বিএনপি নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি

ঘটনার চেয়ে রটনা বেশি!

১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখলবাজি-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগ আসতে থাকে। এই নিয়ে অন্তত তিন হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বিএনপি বলছে, চাঁদাবাজ ও দখলের সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছে। তবে ঘটনা যতটা ঘটেছে, তার চেয়ে রটেছে বেশি। 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর দাবি, ছোট ঘটনা বড় করে তুলে ধরে বিএনপিকে ঘায়েল করার এজেন্ডাও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। অনেক ঘটনা আছে যাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের লেনাদেনা নেই কিন্তু তাদের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেমন মামলা হামলা শিকার হয়েছেন, তেমনি হয়েছেন নিষ্পেষিত-নিঃস্বও। ফলে ৫ আগস্টের পর ওইসব নেতাকর্মীর একটি অংশ ক্ষমতায় না এসেও ‘ক্ষমতায়িত’ হয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। দলের বদনাম হবে জেনেও তারা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে লোভ সামলাতে পারেনি।

এখন বিএনপি বলছে, যারা অপকর্মে লিপ্ত ছিল তদন্ত বা প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যতটা প্রচার করা হয়েছে, ততটা কি ঘটেছে? বিএনপির ইমেজ নষ্ট করতে চলছে অপরাজনীতি। স্বৈরাচারের দোসররাও এ ক্ষেত্রে কৌশলে ভূমিকা রাখছে। সারা দেশে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগের যে পরিমাণ ঘটনা ঘটেছে, তার চেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি মিডিয়া ট্রায়ালের সঙ্গেও তুলনা করছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এগিয়ে রয়েছে।

বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত নন অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির নামে চালানো হচ্ছে এমন উদাহরণ তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিলে থানা বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বিএনপির বিরুদ্ধে চলতে থাকে নানা মন্তব্য। অথচ মতিঝিল থানা বিএনপির কোনো কমিটিই নেই।

বিষয়টি মহানগর বিএনপির আমলে এলে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম মজনু ও তানভীর আহমেদ রবিন মতিঝিল থানায় চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অথচ এর মধ্যে যতটুকু মিডিয়া ট্রায়াল হওয়া দরকার, তা হয়ে গেছে।

আবার গত ১৫ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে ধানমন্ডির জিগাতলা এলাকায় একটি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। রাস্তার ওপর প্রাইভেট কার পার্কিং করায় গাড়ির মালিকের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়, বিএনপি নেতারা চাঁদাবাজি করছেন। এ ঘটনায় মো. আশরাফুল (২৩) নামে এক যুবককে আটকও করা হয়। পরে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জেএস এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ঝিগাতলা থেকে পার্কিং থেকে টাকা তুলতে ইজারা দেয়। ইজারাদারের কর্মী হিসেবে ওই যুবক সেখান থেকে রসিদের মাধ্যমে টাকা তুলছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে দেশ জুড়ে বিএনপি নেতাদের জড়িয়ে নানারকম মুখরোচক কথা ছড়িয়ে যায়।

গত ১৭ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ভার্চুয়াল এক আলোচনা সভায় মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়টি সামনে এনে বলেছেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় যেভাবে বিএনপিকে মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এরকম একটি প্রেক্ষাপট ধীরে ধীরে তৈরি করার চেষ্টা চলছে।’ তিনি এও বলেছেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, এ নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।’

বিএনপির এক সিনিয়র নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারেক রহমানের নির্দেশে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করা হচ্ছে না। অপকর্মকারীদের বিষয়ে প্রমাণ মিললেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন এমন একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণামূলক নেটওয়ার্ক’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বিএনপির চাঁদাবাজি-দখলদারি বিষয়টি নিয়ে একটি মতামত তুলে ধরেছে। পাশাপাশি এ চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কীভাবে উত্তরণ করা যায় সে বিষয়টিও তারা সামনে এনেছে। এ নেটওয়ার্কে যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দেশি-বিদেশি পেশাদার সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী।

এ নেটওয়ার্কটির স্কলাররা মনে করছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সত্যিকার অর্থেই দলে শৃঙ্খলা আশা করছেন এবং জনগণের পালস তিনি আক্ষরিক অর্থেই বুঝতে পারছেন। তবে কতিপয় নেতাকর্মী এ ক্ষেত্রে দলকে বিব্রত করছেন।

নেটওয়ার্কটির স্কলাররা চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগের পাশাপাশি মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, বাস্তবতার চেয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কিংবা ছোট ঘটনা বড় করে তুলে ধরে বিএনপিকে ঘায়েল করার এজেন্ডা কেউ কেউ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছু অপকর্মে জড়িত আছে এমন প্রচার থাকায় তারেক রহমান দায়ীদের ধরে পুলিশে দিতে বলেছেন। এখন দায়িত্ব সরকারের। তবে এটা বলতে পারি, বিএনপিকে ঘায়েল করার এক ধরনের চেষ্টা আছে। এটা দেশকে বিরাজনীতিকরণের নীল-নকশার অংশ।’ 

অন্তর্বর্তী সরকারকে ৫ থেকে ১০ বছর ক্ষমতায় রাখার ক্যাম্পেইনের পেছনেও সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে বলে মনে করছেন নেটওয়ার্কের সদস্যরা। তারা বলেছেন, দ্রুত নির্বাচনের যে দাবি বিএনপি তুলেছে, সেই দাবির বিপক্ষে পাল্টা মতামত তুলে ধরতেই এ ধরনের ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। যদিও সরকারের সঙ্গে এর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং এ ক্যাম্পেইনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অবস্থা ব্যাহত করতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রতিনিয়ত নানামুখী চাপে রাখতে পরাজিত শক্তিগুলো গোপনে ও কৌশলে কাজ করছে। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে অগণতান্ত্রিক ফর্মুলায় কীভাবে দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়, সেটি নিয়েও রয়েছে তৎপরতা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে, তাদের পরামর্শ নিয়ে ও সহায়ক শক্তি হিসেবে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলা উচিত। এ সরকারের প্রধান লক্ষ্য যে দেশকে প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটানো, সেটিও বারবার স্পষ্ট করে বলা উচিত।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করে বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণামূলক নেটওয়ার্কে থাকা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর যে বিশাল জনপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশায় কিছুটা হলেও চিড় ধরতে শুরু করেছে। সংস্কার, ফ্যাসিবাদের অপরাধের বিচার এবং নির্বাচন নিয়ে তারা কার্যকর ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারছে না। রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন ইস্যুতে উষ্মা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের রাজনৈতিক দল এনসিপিও জনগণের দল হয়ে ওঠার বদলে হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. মাহবুব উল্লাহ সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখক-গবেষক ও বামপন্থি রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকারের উচিত এ বছরের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে নিজ থেকে আসেনি, ছাত্রনেতা ও অন্যরা এ সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। কোন প্রেক্ষাপটে সরকার গঠন করেছে সে বিষয়েও পরিষ্কার বক্তব্য দেন তিনি। পাশাপাশি সরকারের কাজের পরিধি কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তার বক্তব্য উঠে আসে।

ড. মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জোর করে ক্ষমতায় আসেনি। সব দল ও মহল মিলে তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। সরকার পরিচালনায় কিছু ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য আছে। কিন্তু তারা নির্বাচিত সরকার নয়। দীর্ঘদিন অনির্বাচিত সরকার থাকলে নানা জটিলতা দেখা দেয়। নির্বাচিত সরকারের যে শক্তি থাকে সেটি দলীয় কিংবা যাই হোক, সেটি এ সরকারের নেই।