১১ বছর ধরে গরিব ও অসহায় হওয়ায় দিনাজপুর সদরের সুইহারী মাঝাডাঙ্গা এলাকার হিজরা পল্লীতে বসবাস করছিলেন আনিসা বেগম (৬৫)। ৩ বছর আগে স্বামী খায়রুল ইসলাম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর আনিসা বেগমের শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। বাইরে অন্যের বাড়িতে, কখনও ক্ষেতে কাজ করে যা পান তাই দিয়ে কোনও রকমে বাজার সদাই করে দিনাতিপাত করেন তিনি। মেয়ের বিয়ে হয়েছে, কিন্তু হঠাৎ করে মেয়ের স্বামীও অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে ৫ আগস্টের পরদিন হিজরা পল্লীতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। সেখানে থাকা ১২৫টি বাড়ির পাশাপাশি তার বাড়িটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, বাড়ির আসবাবপত্রসহ যাবতীয় লুটপাট করা হয়।
এমতাবস্থায় এখন তার মরার ওপর খরার ঘা’র মতো অবস্থা। যেখানে তার বাড়ি ছিল সেখানেই দুইপাশে কয়েকটি টি দিয়ে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করেন। এখন মেয়ের দুই ছেলে সন্তানকে নিয়ে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন তিনি। টানাটুনির সংসারে যেখানে থাকার জায়গাই নাই, সেখানে ঈদ যেন তার কাছে বিলাসিতার নাম।
কথা হলে তিনি বলেন, দুই নাতিকে নিয়ে দুই পাশে কয়েকটা টিন দিয়ে আমি থাকি। অনেক কষ্ট হয় থাকতে। শীত কাটিয়ে দিয়েছি এভাবে, গরমও এভাবে যাচ্ছে। এরমধ্যে একদিন ঝড়ের কবলেও পড়েছেন। কিন্তু করার কিছু নাই, এভাবেই থাকতে হবে।
শুধু আনিসা বেগমই নন, এইখানে বসবাস করা ১২৫টি পরিবারের একই অবস্থা। দিন আনে দিন খায় এই ধরনের পরিবারের প্রায় ৫ শতাধিক মানুষের বসবাস। যারা সবারই অবস্থা এমন যেন ঈদ তাদের কাছে কোনো আনন্দই বয়ে আনে না। ঈদের দিনে সেমাই, চিনি, দুধ কিংবা অন্য কিছু যে রেধে খাবেন সেই অবস্থাটুকুও নেই তাদের।
এমন অবস্থায় তাদের জন্য ২ টাকায় ঈদ উপহার নিয়ে হাজির হন দিনাজপুর রক্তদান সমাজকল্যাণ সংস্থা। সংস্থাটি ২ টাকার বিনিময়ে প্রতিজনকে দিয়েছেন ৫০০ গ্রাম সেমাই, ৫০০ গ্রাম চিনি, ২ প্যাকেট দুধ, ৫০০ গ্রাম মুড়ি, কিসমিস ও সাবান।
২ টাকার ঈদ উপহার পাওয়ার পর কথা হয় আনিসা বেগমের সাথে। তিনি বলেন, এখানে রাজুদের সংগঠন ২ টাকার বিনিময়ে আমাদের ঈদ উপহার দিয়েছে। সেমাই, চিনি, দুধ, মুড়িসহ যাবতীয় কিছু পেয়েছি। এটা দিয়েই ঈদের দিন রান্না করে নাতিদের নিয়ে খাব।
ওই এলাকার মানুষের জন্য সবার সহযোগিতায় শিক্ষার্থী, প্রশাসনসহ সবার কাছে গিয়েছেন মোছা. রেহেনা। তিনি বলেন, আমরা ভূমিহীন। এখানে ১২৫টি রুম আছে। প্রতিটি বাড়িতে ৩ জন, ৪ জন, ৫ জন, ৬ জন করে সদস্য আছে। আগস্টের ৬ তারিখে এখানে ভাঙচুর, লুটপাট হয়। আমাদের অনেক অভাব, পলিথিন দিয়ে ঢাকা দিয়ে বসবাস করছি। ঝড়-বৃষ্টি আসলে আমরা কিভাবে থাকব। আমাদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা প্রয়োজন, আমাদের থাকার জায়গা নাই। ৬ তারিখের পর জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা আমাদের কাছে এসেছে, খোঁজ-খবর নিয়েছেন। জেলা প্রশাসক চাল দিয়েছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। এখন সরকারের কাছে আবেদন আমাদের সহযোগিতা করার। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমরা অসহায় হয়ে আছি। আমরা ভাঙচুরের পর তিন দিন নদীর পানি খেয়েছি। কিন্তু এখন যে ঈদ করব তা পারছি না। আজকে আমাদের ২ টাকা দিয়ে ঈদের সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। আমরা খুশিমনে ঈদ করতে পারব।
সুফিয়া খাতুন বলেন, আমরা অসহায়, এখানে সবাই গরিব মানুষ। আমরা যে ঈদের ভালোমন্দ কিনে খাব সেই ক্ষমতা নাই। দুই টাকা দিয়ে আমরা যেটা পেয়েছে তাতে আমরা অনেক আনন্দিত। দুই টাকা দিয়ে সেমাই, চিনি, দুধ, কিসমিসসহ যাবতীয় জিনিস পেয়েছি। আমরা এখন আনন্দ করে ঈদ করব।
আনোয়ারের স্ত্রী রিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী দিনমজুর। কখনও কাজ থাকে, কখনও থাকে না। আমাদের খুবই কষ্ট। আমাদের আজকে ২ টাকার বিনিময়ে ঈদ সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। আমি খুবই খুশি। এটা দিয়ে আমাদের ঈদ ভালোই যাবে।
কথা হলে রক্তদান সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি রবিউল ইসলাম রাজু বলেন, ৫ আগস্টের পর এই এলাকার ১০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাবু করে কঠিন অবস্থায় জীবনযাপন করে এমনকি তারা নদীর পানি খেয়ে বেঁচে ছিল। আমরা সেই সময় থেকে যতটা সম্ভব তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ঈদের সময়ে তাদের ভালো কিছু দেওয়ার মনোস্থির করি। আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি যেন টাকার বিনিময়ে তাদের ঈদ সামগ্রী দেওয়া হয়। সেই উদ্যোগ থেকেই তাদের ২ টাকার বিনিময়ে ঈদ সামগ্রী দেওয়া হলো। সামনে যে ঈদ, ঈদের আনন্দ ভালোভাবে উদযাপন করুক এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল।