নানা থেকে জীবনসঙ্গী

বয়সের ব্যবধান, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা সমাজের প্রচলিত ধ্যান ধারণা সব কিছুকে পাশে ঠেলে এক ব্যতিক্রমী ভালোবাসার গল্প রচনা করলেন ৬৬ বছর বয়সী শরিফুল ইসলাম ও ২২ বছরের কলেজছাত্রী আইরিন আক্তার।

এক সময় যিনি ছিলেন ‘নানা’, এখন তিনিই জীবনসঙ্গী। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের রসুলগঞ্জের শরিফুল ইসলাম প্রধান ও কুচলিবাড়ির আইরিনের এই বিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন আলোচনার ঝড় তুলেছে, তেমনি প্রশ্ন তুলেছে সম্পর্কের নিয়ে।

চতুর্থ শ্রেণি থেকে পড়াশোনায় সাহায্য পাওয়া সেই নানাকে যখন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তে পাশে পেলেন, তখন আর পেছন ফিরে তাকাননি আইরিন। নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী এই তরুণী জানালেন, পড়াশোনার খরচ তো দিয়েছেনই, সবচেয়ে বড় কথা, উনি আমার পাশে ছিলেন সব সময়। আমি জানি, অন্য কোথাও বিয়ে হলে হয়তো আমার স্বপ্ন থেমে যেত।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার রসুলগঞ্জ কোটতলি এলাকার শরিফুল ইসলাম প্রধান একজন সাধারণ মানুষ। বয়স ৬৬। বিয়ে করেনি ৬৬ বছরেও। একাকীত্ব ছিল নিত্য সঙ্গী।

আর আইরিন আক্তার? এখন নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী, বয়স ২২। এক সময় পড়তেন স্থানীয় একটি স্কুলে। তখনই তার সঙ্গে পরিচয় হয় শরিফুলের। সম্পর্কটা 'নানা-নাতনি'র মতো। আইরিনের বাড়ি পাটগ্রামের কুচলিবাড়ি গ্রামে।

আইরিন বলেন, আমার পরিবারের অবস্থা ভালো ছিল না। চতুর্থ শ্রেণি থেকে উনিই আমাকে সহায়তা করে আসছেন। পড়াশোনার খরচ, বই, এমনকি কলেজে ভর্তি সবই উনি সামলেছেন।

শরিফুল এতটাই দায়িত্ব নিয়ে পাশে ছিলেন যে, মেয়েটির পড়াশোনা যাতে থেমে না যায়, সেজন্য তিনি ব্যাংকে ছয় লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন। তার লাভ দিয়েই চলছিল আইরিনের পড়াশোনা।

আইরিন বলেন, একটা সময় আইরিনের পরিবার তার বিয়ের চিন্তা শুরু করে। মেয়েটির মনে ভয়, বিয়ের পর হয়তো পড়াশোনা থেমে যাবে। হয়তো কেউই তাকে এমনভাবে বুঝবে না, পাশে থাকবে না, যেভাবে শরিফুল থেকেছেন। তখনই মনে হলো, যার সঙ্গে আমি সব সময় নির্ভার থাকতে পেরেছি, তিনিই যদি আমার জীবনসঙ্গী হন, তাহলে আমার স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকবে।

প্রথমে শরিফুল রাজি ছিলেন না। নিজেই অবাক হয়েছিলেন, দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু মেয়েটির দৃঢ়তা আর আন্তরিকতা তাকে চুপ করিয়ে দেয়। শেষমেষ পারিবারিক সম্মতিতে ২২ মার্চ বিয়ে হয়।

তাদের বিয়ের ছবি, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় আলোচনা। কেউ বলেন, এটা ভালোবাসা নয়, সুযোগের ব্যবহার। অনেকে বলেন, উনাকে দেখে সত্যি মনে হয়েছে ভালোবাসার বয়স নেই। এই সমাজে বয়স, রক্তের সম্পর্ক, প্রথা সবকিছু দিয়ে ভালোবাসাকে মাপা হয়। কিন্তু শরিফুল-আইরিনের গল্প যেন সে পরিমাপগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে।

শরিফুল বলেন, আমি কাউকে কষ্ট দিইনি, ঠকাইনি। সে আমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছে, আমি শুধু তাকে স্বীকৃতি দিয়েছি। এই গল্পকে অনেকে ‘দয়া’র গল্প ভাবতে পারেন। কিন্তু এখানেও আছে সম্মান, পরিণত বোঝাপড়া আর একসঙ্গে বাঁচার ইচ্ছা। ভালোবাসা সবসময় যেন গোলাপের মতো নয়। কখনও তা হয় পুরনো কাগজে মোড়ানো, সময়ের দাগে ক্ষয়প্রাপ্ত, কিন্তু তাতে গন্ধটা কমে না।

শরিফুল-আইরিনের গল্পও তেমন অনেক প্রশ্নের মুখে, অনেক দৃষ্টির আড়ালে। তবু তারা ঠিক বলছেন, এই গল্প আমাদের। অন্য কেউ বুঝুক না বুঝুক, আমরা জানি আমরা কাকে বেছে নিয়েছি। সমাজ বদলাচ্ছে। সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। একেকজনের ভালোবাসার অভিজ্ঞতা একেক রকম। হয়তো এই গল্প সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না, কিন্তু এটা একদমই সত্যি। শরিফুল-আইরিন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ভালোবাসা কোনো নির্ধারিত কোটায় আটকানো যায় না। আর ভালোবাসা যদি সম্মতিতে  হয়, যদি তার পেছনে থাকে আস্থা আর সম্মান তাহলে সেটাই হয়তো আসল প্রেমের ভাষা।