আগে যেসব শিরোপায় ছায়া ফেলেছিল সমালোচনা আর বিতর্কের গন্ধ, এবারের আবাহনী যেন এক অন্য আলোয় উদ্ভাসিত। তারকায় ঠাসা বহুজাতিক দল নয়, এবার দল গঠনেই ছিল অন্যরকম চিন্তা। জাতীয় দলের তারকাদের বদলে আস্থা রাখা হয়েছিল উদীয়মান তরুণদের উপর। মাঠে তারা কেবল প্রতিপক্ষকে নয়, জয় করেছে হাজারো সমালোচনার ভয়াল ছায়াকেও। প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে টেলিভিশনের পর্দায়—যেখানে ছিল না কোনো লুকোচুরি, ছিল না কোনো আড়াল। মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়েই শিরোপা ঘরে তুলেছে আবাহনী লিমিটেড।
এই প্রথমবার প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন হান্নান সরকার। মাঠের সাফল্যের পেছনে তার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক গভীর প্রশান্তি ও দায়বদ্ধতার স্বর, 'খুবই ভালো। আলহামদুল্লিলাহ। প্রথমেই যে কোনো লিগ বা টুর্নামেন্ট যখন কেউ টার্গেট করে শুরু করে তখন আল্টিমেট লক্ষ্য থাকে চ্যাম্পিয়নশিপ। চ্যাম্পিয়নটা যখন হয়ে যায় তখন বড় রিলিফ-তৃপ্তি, এই যে গত দুই মাসের যে জার্নি, সেটাতে নিশ্চিতভাবে এই প্রাপ্তির মাধ্যমেই হয়।'
আবাহনী-মোহামেডান নাম দুটি যে এখনো কতটা আবেগী আবরণে মোড়া, সেটাও তুলে ধরলেন হান্নান, 'আমার কাছে মনে হয় একটা সবচেয়ে বড় বিষয় প্রিমিয়ার লিগে আবাহনী-মোহামেডান—এই দুইটা নাম আলাদা একটা ওজন ক্যারি করে। এই দলের জার্সিটা যখন গায়ে দেয়, আলাদা একটা মোটিভেশন চলে আসে।'
পেছনে ফিরে তাকালেন অতীতের বিতর্কের দিকেও, যেখানে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল আবাহনীর কিছু শিরোপা। কিন্তু এবার সেই আস্থার জায়গাটিতে এসেছে পরিবর্তন, 'নিশ্চিতভাবে প্রিভিয়াসলি অনেকে অনেকভাবে আবাহনীর চ্যাম্পিয়নশিপকে আলোচনায় এনেছে, সমালোচনায় এনেছে। এবারের দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরে এই জায়গাটায় অন্তত প্রতিটা দলকে নিউট্রালভাবে চিন্তা করতে পারেন।'
লিগজুড়ে আম্পায়ারিং নিয়ে যেমন আলোচনা ছিল, তেমনি ছিল ক্রিকেটারদের ফেয়ার ক্রিকেট খেলার চেষ্টাও, 'অনেক বিতর্ক হয়েছে, আম্পায়ারিং—অনেক বিষয় নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। দিনশেষে ফেয়ারনেসের জায়গায় সবাই যার যার জায়গায় ফেয়ার থাকার চেষ্টা করেছে। ঠিক একইভাবে ক্রিকেটাররা মাঠের ক্রিকেটে প্লেয়াররা বেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছে।'
সাফল্য যে কেবল কৌশল বা কাগুজে হিসাব নয়, বরং আবেগ আর নিষ্ঠার প্রতিফলন—তাও স্পষ্ট তার কণ্ঠে, 'মাঠের ক্রিকেট ভালো খেলে যে চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করা যায়, সেটা একটা বড় তৃপ্তি কাজ করে, ইমোশনে কাজ করে। আমার মনে হয় এবারের আবাহনী চ্যাম্পিয়নশিপে সেটা কাজ করেছে, প্রতিটা প্লেয়ার, ম্যানেজমেন্ট ও প্রতিটা মানুষের।'
শেষে যেন এক আত্মবিশ্বাসী সিলমোহর টেনে দিলেন হান্নান সরকার, 'আমার মনে হয় এটা অন্যরকম ফিলিংস নিশ্চিত করে। কোনো বিতর্ক ছাড়া, ফেয়ার ক্রিকেট খেলে, ভালো ক্রিকেট খেলে, কোনো তর্ক-বিতর্ক মুক্ত থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আলাদা একটা আনন্দ থাকে।'
পুরনো আবাহনীর দলগুলোয় জাতীয় দলের তারকা ভরা থাকত, বাজেট হতো বিশাল। এবার সেই রুট মাড়ায়নি তারা। এ নিয়েও দিলেন অকপট বিশ্লেষণ, 'আগে আবাহনী অনেক টাকা খরচ করে টিম করত, জাতীয় দলের সব প্লেয়ারদের নিতো, চ্যাম্পিয়ন মোটামুটি ধরেই নেওয়া যেত, প্লেয়ার্স কোয়ালিটি দেখে। আমার মনে হয় আগের আবাহনী যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আপনি তাদের মাঠের ক্রিকেটে ছোট করে দেখতে পারবেন না। নামগুলো দেখলেও পাবেন, পারফরম্যান্স দেখলেও পাবেন।'
তবে এবার ছিল এক ভিন্ন পথচলা, 'এবার মাঠের ক্রিকেটে ওই রকম ভারী নামগুলো পাবেন না, ওইভাবে স্ট্রাটেজি সাজিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে হয়েছে।'
মাঠে শুধু প্রতিপক্ষ নয়, ইতিহাসের সব সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যিকারের ক্রিকেট খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এবারের আবাহনী। যেন তীব্র আলোয় ধুয়ে ফেলা এক শিরোপার গল্প।