কম্পিউটার বিশ্লেষকের ছোঁয়ায় সফল আবাহনী

জাতীয় দলের তারকায় ঠাসা থাকত আবাহনীর স্কোয়াড। ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগের ম্যাচে দলটির বেঞ্চে যতজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার থাকতেন, অন্য ক্লাবগুলি দল গোছানোর সময়ও এতজনকে পেত না। তাই একপেশে টুর্নামেন্টে ধানমন্ডির ক্লাবটিই ফেভারিটের তকমা নিয়ে আসর শুরু করত। আর চ্যাম্পিয়ন হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করত। তবে ঢাক লিগের এবারের আসরের শুরুতে আকাশী-নীলদের সমর্থকরা খুব বেশি উচ্ছ্বসিত ছিলেন না।

জাতীয় দলের তারকাদের দল ছেড়ে যাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোহামেডান ও লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের মতো শক্তিশালী দল থাকার কারণে আবাহনীর সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দারুণভাবে সফল হয়েছে দলটি। লিগের আট রাউন্ড শেষে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে আবাহনী।

তাদের এই সাফল্যের পেছনে বড় অবদান রেখেছেন নতুন কোচ হান্নান সরকার। জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার ও নির্বাচক হিসেবে পরিচিত হান্নান এবারই প্রথম প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অধীনে দল কেবল সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে চলেছে তাই নয়, প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগে কম্পিউটার অ্যানালিস্ট নিয়োগের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

আধুনিক ক্রিকেটে তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত কোনো দল কম্পিউটার অ্যানালিস্ট নিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। হান্নান সরকারের পরিকল্পনায় এবার সেই চিত্র বদলেছে। দলটির অ্যানালিস্ট প্রতিপক্ষের দুর্বলতা ও শক্তির দিকগুলো বিশ্লেষণ করে সঠিক কৌশল সাজাতে সাহায্য করছেন, যা মাঠের লড়াইয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে আবাহনীর কোচ হান্নান সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম কোচিংয়ে আসলে প্রস্তুত হয়েই আসব। প্রিমিয়ার লিগ দিয়েই শুরু করায় চেয়েছিলাম একটু ব্যতিক্রমী হতে। সেই ভাবনা থেকেই দলে একজন কম্পিউটার অ্যানালিস্ট নেওয়া। যাকে নিয়ে আমি আলাদাভাবে কাজ করতে পারব। দেশে অ্যানালিস্টের অভাব আছে আবার কোন দলকে দেখবেন না যে কখনও অ্যানালিস্ট নিয়োগ দিচ্ছে। তাই আমি এই ব্যতিক্রমটা আনতে চেয়েছিলাম।’

ব্যাট-বলে শীর্ষস্থানে আবাহনী

আবাহনীর এই সাফল্যে ব্যাট হাতে উজ্জ্বল অবদান রেখেছেন বাঁহাতি ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন। ৮ ম্যাচে ৪১৩ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকার তৃতীয় স্থানে আছেন তিনি। তার ব্যাট থেকে এসেছে ২টি সেঞ্চুরি ও ২টি ফিফটি। সর্বোচ্চ ইনিংস ১২৬ রানের, আর গড় ৬৯-এর কাছাকাছি। অন্যদিকে, দলের স্পিনার রাকিবুল হাসান ৮ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের শীর্ষ বোলার।

সঠিক পরিকল্পনার ছোঁয়ায় তরুণদের উত্থান

জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটাররা দল ছেড়ে গেলেও অভিজ্ঞ মুমিনুল হক, মোহাম্মদ মিঠুন, মোসাদ্দেক হোসেনের নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার এবারের আবাহনীর প্রধান শক্তি। বিশেষ করে জাতীয় দলের তরুণ তারকা নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে এগিয়ে চলা দলটি অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে গড়ে তুলেছে দুর্দান্ত সমন্বয়। সঙ্গে কম্পিউটার অ্যানালিস্ট কাজ আরও সহজ হয়েছে।

কোচ হান্নান সরকারও মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে এগোনোর কারণেই দল সফল হচ্ছে। ‘আমরা অচেনা প্রতিপক্ষকে নিয়ে সহজেই পরিকল্পনা সাজাতে পারছি। ক্রিকেট এখন মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি অনেক বেশি বিশ্লেষণনির্ভর হয়ে গেছে। আমাদের অ্যানালিস্ট সেটির বড় সুবিধা দিচ্ছে,’ বলেন তিনি।

গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিসিবির পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন। আধুনিক ক্রিকেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে কম্পিউটার অ্যানালিস্টের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। আবাহনী সেই ঘাটতি পূরণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এবারের লিগ শিরোপা জিততে পারলে সেটাই হবে হান্নান সরকারের এই উদ্যোগের সেরা স্বীকৃতি। লিগের দ্বিতীয় পর্বেও তারা এই ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ট্রফির দৌড়ে অগ্রবর্তী থাকবে। ক্রিকেটে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন ও সঠিক পরিকল্পনার ছোঁয়ায় আবাহনী যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তা ভবিষ্যতে অন্যান্য দলগুলোর জন্যও পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে।