যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ

বায়ুমান পর্যবেক্ষণে সংকটে বাংলাদেশসহ ৪৪টি দেশ

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪৪টি দেশ গুরুতর তথ্য সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্স অন এনার্জি এন্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ)। 

সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, অবিলম্বে এই দেশগুলো বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে না পারলে জনস্বাস্থ্য, নীতিনির্ধারণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

উল্লেখ্য, ঢাকাসহ বিশ্বব্যাপী মার্কিন দূতাবাসগুলোতে স্থাপিত যন্ত্রের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শহরের বায়ুমান (পিএম ২.৫) দীর্ঘদিন যাবত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। যা নিয়মিত প্রকাশ করা হত ইউএস স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট পরিচালিত এয়ারনাউ ওয়েবসাইটে। কিন্তু গত ৪ মার্চ থেকে অর্থ সংকটের কারণে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে বাংলাদেশসহ বায়ু দুষণের শিকার শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো তথ্যগত নানা ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে করছে (সিআরইএ)।       

সিআরইএ বলছে, মার্কিন তথ্য সরবরাহ বন্ধের ফলে ৬টি দেশ সম্পূর্ণভাবে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা হারিয়েছে, ২৮টি দেশ সরকার অনুমোদিত গ্রেডের বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা হারিয়েছে এবং ১৬টি দেশকে অবিলম্বে এই ধরনের যন্ত্রের প্রবেশাধিকারের পর্যালোচনা করতে হবে।

কমপক্ষে ১৩টি দেশে, মার্কিন দূতাবাসের পর্যবেক্ষণ যন্ত্রই ছিল রেগুলেটরি-গ্রেড বায়ু মান তথ্যের একমাত্র উৎস। যার মধ্যে ৯টি দেশ আফ্রিকায় (কোট ডি'ভোয়ার, গিনি, মালি, বুরকিনা ফাসো, টোগো, সুদান, গ্যাবন, চাঁদ ও কঙ্গো), ৩টি এশিয়ায় (তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, ও ইরাক), এবং ১টি ক্যারিবীয় অঞ্চলে (কুরাকাও)।

২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন দূতাবাসে স্থাপিত পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ও তথ্য ভাগাভাগির ফলে পিএম ২.৫ (সূক্ষ্ম বস্তুকণা) ঘনত্বে প্রতি ঘনমিটারে ২ থেকে ৪ মাইক্রোগ্রাম হ্রাস পেয়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি।

২০১৯ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন দুতাবাসের তথ্যের কারণে অনেক দেশে বায়ুদূষণ কমে যাওয়া অকাল মৃত্যুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে কমে যায়। এতে প্রতিটি শহরে বার্ষিক অর্থনৈতিক লাভ হয়েছে কমপক্ষে ১২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদি কেবল দূতাবাসের ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মানুষ উপকৃত হন ধরে নেওয়া হয়। আর পুরো শহর উপকৃত হলে এই সুবিধা ৪৬৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

অকাল মৃত্যুর দিক থেকে দেখা যায়, ১০ কিমি ব্যাসার্ধে কমপক্ষে ৩০৩টি মৃত্যুর ঘটনা এড়ানো গেছে এবং পুরো শহর বিবেচনায় ৮৯৫টি অকাল মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া গবেষণাটি আরও দেখায়, এই পর্যবেক্ষণ যন্ত্রগুলি গড়ে প্রতি দূতাবাসে বছরে ৩৩,৯৭১ ডলার পরিমাণ কষ্টভাতা (hardship payment) সাশ্রয় করেছে। অথচ যন্ত্রগুলোর বাৎসরিক ব্যয় মাত্র ৯,৭১২ ডলার।

যেখানে কম খরচের বায়ু মান পর্যবেক্ষণ যন্ত্র জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে স্থাপিত রেগুলেটরি-গ্রেড যন্ত্রগুলি সেই কমদামী যন্ত্রগুলিকে যাচাই ও মান নির্ধারণে সহায়তা করে।

সিআরিএ এর প্রধান বিশ্লেষক লাউরি মিল্লিভির্টা বলেন, উচ্চমানের ও উন্মুক্ত বায়ু মানের তথ্য বৈশ্বিক বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূলভিত্তি। এয়ারনাউ এর তথ্যপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখনই জরুরি ভিত্তিতে উচ্চমানের বায়ুমান পরিমাপ শুরু করা প্রয়োজন, যাতে তথ্যের প্রবাহ বজায় থাকে এবং দূতাবাস পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির বহুবিধ সুফল অব্যাহত রাখা যায়।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়াটা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। ফলে নির্মল বাতাসে মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছে কি-না এতোদিন ইউএস দূতাবাসের তথ্যে জানা যেত। কিন্তু গত একমাস থেকে আমরা তা পাচ্ছি না। এতে জনগণ সঠিক তথ্য পাচ্ছে না, সরকার ডিসিশন নিতে সমস্যায় পড়ছে এবং বিশেষজ্ঞরা তথ্য সংকটে পড়ছেন। এই সুযোগে বায়ু দুষণ আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।