মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ সংগঠক ড. মোশাররফ

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ এএম

একসময় মনে হতো রাজনীতি এক ভিন্ন জগৎ, এ জগতে শুধু রাশভারী লোকের বাস। বিশ্বাস করতাম, মন্ত্রী-এমপিরা যেন সুকুমার রায়ের ‘রামগরুড়ের ছানা’। আমাদের এলাকা দেশের মূল ভূখন্ড থেকে মেঘনা ও কাঁঠালিয়া নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। আমাদের কাছে রাজনৈতিক নেতা ছিলেন অমাবস্যার চাঁদ। নির্বাচন ছাড়া কারও দেখা পাওয়া যেত না। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা রাজনৈতিক নেতারা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ভাবমূর্তিসহ আজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষের কাছে আসছেন। ‘জিন্দাবাদ’ ধ্বনিসহ আমরা তাদের পেছনে পেছনে হাঁটতাম। যখন বুঝতে শিখি, তখন এলাকার করুণ অবস্থা দেখে বুঝতে পারি, আমরা মন্ত্রী-এমপিদের কাছে ‘কবরের হাড্ডি’ ছাড়া কিছু নই।  তবে এর ব্যতিক্রম আছে। এর মধ্যে অন্যতম ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি ক্ষমতার বাইরে থাকাকালেও নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখতেন। উজ্জীবিত রাখতে গিয়ে শীতের তীব্রতা কমতে, বিনোদনের তীব্রতা বাড়াতে থাকেন। কখনো গাজীপুরের জিরাবো রিসোর্ট, আশুলিয়ার নন্দন পার্ক, নরসিংদী হেরিটেজ রিসোর্ট, ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতি’র স্প্রিং ফেস্টিভ্যালে সকাল থেকে জ¦লত রান্নার চুলা। কখনো প্রকা- নৌযান ভাড়া করে হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে ভাসতেন পদ্মা-মেঘনায়। এর সঙ্গে খানাপিনা ও নাচ-গান। ঘটনাচক্রে একটি রাজনৈতিক দলের তৃতীয় সারির নেতা হতে হয়েছিল। রাজনৈতিক জগৎ উদ্ভট। যেখানে দলের কথা ছাড়া নিজের কথা চলে না।

পুলিশের খাতায় নাম না থাকলেও, রাজনীতিতে যুক্ত হতে না হতেই মামলার জালে জড়িয়ে যাই। মহামান্য হাইকোর্টে জামিন নিতে আসি। অসহ্য গরম সহ্য করতে না পেরে, আমাদের এক সহ-আসামি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। সেদিন থেকে আমি রাজনীতিবিমুখ। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার লেখা বই ‘চিত্রগুপ্তের খাতা’র মন্তব্যসহ মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মন্তব্যের একাংশে লিখেছেন, ‘চিত্রগুপ্তের খাতা পুস্তিকাখানি বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির ওপর সুনিপুণ হাতে তুুলে ধরা একটি ব্যঙ্গরসাত্মক রূপক কাহিনি।’ ফলে রাজনীতিবিমুখ হলেও, ব্যক্তিবিমুখ ছিলাম না। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে প্রথম পরিচয়- ২০০৫ সালে হেয়ার রোডের মন্ত্রিপাড়ায়, বিআরটিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান তৈমূর আলম খন্দকারের মাধ্যমে। পরিচয় জানার পর, পাশের কক্ষ থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের অবদান’, ‘সংসদে কথা বলা যায়’ ও ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ’ নামক তিনটি বই হাতে তুলে দেন। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা বাংলাদেশের ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ’-এর ক্ষেত্রে এক অনন্য মডেল। ‘প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ’ বইটি পাঠ করে জানতে পারি, মৎস্য প্রকল্পগুলোর কারণে কীভাবে এলাকার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এবং অর্থনৈতিকভাবে তারা স্বাবলম্বী হয়েছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের অবদান’ পড়ে জানতে পারি, বিলাত প্রবাসীরা মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে বিশ্ব জনমত গঠন, তহবিল সংগ্রহ ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। কীভাবে প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে সভা-সমাবেশ ও প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করেন। লন্ডনের হাইড পার্ক ও ট্রাফালগার স্কয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে তারা প্রতিবাদ সমাবেশ ও শোভাযাত্রা ও  ব্রিটিশ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন।

যুক্তরাজ্যস্থ ‘বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও অ্যাকশন কমিটি’ গঠন করে তারা জোরালো আন্দোলন শুরু করেন, সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের থেকে অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহ করে যুদ্ধাহত ও শরণার্থীদের জন্য পাঠান। ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে লবিং করেন। জানতে পারি, গ্রন্থের লেখক মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত না থেকেও, ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’ পদবির মতো বিরল সম্মান কী করে অর্জন করেন, সে কথা।  টের পাই, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন শুধু উঁচুমাপের রাজনৈতিক নেতা নন, বড়মাপের একজন লেখকও। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার শুরু কারাবাস। ২০১৪ সালের ১২ মার্চ মিথ্যা মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নারায়ণগঞ্জ ৭ খুনের আসামি সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ এবং আরিফ হোসেনও গ্রেপ্তার হয় ২০১৪ সালে। মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় খালাস পেয়ে যখন বাইরে আসেন তখন তার বাসায় যেতাম গল্প শুনতে, কারাগারের গল্প। স্যার কর্মীদের কাছে মজা করে কারাগারের গল্প বলতেন।

মুক্তির আনন্দ : ‘৭ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৩টায় পাশের কক্ষে অবস্থানরত চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী মুক্তিলাভ করেন। মুক্তির যে কী আনন্দ, তা আমরা পাশের কামরা থেকে উপলব্ধি করতে পারি। মহিউদ্দিন চৌধুরীর ১৪টি মামলায় একে একে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছে। সরকার একটি রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল করেনি। অথচ আমার ৬টি মামলায় হাইকোর্ট প্রদত্ত রায়ের প্রত্যেকটির বিরুদ্ধে সরকার আপিল করেছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় হাইকোর্টের প্রদত্ত জামিন সুপ্রিমকোর্টে স্থগিত করা হয়। ফলে ২ সেপ্টেম্বর যেখানে আমার মুক্তি পাওয়ার কথা, সেখানে আজও আমার মুক্তি অনিশ্চিত হয়ে আছে। এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান জরুরি আইনের সরকার আওয়ামী লীগের দিকে পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে।’ (ফখরুদ্দিন-মইন উদ্দিনের কারাগারে ৬১৬ দিন পৃষ্ঠা নং ২৬৯)।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৮০তম জন্মদিনে হৃদ্যিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।  

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত