ভাঙাচোরা সাঁকোয় পারাপার নাওভাঙা চরবাসীর

জামালপুর পৌরসভার নাওভাঙা চরে এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। একটি বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে নদী পারাপার হতে হচ্ছে তাদের। সাঁকোটির বেশিরভাগই অংশই ভাঙা। তাই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন চরের বাসিন্দারা। 

জানা গেছে, স্থানীয় জনগণ তাদের প্রয়োজনে ২০০৮ সালে নিজেদের অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমে সাঁকোটি প্রথম তৈরি করেন। এরপর প্রতিবছরই এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

জামালপুর পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের আওতায় নাওভাঙা চর। পশ্চিমে শহরের প্রধান সড়ক, জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জজকোর্ট, সার্কিট হাউজসহ সরকারি অফিস, হাটবাজার। তবে সেখানে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় ব্রহ্মপুত্র নদ। পানি কম হলেও নদে নেই কোনো সেতু। ভাঙা বাঁশের সাঁকোই নাওভাঙা চরের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। এতে একদিকে যাতায়াতের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে যান চলাচল ও পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। দিনের পর দিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে চরের এক হাজারেরও বেশি পরিবার।

এদিকে জেনারেল হাসপাতালে জামালপুর, শেরপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও টাঙ্গাইল জেলার রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব পাশে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করতে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের।

এছাড়া নাওভাঙা চরের মানুষের প্রধান ভরসা কৃষি। তারা শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়েছেন। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা দিক বিবেচনা করে এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে বাঁশের দীর্ঘ সাঁকোটি তৈরি করে নিয়েছেন।

২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শহরের প্রধান সড়কে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ করেন। এতে বাদ যায়নি হাসপাতালের সামনের অবৈধ স্থাপনা। এরপর ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বপাড়ে নাওভাঙা চরে গড়ে ওঠে ফার্মেসি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিভিন্ন ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরে ব্যবসায়ী ও ওই চরের মানুষ নিজেদের অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর পুরাতন দীর্ঘ একটি বাঁশের সাঁকো। সাঁকোতে কাঠের পাটাতন। মাঝে মাঝে পাটাতন ভেঙে গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই চরের মানুষ, রোগী ও রোগীর স্বজনরা পায়ে হেঁটে সাঁকো পার হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও পায়ে হেঁটে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। সাবধানে চলাচল করছেন সবাই। কারণ, সাঁকোর ওপর থেকে পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন। একটু অন্যমনস্ক হলে যেকোনো সময় পড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে ওই গ্রামের মানুষ, রোগী ও রোগীর স্বজনদের দুর্ভোগের কথা বলে শেষ করা যাবে না।

নাওভাঙা চরের বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘গ্রামটা কৃষিনির্ভর। এ গ্রামে নানা রকমের কৃষিপণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষিপণ্যের সঠিক দাম পাওয়া যায় না। একটি সেতুর কারণে ওই গ্রামে তেমন কোনো উন্নয়নও হয়নি। গ্রামটা এখনো অবহেলিত। কোনোরকমে যাতায়াতের জন্য এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে বাঁশের দীর্ঘ সাঁকো তৈরি করে নিয়েছেন।’

হাসপাতালে রোগী নিয়ে এসেছেন জেলার ইসলামপুর উপজেলার ডিগ্রীরচর এলাকার সবুজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘রোগীর বিভিন্ন ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ওপার থেকে করতে হয়। সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। যাতায়াতে অনেক কষ্ট হয়। বহু বছর ধরে শুনি, এখানে সেতু হবে। কিন্তু সেতু আর হলো না।’

জামালপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালের সামনে যে বাঁশের সাঁকো এটা খুবই জনগুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এ সাঁকো দিয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। পৌরসভার পক্ষ থেকে এত টাকা দিয়ে সেতুটি করা সম্ভব না। তাই আমরা এলজিইডিকে অনুরোধ করব সেতুটি করে দেওয়ার জন্য।’