কীসের মধ্যে কী? কেমন হয়ে গেল ব্যাপারটা? নানা কারণে বিদ্যমান শিল্প-কারখানা টিকে আছে অনেক কষ্টে। উৎপাদন ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। ব্যাংকের সুদহার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক নিয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এখন গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে। দেশে একটি সফল বিনিয়োগ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই, শিল্প-কারখানায় নতুন সংযোগে গ্যাসের ৩৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি। এতে শিল্পের বয়লারে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটারপ্রতি ৩০ থেকে বেড়ে হলো ৪০ টাকা। আর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৪২ টাকা। দেশি আর বিদেশি বিনিয়োগকারী কী বুঝল এতে? ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের শঙ্কা, নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের এ মূল্যবৃদ্ধির জেরে বিকাশের বদলে এতে দেশে বিনিয়োগ সংকুচিত হবে।
নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে ১৫০ থেকে ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয় গ্যাসের দাম। শিল্প ও ক্যাপটিভে প্রতি ইউনিটের দাম করা হয় ৩০ টাকা। পরে গত বছর ক্যাপটিভে দাম বাড়িয়ে করা হয় ৩১ টাকা ৫০ পয়সা। অন্যদিকে ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকার শিল্প-কারখানাগুলোয় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় এসব এলাকার বেশকিছু শিল্প-কারখানা কখনো চলছে, কখনো বন্ধ থাকছে। গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকলেও গ্যাস সংকটে অনেক শিল্প-কারখানা তাদের কেন্দ্রগুলো চালাতে পারছে না। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে শিল্পোদ্যোক্তারা। এমনিতেই দেশের শিল্প-কারখানা বছরের বেশিরভাগ সময় গ্যাস সংকটে ভুগছে। গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন প্রতিনিয়ত কমছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যমান শিল্প খাতে একটি বড় ধাক্কা। আর নতুনদের জন্য লাল বার্তা। এমনকি সরকারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টায় লাগাম টেনে ধরা। গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে যৌক্তিক-স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই সরকারের তরফে। পেট্রোবাংলার মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুনানি গ্রহণ করে বিইআরসি। পেট্রোবাংলা তাদের প্রস্তাবে বলেছে, দাম না বাড়ালে বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হবে। শুনানিতে ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। এ সেক্টরে চুরি-চামারি বন্ধ হলে গ্যাসের দাম বাড়াতে হয় না। সম্ভাব্য ঘাটতির গল্পও শোনাতে হয় না। গণশুনানিতে তারা হিসাব করে দেখিয়ে দিয়েছে, গ্যাসের দাম উল্টো কমানো যায়। এরপরও তারা শিল্পের জন্য ঘনমিটারপ্রতি ২১-২২ টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাব রাখেন। সরকার সেটাকে নিয়ে গেছে ৪০ টাকায়। একদিকে বিনিয়োগ আনার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এমনটি করবেই তা আগাম সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে গণশুনানি করে সময় নষ্টের মানে হয় না। এভাবে গ্যাসের দাম বাড়াতে থাকলে কেবল উৎপাদন ব্যাহত হবে না, পণ্যের দামেও বাড়বাড়ন্তের নতুন চাপ আসবে।
বিনিয়োগ পরিবেশের তৈরির কথার সঙ্গে বিদ্যমান বিনিয়োগকেই ঝুঁকিতে ফেলা প্রকারান্তরে তামাশা। শিল্প গ্যাসের আগের দামেই নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। এরপর আরও দাম বাড়ানো ডাবল মশকরা। করোনা মহামারীর সময় থেকে শুরু করে ২০২৪-এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যে কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে তীব্র আপত্তি ছিল তাদের। সেই আপত্তি উপেক্ষা করে শিল্পের গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে ছেড়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। বাংলা নতুন বছর শুরু আগের দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিইআরসির শুনানিকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে। সেদিন থেকে এটা কার্যকরও হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিধান তুলে দিয়ে আগের মতো গণশুনানির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির একক ক্ষমতা পায় বিইআরসি। কিন্তু এবার বিইআরসি গ্যাসের দাম বাড়ালে, এর পক্ষে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এমনকি মূল্যবৃদ্ধিতে সরকার কত টাকা বাড়তি আয় করবে, তাও জানাতে পারেনি। বর্তমানে গ্যাসের যে দাম সেটাই ঠিকভাবে পরিশোধ করতে পারছে না অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এখন নতুন শিল্পের পাশাপাশি অনুমোদিত গ্যাসের বাইরে ব্যবহার করলে তাদেরও বেশি বিল দিতে হবে। ফলে চলমান অনেক শিল্পের খরচ বাড়বে। পণ্য উৎপাদনে খরচ বাড়বে, কাঁচামালের দাম বাড়বে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যমূল্য বাড়বে। রাজস্ব চাহিদা যাচাই ছাড়া এভাবে মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের প্রেসক্রিপশনে করা হয়নি। এ প্রেক্ষিতে কঠিন কথা বলেছেন ব্যবসায়ীদের কয়েকজন। তাদের দাবি, দাতা সংস্থা আইএমএফের চাপে অন্তর্বর্তী সরকার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে বাধ্য হয়েছে। ব্যাপক-বিস্তর না হলেও মোটা দাগে কিছু ভালো বার্তা দিয়েছিল ঢাকায় হয়ে যাওয়া বিনিয়োগ সম্মেলনটি। এতে অংশ নেওয়া চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৫০টি দেশের ৫৫০ জন বিনিয়োগকারীর বড় অংশই বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এসব প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবায়নে রোডম্যাপ করবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ-বিডা। তাদের রোড বা ম্যাপের আগেই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটি গ্যাপ করে ফেলা হলো গ্যাসের দাম বাড়িয়ে। ব্যবসায়ীসহ দেশের অনেকের বিশ্বাস, বর্তমান সরকারের হাতে একটা সুযোগ আছে ব্যবসায়িক জগতে প্রকৃত স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা আনার। তা দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি সব বিনিয়োগেই। সেখানে নির্ভর করছে অনেক কিছু।
টানা কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি বেদম চাপ সইছে। ডলার-সংকট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে ব্যাংক খাত। এমন এক পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার বদল হয়েছে। তাতে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় হামলার পাশাপাশি অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। আবার নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাস না পেরোতেই সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নরসিংদীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমানে দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা বেশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। এ মুহূর্তে শিল্প খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সরকারের প্রতি আস্থা অটুট রাখার বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ছোট্ট একটি ভূখণ্ড, অথচ রয়েছে বিপুল জনসংখ্যা। তাদের উপার্জনের নিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্যও বাংলাদেশের শিল্পায়নকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ পেতে একসময় বাংলাদেশকে যথেষ্ট হা-পিত্যেশ করতে হয়েছে, কিন্তু তেমন বিনিয়োগ পাওয়া যায়নি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের নিশ্চয়তাসহ যে ধরনের ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন। বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো নতুন নয়। অনেক দিন ধরেই বিরাজমান এসব বাধার মধ্যে অন্যতম অবকাঠামোগত সমস্যা, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়া।
বিনিয়োগ দেশি বা বিদেশি যেটাই হোক, এগুলো উদ্যোক্তাদের কমন চাহিদা। এ ছাড়া স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না। তারওপর যোগ হয়েছে বৈশ্বিক শুল্ক যুদ্ধ। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেদিন বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন, সেদিন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরেকটা বড় ধরনের ধাক্কা লাগল। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল ঘোষণা করে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এটাও জানানো হয়েছে, স্থলপথে ভুটান ও নেপালে বাংলাদেশ যে পণ্য রপ্তানি করছে তা এর আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ ভারতের নৌপথ ও বিমানপথ ব্যবহার করে এখন বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করতে পারবে না। বিশ্ববাণিজ্যে যখন বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা, সেই সময় ভারতের এই ঘোষণা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন চাপে রাখবে। গত বছরের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্রপট ভালো নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একমাত্র ভরসা এখন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রবাসীরা নিজেদের উজাড় করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। কিন্তু রেমিট্যান্সের এ প্রবাহ সামনেও বহাল থাকবে, তা ভাবা যায় না। কারণ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবার এসেছে মূলত ঈদকে কেন্দ্র করে। প্রতি বছর ঈদেই এই রেমিট্যান্স-প্রবাহ বাড়ে। এবার ঈদে রেমিট্যান্স-প্রবাহ অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রবাস আয়ের জন্য যে করণীয়গুলো করা দরকার ছিল, সেটা পুরোপরি করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি সংকুচিত হচ্ছে। যেসব দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি করা হয় তার মধ্যে কয়েকটি দেশ বর্তমানে বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না। অর্থাৎ জনশক্তির বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ এখন কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে। এ সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক রপ্তানিতেও ভাটার টান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ থেকে রক্ষায় মূল ভরসা শিল্পবিনিয়োগ এবং আমদানি-রপ্তানি। শিল্প সেক্টরে গ্যাসের ধাক্কা নতুন করে নানান ভাবনা জাগাচ্ছে। কিছু অনাস্থাও যোগ হয়েছে। শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও দেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নিতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
mostofa71@gmail.com