আমেরিকার শুল্কযুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অদ্ভুত ফর্মুলা অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৭ শতাংশ। আগে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল। আগামী ৯ এপ্রিল থেকে উচ্চতর শুল্ক আরোপ শুরু হবে। এর মানে, নতুন ও পুরনো মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই রপ্তানিকারকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে, তখন ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘটনার ফলে প্রধান রপ্তানি পণ্য  তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপে ‘ত্রুটি’ রয়েছে। কারণ তারা বাণিজ্য ঘাটতির ওপর ভিত্তি করে এ শুল্ক নির্ধারণ করেছে। এটি আদর্শ শুল্ক কাঠামোর পরিপন্থী। পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘এভাবে গণহারে শুল্ক বসানোর ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মার্কিন ক্রেতারাও সমস্যায় পড়বেন। উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে মার্কিন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে।’ 

হোয়াইট হাউজ প্রকাশিত তালিকায় বলা হচ্ছে বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় নাকি এখন থেকে বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ ‘হ্রাসকৃত সম্পূরক শুল্ক’ আরোপ করা হবে, যা ভারতের চেয়ে ১১ ও পাকিস্তানের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হওয়ায় তাদের এ পদক্ষেপে বিশ্বমন্দা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এ পাল্টা শুল্ক আরোপের বিপরীতে যদি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিতে আরও শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়া হয় তাহলে বাণিজ্যযুদ্ধ ঘনীভূত হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে শুল্ক আরোপ হলো, সেটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে মাত্রাটা আমাদের আশ্চর্য করেছে। তারা ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসাচ্ছে। এটা যোগ হবে আমাদের মার্কিন বাজারে যে গড়ে সাড়ে ১৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আছে তার সঙ্গে। অর্থাৎ এটা দাঁড়াবে ৫২ শতাংশে। যেকোনো বিচারে এটি বড় মাত্রার আমদানি শুল্ক। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে পণ্যের মূল্য বাড়বে। এর ফলে মার্কিন ভোক্তারা তাদের চাহিদা কমিয়ে দেবে।’ বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কটনের পঞ্চম বৃহত্তম ক্রেতা দেশ বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই নিয়ম আছে, তাদের দেশের কাঁচামাল আমদানি করে প্রস্তুতকৃত পণ্য সেই দেশেই রপ্তানি করা হলে, শুল্কের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম প্রযোজ্য হলো না। কেন হলো না, তা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে।    

বলার অপেক্ষা রাখে না,  ট্রাম্প প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে  তৈরি পোশাক খাত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় কাঠামোগত বাণিজ্যিক চুক্তি বা টিকফা আছে। যার মাধ্যমে সরকার আলাপ-আলোচনা শুরু করতে পারে। তবে আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কম দামের পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, চীন ও ভারত উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে। তারা যতটা আক্রান্ত হবে বাংলাদেশ ততটা হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবু বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উচিত হবে, নতুন রপ্তানি বাজার সন্ধান করা। আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সময়ের দাবি। কারণ প্রধান রপ্তানি খাত হোঁচট খেলে, বড় ধরনের হুমকিতে পড়বে দেশের অর্থনীতি। বিশ^ব্যাপী আমেরিকার এই শুল্কযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কতদূর যায়, সেটাই দেখার বিষয়।