শিক্ষাকে পঙ্গু করার কৌশল

যে গতিতে আমরা আধুনিক হচ্ছি, তার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে আধুনিক হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি। বাংলাদেশ তার ছিটেফোঁটা পেয়েছে। কিন্তু আমাদের অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি উল্টো হয়ে হাঁটার মতো। শুধুই পেছনে অগ্রসর! বিশ্ব যেখানে নতুন আবিষ্কারে মত্ত, বিচক্ষণতা এবং প্রাজ্ঞতায় যখন তারা অনেক দ্রুত চলছে, সেখানে আমরা রয়েছি শঠতা এবং তঞ্চকতায়। আত্মবলিদান নিয়ে মোটেও চিন্তিত নই। যে করেই হোক পারতে হবে ও জিততে হবে। নিজ সর্বনাশের এ ধরনের আত্ম বিসর্জন পৃথিবীতে বিরল।

একসময় এসএসসি, এইচএসসি, বিএসসি, বিসিএসসহ এমন কোনো পরীক্ষা নেই, যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো না। অনেক সময় এমনও দেখা গেছে, পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীরা আস্ত বই দেখে উত্তর লিখছেন। আবার কেউ জানালা দিয়ে প্রশ্নোত্তর পাঠাচ্ছেন। অথবা কেউ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অনুমাননির্ভর প্রশ্নোত্তর। সেখান থেকে কমন পড়া বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে লিখছেন। শিক্ষক নামে যারা রয়েছেন, তারা দেখে না দেখার ভান করে চুপ থেকেছেন। আগে গণহারে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো। কখনো প্রেস থেকে আবার কখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। এর সঙ্গে জড়িত থাকত বিভিন্ন কোচিং সেন্টার। অনেক সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে প্রেসের কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসাজশে এটা সম্ভব হতো। এরপর বিষয়টি নিয়ে হইচই হলে সম্মান বাঁচাতে লোকলজ্জার ভয়ে কিছু মানুষকে ধরা হতো। বলা হতো, তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্র।

এখন আগের সময় নেই। তাতে কী? নকলের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে অধিকাংশের কাছে মোবাইল ফোন। চলছে এসএসসি পরীক্ষা। দেখা যাচ্ছে পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেসবুকে প্রশ্ন এবং উত্তর চলে আসছে। শিক্ষার্থীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। এই প্রবণতা কে বন্ধের উদ্যোগ নেবে? পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করা কি বন্ধ করা যায় না? গত ১৫ এপ্রিল সকালে এসএসসি পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিট পর সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ‘আমাদের চৌহালী’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে ওই প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, পরীক্ষা শুরুর পর দেশের প্রায় জেলা-উপজেলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরীক্ষা শুরুর ১০-২০ মিনিটের মাথায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, এর ৩০ মিনিট পর ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তরপত্রও মিলে যায় ফেসবুকে। কোনো কোনো কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান তৈরি করে ফেসবুকে ভিডিও লাইভ করেন। চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান জানাচ্ছেন, ‘আমাদের চৌহালী’ নামে ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ব্যবস্থা নিতে থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ায় পরীক্ষায় এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

দেশের প্রযুক্তি এখন বেশ শক্তিশালী। দেশ-বিদেশে আমাদের সাইবার সিকিউরিটি ও সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞরা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। তাদের এ ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। অল্পকিছু মানুষের অসততা ও অপকর্মের কারণে পুরো ব্যবস্থাকে খারাপ এবং কলুষিত বলা অনুচিত। তেমনি হাজারো মানুষের সততা ও নিষ্ঠাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অপমান করাও মেনে নেওয়া যায় না। সর্বোপরি, যারা আজকের পরীক্ষার্থী, তারাই আগামীর ভবিষ্যৎ, তাদের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। যারা পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নপত্র ফাঁস করছেন, তারা কোনো না কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কর্মচারী। অথবা কোনো কোচিং সেন্টারের। যেখান থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হোক না কেন, সেখানকার দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে তা আরও প্রকট হবে। একসময় রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসনসহ সব জায়গায় আসবে আজকের কিশোর-তরুণ। এরপর বলার প্রয়োজন নেই, রাশ না টানলে ফল কী হতে পারে!

কী অদ্ভুত আমাদের গড়ে ওঠা। এমন এক সমাজের দিকে আমরা ধাবিত হচ্ছি, যেখানে পঙ্গু-অথর্ব-স্বার্থপর এবং হিংস্র প্রজন্মই শুধু বেঁচে থাকবে। এটা কি শিক্ষাকে পঙ্গু করার দীর্ঘমেয়াদি হীন কৌশল!