বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের এখনো বাকি সাত ম্যাচ। অথচ বসুন্ধরা কিংসের টানা ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন অনেকটাই ধূসর হয়ে গেছে। শনিবার কিংস অ্যারেনায় সুলেমান দিয়াবাতের জোড়া গোলে মৌসুমে টানা তৃতীয়বারের মতো বসুন্ধরাকে হারের তেতো স্বাদ দিয়েছে মোহামেডান। তাতে শীর্ষস্থানটা পাকাপোক্ত করেছে সাদা-কালোরা। ১১ ম্যাচ শেষে তাদের সংগ্রহ ৩০ পয়েন্ট। শনিবার গাজীপুরে ঢাকা ওয়ান্ডারার্সকে ৪-১ গোলে হারিয়ে আবাহনী দুইয়ে থাকছে ২৬ পয়েন্ট নিয়ে। আর কিংসের সঙ্গে মোহামেডানের ব্যবধান দশ পয়েন্টের। শেষ সাত ম্যাচে এই ব্যবধান ঘুচিয়ে শিরোপা ধরে রাখা কিংসের জন্য অনেকটা এভারেস্ট জয়ের মতো কঠিন।
আগে থেকেই এই ম্যাচ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। লিগের প্রথম পর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে এসেছে মোহামেডান। সাদা-কালো সমর্থকরাও এসেছিলেন প্রস্তুতি নিয়ে। মাঠে যেমন ক্ষণে ক্ষণে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, তার রেশ দেখা গেছে গ্যালারিতেও। সমর্থকদের মধ্যে ঢিল ছোড়াছুড়ির ঘটনায় খেলা বন্ধও থেকেছে। ঘটেছে লালকার্ডের ঘটনাও। এমন ঘটনাবহুল সন্ধ্যায় মোহামেডান অধিনায়ক দিয়াবাতে কেড়ে নেন সব আলো। দুটি দারুণ ফিনিশিংয়ে মোহামেডানকে জিতিয়েছেন মালির ফরোয়ার্ড। আবার দুই গোলেই দায় আছে কিংস গোলকিপার মেহেদী হাসান শ্রাবণ ও ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক দেসিয়েল দস সান্তোসের। তাতে রাকিব হোসেনের সমতাসূচক গোলটা কেবল আক্ষেপই বাড়িয়েছে।
ব্যক্তিগত কারণে ব্রাজিলে আছেন কিংসের আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র মিগেল ফিগেইরা। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হুয়ান লেসকানো এবং ঘানাইয়ান উইঙ্গার ইভান্স ইতিও পুরোপুরি ম্যাচ ফিট নন। তাই দুই ভিনদেশি জোনাথন ফার্নান্দেজ ও দেসিয়েলকে নিয়ে একাদশ সাজিয়েছিলেন কিংসের রুমানিয়ান কোচ ভ্যালিরিউ তিতা। খর্ব শক্তির কিংসকে তাদের মাঠে পেয়ে মোহামেডান শুরু থেকেই তেড়েফুঁড়ে খেলতে শুরু করে। যার ফল তারা পেয়েছে ১৮ মিনিটে শ্রাবণের শিশুতোষ ভুল আর দেসিয়েলের ব্যর্থতায়। নিজেদের অর্ধ থেকে উজবেক মিডফিল্ডার মোজাফফরভ লম্বা বল ফেলেন কিংসের অর্ধে। ডেসিয়েল ছিলেন দিয়াবাতের মার্কার হিসেবে। অথচ শ্রাবণ সেই বল ক্লিয়ার করতে বক্স ছেড়ে বাইরে চলে আসেন। বল দখলের লড়াইয়ে এক সময় দিয়াবাতে হারিয়ে দেন দেসিয়েলকে। আর শ্রাবণ পোস্ট অরক্ষিত রেখে বাইরে এসে ডেকে আনেন সর্বনাশ। সুযোগসন্ধানী দিয়াবাতে বক্সের বেশ বাইরে থেকে উন্মুক্ত পোস্টে ঠিকঠাক বল রাখেন। ম্যাচের ২৫ মিনিটে অবশ্য রাকিবের গোলে সমতায় ফিরেছিল কিংস। জোনাথনের ফ্রি-কিক ডিফেন্স থেকে ফিরলে তাতে জুনিয়র সোহেল রানার জোরালো শট ডিফেন্ডার মেহেদী হাসান রুখে দিয়েছিলেন। তবে ফিরতি বল আলতো টোকায় জালে জড়ান রাকিব। যদিও এই গোল নিয়ে মোহামেডান খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। শট নেওয়ার আগে বল রাকিবের হাতে লাগার দাবি অবশ্য টেকেনি। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার ভালো সুযোগ ছিল মোহামেডানের। বাঁ দিক দিয়ে দ্রুত আক্রমণে উঠে ক্রস ফেলেছিলেন ইমান্যুয়েল সানডে। যা খুঁজে নেয় ভালো জায়গায় থাকা আরিফকে। তবে এই তরুণ বাঁ পায়ের শটে বল পোস্টে রাখতে পারেননি।
বিরতির পরপরই দশজনের দলে পরিণত হয় বসুন্ধরা কিংস। দলকে বিপদে ফেলে ৪৮ মিনিটে মাঠ ছেড়ে যান রাইটব্যাক রিমন হোসেন। নাইজেরিয়ান ইমান্যুয়েল সানডেকে পেছন থেকে জার্সি ধরে টেনে ফেলে দেওয়ায় ম্যাচে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখতে হয় তাকে। যদিও কিংসের দুর্বলতা কাজে লাগাতে মোহামেডানের আক্রমণাত্মক হওয়ার দিকে সেভাবে মনোযোগ ছিল না। রক্ষণ সামলে মোহামেডানের দিয়াবাতে এবং সানডেই ভীতি ছড়িয়ে গেছেন বারবার। ৫৩ মিনিটে আবারও শ্রাবণের ভুলে গোল হজম করতে পারত কিংস। তবে তপু বর্মণের প্রতিরোধে বেঁচে যায় স্বাগতিকরা। ডান দিক দিয়ে আক্রমণে উঠেছিলেন সাকিব। আড়াআড়ি পাসও বাড়ান সানডেকে। পোস্ট ছেড়ে শ্রাবণ সেটা ক্লিয়ার করতে গিয়েছিলেন। তবে তিনি ব্যর্থ হন। সানডে তার আগেই ক্রস ফেলেন গোলমুখে। তাতে মাহবুব আলম হেডও নেন। যা তপু গোললাইন থেকে ঠেকান। ম্যাচের ৫৭ মিনিটে প্রথম কিংসের জার্সিতে প্রথম মাঠে আসেন হুয়ান লেসকানো। এই আর্জেন্টাইন রিয়াল মাদ্রিদের যুব দলে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। তবে এখনো ম্যাচ ফিট হয়ে উঠতে পারেননি। বদলি নেমে সেভাবে নিজেকে চেনাতেও পারেননি তিনি। ম্যাচের ৬৮ মিনিটে লেসকানো গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন। ইমান্যুয়েল টনির ভুলে বল পেয়ে ডান পায়ের জোরালো শট নিয়েছিলেন ৩২ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। তবে তা পরীক্ষা নিতে পারেনি মোহামেডান কিপার হোসেন সুজনকে। ম্যাচের ৭১ মিনিটে অপ্রীতিকর ঘটনায় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। মোহামেডান কিপার সুজনকে লক্ষ্য করে বোতল ছুড়তে শুরু করে কিংসের দর্শকরা। একটা সময় গ্যালারিতেও উত্তেজনা ছড়ায়। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের শঙ্কা জাগে। পরস্পরের দিকে ঢিল ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। এ সময় পুলিশসহ নিরাপত্তা রক্ষীরাও হিমশিম খাচ্ছিলেন। তাতে সাত মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে খেলা শুরু হয়।
৮৫ মিনিটে মোহামেডানকে ফের এগিয়ে নেন দিয়াবাতে। ইভান্স ইতির কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে সানডে দ্রুত লম্বা ফল ফেলেন দিয়াবাতেকে উদ্দেশ্য করে। সেই বল আয়ত্তে নিয়ে মার্কার দেসিয়েল ও কিপার শ্রাবণকে বডি ডজে পরাস্ত করে মোহামেডানের তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করেন প্রথম পর্বের জয়ের নায়ক দিয়াবাতে।
২৬ এপ্রিল লিগের পরের রাউন্ডে মোহামেডান মুখোমুখি হবে চিরবৈরী আবাহনীর। আর কিংসকে বাকি পথটায় নিজেদের কাজ ঠিকঠাক করার পাশাপাশি তাকিয়ে থাকতে হবে দুই প্রতিপক্ষের দিকেও। তারা পয়েন্ট খোয়ালেই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়া স্বপ্নটা পূরণ হতে পারে। নইলে টানা ছয় শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়তে না পারার আক্ষেপ সঙ্গী হবে গত মৌসুমের ট্রেবলজয়ীদের।