৬৫ বছরে গভীরতা কমেছে ২১ ফুট

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬৫ বছরে এর পয়েন্ট ভেদে পলি জমে ৩-৭ মিটার (৯-২১ ফুট) পর্যন্ত গভীরতা কমেছে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ নিধন, জুমচাষ, বাগান, পাহাড় কাটা ও চাষ এবং পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কাপ্তাই হ্রদের ওপর। হ্রদ এলাকার শহর ও বাজারে স্থাপিত স’মিল, জেটি ঘাট, বাস-ট্রাক টার্মিনাল এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ আবাসিক এলাকার বর্জ্য ও আবর্জনা হ্রদে ফেলা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন স্থানে পলির মাত্রাও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আয়তন কমেছে কাপ্তাই হ্রদের। আনুষ্ঠানিকভাবে কাপ্তাই হ্রদ নিয়ে কোনো জরিপ না হলেও পরিবেশবাদীদের হিসেবে অন্তত কাপ্তাই হ্রদের আয়তন কমেছে ৭-৮ হাজার হেক্টর। এতে চাষাবাদ, মৎস্য সম্পদ, যোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।

কাপ্তাই হ্রদ যখন সৃষ্টি হয় তখন হ্রদের সর্বোচ্চ গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার। হ্রদের গড় গভীরতা ছিল ৯ মিটার এবং মৌসুম ভেদে গভীরতার তারতম্য ছিল ৮.১৪ মিটার। এর স্বাভাবিক জলায়তন ৫৮ হাজার ৩০০ হেক্টর, এর মধ্যে সর্বোচ্চ জলায়তন ৪৮ হাজার ৩০০ হেক্টর, সর্বোচ্চ ৬৮ হাজার ১০০ হেক্টর। কিন্তু বর্তমানে হ্রদের গভীরতা কমেছে প্রায় ৩-৭ মিটার। জলায়তন কমেছে অন্তত কয়েক হাজার হেক্টর।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে গ্লোবাল ভিলেজ। গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী বলেন, হ্রদ সৃষ্টির পর থেকেই নানা কারণে তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। হ্রদের একেক পয়েন্টে গভীরতা কমেছে ৩-৭ মিটার পর্যন্ত। আবার জলায়তন কমেছে অন্তত ৭-৮ হাজার হেক্টর। পানির ধারণক্ষমতা কমেছে। এতে চাষাবাদ, পানি সরবরাহ, পর্যটন, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ ও মৎস্য উৎপাদনসহ হ্রদকে ঘিরে গড়ে ওঠা সবক্ষেত্রে সংকট তৈরি হচ্ছে।

এদিকে বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে একটি ইউনিট চালু রেখে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এই কেন্দ্রের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪২ মেগাওয়াট। এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে গেলে জেলা সদরের সঙ্গে বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, লংগদু ও বিলাইছড়ি উপজেলার স্বাভাবিক নৌ যোগাযোগ ব্যাহত হয়। এতে পাঁচ উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগে পড়তে হয়।

বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক ও হ্রদ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ বলেন, কাপ্তাই হ্রদটিকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। হ্রদটির ড্রেজিংয়ের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তনয় ত্রিপুরা বলেন, কাপ্তাই হ্রদের নিচে কয়েকটি নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কাচালং, শলক ও রাইংক্ষ্যং নদী খনন করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদী খননের জন্য বিআরটিএ একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ের জমা দিয়েছে।

পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টিকালীন এক লাখ  বাস্তুচ্যুত মানুষ বসতি ও জীবিকার জন্য পাশর্^বর্তী পাহাড়গুলোতে বসবাস ও ব্যাপক হারে জুমচাষে লিপ্ত হয়। এর ফলে ব্যাপক হারে বন ধ্বংস ও মৃত্তিকাক্ষয়ের ফলে কাপ্তাই হ্রদে প্রতি বছর ব্যাপক পললায়ন হয়ে গভীরতা কমে যাচ্ছে। পাশর্^বর্তী জুমক্ষেত ও বাগান থেকে প্রতি বছর কাপ্তাই হ্রদে প্রায় দুই লাখ টন পলি সঞ্চিত হয়। এতে শুকনো মৌসুমে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া শহর সম্প্রসারণ কাপ্তাই হ্রদ ভরাট করে ট্রাক, বাস টার্মিনাল নির্মাণ, দালান নির্মাণের ফলে কমেছে হ্রদের আয়তন।