বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কাছ থেকে বিনিয়োগের নিবন্ধন নিল স্টারলিংক। ২৯ মার্চ এই নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ইন্টারনেট-সেবা দিতে স্টারলিংককে বিটিআরসির কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে।
ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে গত ৬ মার্চ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ স্টারলিংককে নিবন্ধন দেওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের (স্টারলিংক) ৯০ দিনের মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার পরিপ্রেক্ষিতেই ২৯ মার্চ স্টারলিংককে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিডা থেকে নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক। সেই নিবন্ধনই স্টারলিংককে দেওয়া হয়েছে। বিশে^র শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা স্পেসএক্সের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্টারলিংক। কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট-সেবা দেয় স্টারলিংক। তাদের ওয়েবসাইটে কোন দেশে তাদের সেবা রয়েছে, তা উল্লেখ করে একটি মানচিত্র পাওয়া যায়। তাতে বলা আছে, চলতি বছর বাংলাদেশে এর যাত্রা শুরু হওয়ার কথা।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে স্টারলিংকের প্রযুক্তি এনে পরীক্ষা করা হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, স্টারলিংকের সেবার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় এবং ফল ইতিবাচক ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশের ক্ষেত্র আরও ত্বরান্বিত হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে স্টারলিংকের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করে। ইলন মাস্কের সঙ্গে ১৩ ফেব্রুয়ারি ভিডিও কলে স্টারলিংক প্রসঙ্গে আলোচনা করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সেই আলোচনার সূত্রে বাংলাদেশে স্টারলিংকের সেবা চালুর কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির একটি দল বাংলাদেশে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করছে। প্রধান উপদেষ্টা ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট-সেবা বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন।
৯ মার্চ প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, বাংলাদেশে ‘গ্রাউন্ড আর্থ স্টেশন’ স্থাপনের ব্যাপারে স্টারলিংকের হয়ে কয়েকটি স্থানীয় কোম্পানি কাজ শুরু করেছে। ভূমি বরাদ্দ, নির্মাণ সহায়তা ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মতো কার্যক্রম পরিচালনায় স্টারলিংকের সঙ্গে কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি করেছে সরকার। স্টারলিংক টিম এই কাজের জন্য কিছু নির্দিষ্ট স্থানও চিহ্নিত করেছে। এরপর ডিভাইসগুলো আনতে হয়তো তাদের কিছু সময় লাগতে পারে বা এখানে তারা কি মডেলে অপারেট করবেন, সেসব ব্যাপারে তারাই কিছু সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে গত মাসেও রাজধানীর একটি হোটেলে স্টারলিংকের পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়। এ সময় ২৩০ এমবিপিএস (মেগাবিট পার সেকেন্ড) ডাউনলোড গতি পাওয়া গেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ২৪ মার্চ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢাকায় স্টারলিংকের গতির তথ্য জানিয়ে একটি পোস্ট দেন। এই পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সংযোগের সার্ভার ছিল সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে। গ্রাহকের অবস্থান দেখায় মালয়েশিয়ায়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং তখন জানিয়েছিল, পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে স্টারলিংক তার বিদেশি স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড গেটওয়ে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে বাণিজ্যিক সেবাদানের সময় নন-জিওস্টেশনারি অরবিট (এনজিএসও) নীতিমালা মেনে স্থানীয় ব্রডব্যান্ড গেটওয়ে বা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) ব্যবহার করবে।
বিটিআরসি থেকে স্টারলিংককে এনজিএসও নির্দেশিকা মেনে লাইসেন্স নিতে হবে। ২৬ মার্চ এই নির্দেশিকা অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্দেশিকায় আড়ি পাতার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় সরকার চাইলে ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারে। বিডা জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলনের ভেন্যু রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আজ ৯ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংকের ইন্টারনেট-সেবা ব্যবহার করা হবে। সেখানে উপস্থিত সব অংশগ্রহণকারী সেটি ব্যবহার করতে পারবেন। এ ছাড়া স্টারলিংকের ইন্টারনেট ব্যবহার করে সম্মেলনের সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। স্টারলিংকে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাওয়া যায়। তবে এর খরচ অন্যান্য ইন্টারনেট-সেবার চেয়ে বেশি। যদিও দেশভেদে তাদের সেবার দামের পার্থক্য রয়েছে।
স্টারলিংক বাংলাদেশে এলে দুর্গম এলাকায় খুব সহজে উচ্চগতির ইন্টারনেট-সেবা দেবে। ফলে ইন্টারনেট-সেবার ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের পার্থক্য ঘুচে যাবে। দুর্যোগের পর দ্রুত যোগাযোগ প্রতিস্থাপনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে স্টারলিংক।
বিনিয়োগ সম্মেলনের মধ্যে ৯ তারিখ স্টারলিংক সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর কথা তুলে ধরেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আপনারা সামাজিক মাধ্যমে যেটা দেখবেন, সেটা স্টারলিংকের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হবে। যারা সামিটে যাবেন, তারাও ব্যক্তিগত ডিভাইসে যুক্ত করে অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।’ তিনি আরও বলেন, ইন্টারেনেট ব্যবহারের সুযোগ সবার অধিকার। এটা সবার জন্য ওপেন করে দিতে চাই, ঠিক যেভাবে আমরা সবাই পানি খাই, সবাই শ্বাস নিতে পারি, সে রকম। সেই পারপাসটার ওপর ভিত্তি করে এনজিএসও নীতি প্রণয়ন করেছি।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় চলতি বছর ভুটানে প্রথম স্টারলিংকের সেবা চালু হয়। বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেও স্টারলিংকের সেবা চালুর কার্যক্রম এগোচ্ছে। ভারতে ইতিমধ্যে দুটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্টারলিংকের চুক্তি হয়েছে।