পেহেলগামের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তানের হুমকি ও পাল্টা হুমকি চলছেই। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদীরা মোদি সরকারের ওপর পাকিস্তানকে হামলার জন্য চাপ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানও পাল্টা হামলা করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। নানা ঘটনায় দুই দেশের মধ্য উত্তেজনা বাড়ার ফলে উপমহাদেশের মানুষ যুদ্ধ আশঙ্কায় রয়েছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটছেই।
শনিবার মধ্যরাতে পাকিস্তানের সমুদ্র বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক নির্দেশে নিজেদের সমুদ্রবন্দরে ভারতীয় জাহাজ প্রবেশ বন্ধ করেছে। বিবৃতিতে জানানো হয়, এখন থেকে ভারতীয় পতাকাবাহী কোনো জাহাজ পাকিস্তানের বন্দরে ঢুকতে পারবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সমুদ্র অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে, শনিবার পাকিস্তান থেকে সব ধরনের আমদানি নিষিদ্ধ করে ভারত। সেই সরকার জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার জেরে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত, আকাশপথ বন্ধ, পাকিস্তানিদের ভিসা বাতিলসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। একই দিন, পাকিস্তান ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাও চালিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ৪৫০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটির সফল পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, এই উৎক্ষেপণের লক্ষ্য ছিল সেনাদের অপারেশনাল প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম এবং উন্নত ম্যানুভারেবিলিটি বৈশিষ্ট্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করা।
আলজাজিরা জানিয়েছে, প্রচলিত এবং পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম এই কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছে ১৮ শতকের আধুনিক আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ শাহ আবদালির নামে, যিনি ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যে এই ধরনের পরীক্ষা করাকে ভারত ‘উসকানি’ হিসেবে দেখছে বলেই সে দেশের গণমাধ্যম প্রচার করছে। অন্যদিকে, সিন্ধু পানিচুক্তির বিষয়ে পাকিস্তান কঠোর বিবৃতি দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ হুমকি দিয়েছেন যে, সিন্ধু নদীতে ভারতের নির্মিত কোনো কাঠামো যদি সিন্ধু পানিচুক্তির বিরোধী হয়, তবে পাকিস্তান সেটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানবে। শুক্রবার পাকিস্তানের জিও নিউজ চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠানে আসিফ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে, যদি তারা (ভারত) কোনো ধরনের কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করে, তাহলে আমরা তা গুঁড়িয়ে দেব।’ তিনি বলেন, সিন্ধু নদীতে যে কোনো নির্মাণ পাকিস্তানের প্রতি ভারতের ‘আক্রমণাত্মক মনোভাব’ হিসেবে বিবেচিত হবে। ‘আক্রমণ মানে শুধু কামান বা গুলি ছোড়া নয়; এর অনেক রূপ আছে। তার মধ্যে একটি হলো পানি আটকানো বা ঘুরিয়ে দেওয়া, যা অনাহার ও তৃষ্ণায় মৃত্যুর কারণ হতে পারে’ তিনি যোগ করেন। তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষের সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। যদিও অনেক দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে।’
যুদ্ধংদেহী মনোভাব কেবল দুই দেশের মধ্যেই নয়, এর প্রভাব আন্তর্জাতিকভাবেও পড়ছে। আবার পাকিস্তানকে দেওয়া ঋণ পুনর্বিবেচনার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ভারত। এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। পাকিস্তান গত বছর আইএমএফ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি সহায়তা প্যাকেজ পেয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নতুন করে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদিত হয়। প্যাকেজটি পাকিস্তানের ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদ বলছে, এ সহায়তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক এবং এটি ডিফল্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে দেশকে বাঁচিয়েছে। শুক্রবার ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে সব ধরনের পণ্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আমদানি ও ট্রানজিট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও জননীতির স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পেহেলগাম হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একমাত্র বাণিজ্য পথ ওয়াঘা-আটারি ক্রসিং ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভারতের দাবি, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো পাকিস্তানে যেসব আর্থিক উৎস সন্ত্রাসবাদে সহায়তা করে, তা বন্ধ করা।
এদিকে গতকাল ভারতের বিমান বাহিনী প্রধান মার্শাল এ.পি সিং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ একান্তে বৈঠক করছেন। এরপরই নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দিনেশ কে ত্রিপাঠি সর্বশেষ অবস্থা মোদিকে জানান। মজার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তান এবং চীনের মধ্যে যে সুসম্পর্ক রয়েছে, সে কারণে কি ভারত বিমান বাহিনী বা নৌবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকবে? চীন এই পরিস্থিতিতে কতটা পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে এটাই বর্তমানে মুখ্য বিষয়। কারণ চীন যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে, যুদ্ধ চেহারা অন্যরকম হতে বাধ্য। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশে শরণার্থী স্রোত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট একযোগে আঘাত হানতে পারে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুই পরাশক্তির মধ্যে বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে?
আসলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চাপানউতোর নতুন কোনো ঘটনা নয়। এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রায়ই নানা ব্যাপারে উত্তেজনা লেগেই থাকে। বর্তমানে যা তুঙ্গে। এর জেরে নানা সময় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তবে দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মধ্যে যদি বড় ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাস্তব রূপ নেয়, তবে তার পরিণাম হতে পারে অচিন্তনীয়। সেই আতঙ্ক কেবলি বাড়ছে।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক
faiz@dhaka.net