১৪৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে ফায়ার সার্ভিস। এসব অভিযানে ১৪৯টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে সংস্থাটি। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিদর্শনের সময় ভবনের মাটির নিচের জলাধারের ধারণক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, ধোঁয়া ও তাপ শনাক্তকরণ যন্ত্রের উপস্থিতি, মেঝের আয়তন, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, লিফট ইত্যাদি খতিয়ে দেখে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পাওয়া ভবন কর্তৃপক্ষকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

এরপরও দেশের বিভিন্ন স্থানে বারবার ঘটছে অগ্নিদুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হলেও কদিন পর তা থেমে যায়। ফলে চট্টগ্রামের বিএম ডিপো কিংবা পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা, নিমতলী অথবা বেইলি রোডের বিভীষিকাময় রাতগুলো বারবার ফিরে আসছে। 

এরই মধ্যে গত ৩ মার্চ রাজধানীর শাহাজাদপুরে ‘সৌদিয়া হোটেলে’ অগ্নিকাণ্ডে চারজন প্রাণ হারান। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি কারওয়ান বাজারের ‘পেয়ারা কফি হাউজে’ আগুন লাগে। তাছাড়া সম্প্রতি মিরপুরের বাটা শোরুম, পল্টনের জামান টাওয়ার, কল্যাণপুর বস্তি, ভাসানটেক বিআরবি বস্তি, গাবতলীর শাহী মসজিদ বস্তি, কড়াইল বস্তি এবং রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালিতে আগুন লাগে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৯ হাজার ৬৯টি হয়েছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। তাছাড়া বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো থেকে ৪ হাজার, চুলা (ইলেকট্রিক, গ্যাস, মাটি) থেকে ৩ হাজার, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজে ৭০৪, গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজে ৪৬৫, কয়েলের আগুনে ৪৫৫, উত্তপ্ত ছাই থেকে ৭৩৫ এবং বাচ্চাদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে ৭৫৬টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

২০২৪ সালে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৬০২টি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। সবচেয়ে কম ৯৭১টি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে সিলেট বিভাগে। সারা দেশে বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটে ডিসেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে। গত বছর জানুয়ারিতে ২ হাজার ৫১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৭৩৭টি, মার্চে ৩ হাজার ৪২১টি, এপ্রিলে ৩ হাজার ৪২৬টি, মে’তে ২ হাজার ৬৮৬টি এবং ডিসেম্বর মাসে ২ হাজার ৩৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৪০ জন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তার সঙ্গে অনেক সংস্থা জড়িত। এসব সেবা-সংস্থার মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের ঘাটতি আছে। যথাযথ সমন্বয় ও আইনের প্রয়োগ না থাকায় অনেকেই অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘সংস্থাগুলোর মধ্যেও অনেক সময় ভীতি কাজ করে। কেননা বহুতল ভবনগুলোর মালিক সবাই প্রভাবশালী। কখন, কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কী হয়ে যায়, তাদের ভেতর এমন এক ধরনের চাপ কাজ করে। তবে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারকে কঠোর হতে হবে।’

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে আমরা মালিকদের চিঠি দিই। আমাদের কাজ সমস্যা চিহ্নিত করা, মানুষকে সচেতন করা।’

ফায়ার সার্ভিসের ওই প্রতিবেদনে অন্যান্য দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের পরিসংখ্যান এবং সংস্থাটির কার্যক্রম তুলে ধরা হয়েছে। সে অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৪০৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৮৪ জন মানুষ মারা গেছে। আহত হয়েছে ১ হাজার ২১৬ জন। তাছাড়া নদী ও পুকুরে ডুবে ৫২৬, লঞ্চ ও নৌকাডুবিতে ১২১, ট্রেন দুর্ঘটনায় ৩০, ভবন ধসে ৬, পাহাড় ধসে ১৬, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ২১, সেপটিক ট্যাংক বা স্যুয়ারেজ দুর্ঘটনায় ২৭ এবং লিফট দুর্ঘটনায় ৬ জনের মৃত্যু হয়।