যেভাবে ধরা দিল বায়ার্নের ‘জেমস বন্ড’ হ্যারির প্রথম শিরোপা

সবকিছুই হয়তো ছিল, কিন্তু ট্রফির অভাবটা যেন হ্যারি কেইনের গায়ে লেগেই ছিল। ক্লাব হোক কিংবা দেশ—সমালোচকদের অভিযোগ ছিল একটাই: কিছু জিততে পারেননি। টটেনহ্যাম হটস্পারে কাটানো দীর্ঘ ক্যারিয়ার, ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। কেইনের ঝুলিতে এত কিছু থাকার পরও শুধু ছিল না একটি ট্রফি। অবশেষে সেই ট্রফির স্বাদ তিনি পেলেন। বুন্দেসলিগা শিরোপা জিতে ক্লাব ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ট্রফির স্বাদ পেয়েছেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার।

কেইনের ক্যারিয়ারের ১৪ বছরের অপেক্ষার অবসান হলো। সেটাও এমন এক ম্যাচে যেখানে আসরে ৫ হলুদ কার্ড দেখে তিনি ছিলেন মাঠের বাইরে দর্শকের আসনে। গত শনিবার লাইপজিগের বিপক্ষে বিপক্ষের ম্যাচটিতে তিনি খেলতে পারেননি। ম্যাচটিতে জিতলেই শিরোপা ঐদিন নিশ্চিত হয়ে যেত বাভারিয়ানদের। কিন্তু সেদিন ৩-৩ গোলে ড্র করে অপেক্ষায় থাকতে হয়। সেদিনই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল শিরোপা। তবে ড্র হওয়ায় গাণিতিক সমীকরণের জটিলতায় অপেক্ষায় থাকতে হয়। যাদের সঙ্গে ছিল এই সমীকরণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই বায়ার লেভারকুজেন রবিবার রাতে ফ্রাঙ্কফ্রুটের বিপক্ষে ড্র করলে অপেক্ষায় ফুরোয় বায়ার্নের। শিরোপা হয় পুনরুদ্ধার। কেইন পেয়ে যান ক্যারিয়ারের প্রথম শিরোপা।

বায়ার্ন যখন শিরোপা খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল, ঠিক তখন এক সাক্ষাৎকারে ইংলিশ অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘অনেকেই কেবল এটা নিয়েই কথা বলে যে আমি এখনো কোনো শিরোপা জিতিনি। তাদের একটু চুপ করানোও ভালো লাগবে।’

কথা রেখেছেন কেইন। সমালোচকদের মুখ করেছেন বন্ধ। তবে সেই ম্যাচে তিনি ছিলেন দর্শক হয়ে। তবে তাতে দুঃখ নেই জানিয়ে স্কাইস্পোর্টসকে ৩১ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার বলেছিলেন, ‘এটাই বুঝি আমার কাহিনি, লাইপজিগ ম্যাচটা মিস করলাম। তবু কোনো দুঃখ নেই, আমি সবচেয়ে বেশি উদযাপন করব।’

ম্যাচের শেষ মুহুর্তে বায়ার্ন যখন ৩-২ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল, কেইন তো মাঠের পাশ পর্যন্ত চলে এসেছিলেন শিরোপা উদযাপনের জন্য। কিন্তু যোগ করা সময়ে লাইপজিগের গোলের কারণে অপেক্ষাটা একদিন পিছিয়ে যায়। পরদিন যখন দ্বিতীয় স্থানে থাকা লেভারকুজেন ফ্রাঙ্কফ্রুটের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে, তখন নিশ্চিত হয় বায়ার্নের শিরোপা।

সেই সঙ্গে শেষ হয় সেই পুরনো প্রশ্ন—হ্যারি কেইনের ঝলমলে ক্যারিয়ার কি আদৌ কোনো ট্রফি ছাড়া শেষ হবে? ইংল্যান্ড সতীর্থ এরিক ডায়ারসহ বায়ার্নের টিমমেটদের সঙ্গে লেভারকুজেন ম্যাচ দেখছিলেন কেইন। ম্যাচ শেষে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন ‘We are the champions’ গাওয়া একটি ভিডিও।

তার শিরোপা উদযাপনে উচ্ছ্বসিত বায়ার্ন ও টটেনহ্যামের সাবেক স্ট্রাইকার জার্গেন ক্লিন্সমান বিবিসিকে বলেন, ‘আমি ওর জন্য খুবই খুশি, কারণ শিরোপাটা তার প্রাপ্য। গত ১০ বছরে সে যা করেছে, তা অসাধারণ। সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এবং সে এখনো ফিট, ক্ষুধার্ত, এবং সেরা।’

তবে কেইনের যাত্রাটা কখনোই স্টারদের মতো ছিল না। টটেনহ্যামের বয়সভিত্তিক দলে থাকাকালীন তিনি সেরা প্রতিভার তালিকায়ও ছিল না। এরপর লেইটন ওরিয়েন্ট, মিলওয়াল, লেস্টার এবং নরউইচে ধারাভিত্তিক কঠিন সময় পার করে মূল দলে জায়গা করে নেন। সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ক্লাব ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে—৪৩৫ ম্যাচে ২৮০ গোল। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল, লিগ কাপ ফাইনাল, ইংল্যান্ডের হয়ে ইউরো ও বিশ্বকাপের ব্যর্থতা—সবকিছু মিলিয়ে ট্রফির খরা থেকেই গিয়েছিল।

কিন্তু ২০২৩ সালের আগস্টে যখন কেইন ১০০ মিলিয়ন ইউরোতে বায়ার্নে যোগ দিলেন, তখন অনেকেই ভাবলেন, এবার বুঝি ট্রফির অভাব ঘুচবে। কিন্তু অভিষেকেই আরবি লাইপজিগের কাছে সুপার কাপে ৩-০ গোলের হার, তারপর জার্মান কাপ থেকে বিদায়—ট্রফি-আকালের ধাক্কা তখনো পিছু ছাড়েনি।

এ নিয়ে জার্মানির এআরডি রেডিওর ধারাভাষ্যকার তাওফিক খলিল বলেন, ‘মানুষ তখন মজা করে বলত—হ্যারি কেইন এলো, আর বায়ার্ন কোনো ট্রফি জিতল না! তবে সে জানত, বায়ার্নেই সে ট্রফি জিততে পারবে।’

বায়ার্নে আসার পর থেকেই নিজেকে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন কেইন। বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারদের তালিকায় থাকতে চান, সে লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামেন। বায়ার্নে ৯ নম্বর জার্সি এক ঐতিহ্যের প্রতীক। জার্ড মুলার থেকে লেভানদোফস্কি—সবাই সেই স্থানকে সম্মানের আসনে রেখেছেন। কেইন সেটাই ধরে রেখেছেন।

এ নিয়ে খলিল বলেন, ‘ওর মধ্যে কোনো অহংকার নেই। স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে। মিডিয়া জোনে কথা বলতে চায় না হলে বিনয়ের সঙ্গে বলে দেয়। বাকিরা হেডফোন পরে চলে যায়, কিন্তু কেইন সম্মান দেখায়।’

মিউনিখের সংস্কৃতিতে মিশে গেছেন তিনি। অক্টোবার ফেস্টে গিয়েছেন, ভক্তদের সঙ্গে দেখা করেছেন, এমনকি জার্মান শেখার চেষ্টাও করছেন। ক্লাবের সিনিয়র সদস্যদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেমন থমাস মুলার, এরিক ডায়ার ও কনরাড লাইমার।

ক্লাব ক্যারিয়ারে ছয়টি ফাইনালে হারের পর এবার অবশেষে সাফল্য এলো। এই মৌসুমে তিনি করেছেন ৩৬ গোল, এর মধ্যে ২৪টি বুন্দেসলিগায় ও ১১টি চ্যাম্পিয়নস লিগে। তার গড় গোলসংযোগ প্রতি ৭২ মিনিটে একটি, এবং তিনি এরইমধ্যে বুন্দেসলিগায় দ্রুততম ৬০ গোলের রেকর্ড গড়েছেন—মাত্র ৬০ ম্যাচে।

তাকে নিয়ে তাই বায়ার্নের প্রেসিডেন্ট উলি হোয়েনেস বলেন, ‘সে দৌড়ায়, লড়াই করে, অসাধারণ গোল করে। এই ট্রফির যোগ্য সে-ই সবচেয়ে বেশি।’

এখন বায়ার্নের চোখ ক্লাব বিশ্বকাপের দিকে, যা এবছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বাদ পড়ার পর থেকেই বায়ার্ন ক্লাব বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবছে বলে জানান খলিল। তিনি বলেন, ‘এটা একটা আন্তর্জাতিক ট্রফি, এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’

কেইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন থাকলেও, ২০২৭ সাল পর্যন্ত তার চুক্তি এবং দল ও ভক্তদের ভালোবাসা দেখে মনে হচ্ছে, অন্তত আরও একটি মৌসুম তো থাকছেই। এ নিয়ে খলিল বলেন, ‘আমি মনে করি সে পরের মৌসুমেও থাকবে। ওকে বাদ দিয়ে কিছু ভাবা সত্যিই নির্বুদ্ধিতা হবে।’