চট্টগ্রামের হালদা এবং কর্ণফুলী নদীতে লবণাক্ততার আগ্রাসন বিগত দেড় দশক ধরে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এতে এই দুই নদীর জীববৈচিত্র্য, কৃষি, পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম শহরের ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের জীবন ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এই দুই নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধির পেছনে মানুষের কার্যকলাপ ও প্রাকৃতিক উভয়ই দায়ী।
মানুষের কার্যকলাপের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর উজানে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ, হালদা নদীর উজানে ভুজপুরে রাবার ড্যাম নির্মাণ, শাখা খালগুলোতে সøুইস গেট নির্মাণ, কৃষিকাজের জন্য ব্যাপকহারে পানি উত্তোলন, চট্টগ্রাম ওয়াসার অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন এবং নদীর নাব্য হ্রাস অন্যতম কারণ। এক হিসাব মতে শুষ্ক মৌসুমে হালদা নদী থেকে বিভিন্নভাবে প্রায় ৩০% পানি উত্তোলন করা হয়। এ দুই নদী জোয়ার-ভাটার নদী হওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি কম হওয়ায় এবং নদী থেকে পানি উত্তোলন করায় উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যায়। এ সময়ে ভাটির দিক থেকে আসা সাগরের লবণাক্ত পানি জোয়ারের আগ্রাসনে অনেক ভেতরে প্রবেশ করে বেড়ে যায় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়।
আর লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনচক্র ব্যাহত হয়। বিশেষ করে হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র এবং সাধু পানির একমাত্র প্রজাতি গাঙ্গেয় ডলফিনের আবাসস্থল সংকটের সম্মুখীন। লবণাক্ত পানি কৃষি জমিতে প্রবেশ করলে ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়। ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে পানীয় জলের সংকট, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততার কারণে এ বছর রমজান মাসে চট্টগ্রামের মানুষ পানির সংকট প্রবলভাবে উপলব্ধি করে। একই সাথে মৎস্য ও কৃষি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের লবণাক্ততা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বিশেষ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ, মৎস্য অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের পানি নিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেশনিং, নদীর গতিপথে পানির প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উজান অঞ্চলে কৃত্রিম জলাধার তৈরি এবং পানি প্রবাহ বৃদ্ধি সমাধানের উপায় হতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও সমন্বয়ক, হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।