বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) প্রথম নারী ভিসি হিসেবে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন। নিয়োগের দেড় মাসের মাথায় পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। সেই থেকে গত সাত মাস ধরে এভাবেই অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
সম্প্রতি উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা, এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রশাসনিক পদে বসানোর অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীরা টানা তিন সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে এক ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষার্থী তিনবার আর্থিক সহায়তা চেয়ে সাড়া না পেয়ে মারা যান, যা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মঙ্গলবার (৬ মে) শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষিত ‘প্রশাসনিক শাটডাউন’ কর্মসূচিতে উপাচার্য, প্রোভিসি ও ট্রেজারারসহ পাঁচটি প্রশাসনিক দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে ‘মৃত প্রশাসন’ লেখা একটি কফিন বক্স রেখে আসে। এর আগে গত সোমবার (৫ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নিচ তলায় শিক্ষার্থীরা আড়াই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি শেষে বিক্ষোভ মিছিল করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি উপাচার্যের অপসারণ ও পাতানো সিন্ডিকেট সভা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তার বাসভবনের ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেন। এ ঘটনায় উপাচার্য প্রধান সাক্ষী হয়ে ৩২ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
এরপর গত ১৩ এপ্রিল উপাচার্যের নির্দেশে রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক নোটিশে অধ্যাপক মুহসিন উদ্দীনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে তাকে সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর চার দফা দাবিতে আবার আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।
দাবিগুলো হলো- অধ্যাপক মুহসিন উদ্দীনকে পুনর্বহাল, রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামকে অপসারণ, ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারের দোসর শিক্ষকদের বিভিন্ন কমিটি থেকে অপসারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমান উন্নয়ন না করে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন করায় উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া।
গত ২৭ এপ্রিল রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ দাবি করে কুশপুত্তলিকা দাহ করেন এবং রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে তালা দেন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রারকে (নিরাপত্তা) এম সানোয়ার পারভেজ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (৪ মে) সিন্ডিকেট সভায় মনিরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। এদিকে এর পরদিন সোমবার (৫ মে) সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শূচিতা শরমিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
তবে উপাচার্যের এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে দুপুরে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে। এ সংবাদ সম্মেলনে তারা উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। দাবি না মানলে দক্ষিণবঙ্গ অচলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
অভিযোগ রয়েছে ড. শূচিতা শরমিন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনকে পাশ কাটিয়ে পছন্দের লোক নিয়োগ দিয়েছেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষে সরাসরি কাজ করা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। এদের অনেকের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম সাবেক প্রক্টর ড. আব্দুল কাইয়ুমকে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কমিটির অর্থ বণ্টন কমিটির আহ্বায়ক করে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন। আবুল খায়ের আব্দুল্লাহর নৌকা প্রতীকের নির্বাচনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল বাতেন চৌধুরীকে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (ক্লাস্টর-১) আহ্বায়কের দায়িত্ব। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (ক্লাস্টর-২) আহ্বায়ক করা হয়েছে সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাইয়ুমকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরে পটুয়াখালীর সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুন্নেছা ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সুলতান আহমেদ মৃধার ছেলে মাসুম আতিকুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক সুমন সেরনিয়াবাতের চাচা শ্বশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমানকে করা হয়েছে উপাচার্যের একান্ত সচিব। বাউফল উপজেলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোশারেফ হোসেন খানের জামাতা ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমানকে যুক্ত করা হয়েছে উপাচার্যের দপ্তরে। শুধু তাই নয়, বিগত কয়েক দিনে গঠিত পাঁচটি কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে তাকে। বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্যু ক্লার্ক বনি আমিনকে সংযুক্ত করা হয়েছে রেজিস্ট্রারের দপ্তরে।
এছাড়া আওয়ামী লীগের দলীয় পদে থাকা রেজিস্ট্রারের মেয়াদ শেষ হলেও পুনরায় তাকে কাজে ফেরানো, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে উপাচার্যের মামলা ও জিডি, নিয়ম-বহির্ভূতভাবে সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল থেকে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়াসহ আরও কিছু অভিযোগে চলমান উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
উপাচার্য ড. শূচিতা শরমিন দায়িত্ব নেওয়ার দেড় মাসের মাথায় ববির অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলসহ গুরুত্বপূর্ণ তিন কমিটিতে মনোনয়ন দেওয়া হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে। বেরোবির উপাচার্য থাকাকালীন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য বিতর্কিত অধ্যাপক কলিমউল্লাহকে মনোনয়ন দিয়ে প্রথমবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পড়েন অধ্যাপক শূচিতা শরমিন।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের অবসরে যাওয়ার কথা। কিন্তু সিন্ডিকেটের অনুমোদন না নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে তাকে প্রশাসনিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন উপাচার্য। এছাড়া ভিসির একক ও বিধি-বহির্ভূত সিদ্ধান্তে রেজিস্ট্রার ও উপাচার্যের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে পছন্দের মানুষকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেন। যদিও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে কয়েকশ আবেদন জমা পড়েছিল। এ দুই কর্মকর্তার বেতন-ভাতার প্রস্তাবসংক্রান্ত নথি ট্রেজারারের অনুমোদন ছাড়াই বর্তমান উপাচার্য একক স্বাক্ষরে অনুমোদন করেছেন।
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মোকাব্বেল শেখ বলেন, ক্যাম্পাসের চলমান অচলাবস্থা উপাচার্যের অদূরদর্শিতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ও দাবি-দাওয়া তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা করেন। এরপর যৌক্তিক দাবি নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে শিক্ষার্থীদের নামে জিডি করেন। এভাবে উপাচার্যের একের পর এক অপরিণামদর্শী কার্যক্রমে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ অচলাবস্থার একমাত্র সমাধান সরকারের হস্তক্ষেপে উপাচার্যকে অপসারণ।
ববিতে চলমান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ও বরিশাল মহানগরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শাহেদ বলেন, তিন সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। উপাচার্য চাইলে বহুবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসতে পারতেন, আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি একবারও সে চেষ্টা করেননি। তার এখন অন্তিমপর্ব। আমরা তার সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাচ্ছি না । তার পদত্যাগ চাই।
জানতে চাইলে ববি ট্রেজারার ড. মামুন অর রশিদ বলেন, উপাচার্য নিজস্ব মতামত দিয়ে প্রশাসন চালাচ্ছেন। আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেন না। এমনকি আর্থিক সিদ্ধান্তও এককভাবে নিচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, ট্রেজারার ও উপ-উপাচার্যকে উপেক্ষা করে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে। এককভাবে তিনি সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই। উপাচার্য আমাকে দাপ্তরিক কোনো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি।
সার্বিক পরিস্থিতি জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সোনিয়া খান সনি বলেন, প্রশাসন কাজ করছে। চলমান পরিস্তিতিতে প্রশাসন যে পদক্ষেপ নেবে তা পরে জানতে পারবে।
জানতে চাইলে উপাচার্য ড. শূচিতা শরমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্থিতিশীল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যারা আমার আস্থাভাজন নন, তারা আমাকে বিপদে ফেলছেন। আন্দোলনগুলো এমনি এমনি হচ্ছে না।
তিনি জানান, রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি আর থাকবেন না, এবং যেসব শিক্ষার্থী মুচলেকা দেবে, তাদের মামলা প্রত্যাহার করা হবে।