দুই ঘণ্টার ফুটবল, সাতটি গোল, দশবারের মতো ম্যাচের গতি ও ফলাফলের পালাবদল, একাধিক হৃদয়ভাঙা মুহূর্ত, আর অবিশ্বাস্য এক সমাপ্তি এই ম্যাচ কোনো স্ক্রিপ্টেড সিনেমা নয়, বরং বাস্তব ফুটবলের সর্বোচ্চ রূপ। বার্সেলোনার বিপক্ষে ইন্তার মিলানের ৪-৩ (দুই লেগে ৭-৬ গোল গড়ে) ব্যবধানে জয় যেন এক ফুটবল-উপন্যাসের মহাকাব্যিক অধ্যায়। ফলাফল বলছে বার্সেলোনাকে হারিয়ে ইন্তার মিলান নাম লিখিয়েছে ৩১ মে মিউনিখের আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় হতে যাওয়া এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে।
সান সিরোয় মঙ্গলবার রাতে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগটি মোটা দাগে তিন অঙ্কে ভাগ করা যায়। প্রথমার্ধ পর্যন্ত একটি, দ্বিতীয়ার্ধের ৮৭ মিনিট পর্যন্ত দ্বিতীয়টি আর তারপরের অংশটুকু নিয়ে তৃতীয়টি। প্রথম অঙ্কে নিশ্চিতরূপে দাপট স্বাগতিক ইন্তারের। ২১ মিনিটে ডেনজেল ডামফ্রিসের স্বার্থত্যাগ করা পাসে লাউতারো মার্তিনেজের জালভেদ দিয়ে শুরু। ওই লাউতারোকে ট্যাকল করায় ভিএআরে পাওয়া পেনাল্টি থেকে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে তুর্কি অধিনায়ক হাকান কালহানগলুর লিড বাড়িয়ে নেওয়া। এই অঙ্কে নির্দ্বিধায় ইন্তার সেরা। বার্সার মাঠ থেকে নিয়ে আসা ৩-৩ গোলের ব্যবধানটা ততক্ষণে বেড়ে ৫-৩। এই অবস্থায় শুরু নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক। যেখানে ফিনিক্স পাখির মতো জ্বলন্ত ছাই থেকে উঠে আসার প্রতীক বার্সেলোনা। ৫৪ মিনিটে এরিক গার্সিয়ার গোলে শুরু। দুই মিনিট পর সম্মিলিত আক্রমণ থেকে আরও একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া, ৬০ মিনিটে দানি ওলমোর নিখুঁত হেডার। দুটি গোলেরই জোগানদাতা জেরার্ড মার্টিন। ম্যাচে এসে পড়ে সমতা। দ্ইু লেগ মিলিয়ে ৫ গোল হজম করার পর সবকটি ফিরিয়ে দেওয়ার যে গল্প বার্সা লেখে- তা অনবদ্য। এরপর মাঠ জুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য কাতালানদের। ইন্তারকে মনে হচ্ছিল ভীষণ বিমর্ষ। ৮৭ মিনিটে রাফিনহার জোরালো শট একবার ঠেকিয়েও দেন ইয়ান সোমের। কিন্তু রিবাউন্ডে নেওয়া শটটি জায়গা করে নেয় ইন্তারের জালে। দুই লেগ মিলিয়ে প্রথমবারের মতো বার্সার লিড। আনন্দে উদ্বেল বার্সা ডাগআউট। ১০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠতে ইতিহাস বদলে ফেলার দ্বারপ্রান্তে বার্সা। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের শীর্ষ এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের মাঠে কখনোই সেমিফাইনালে হার না মানা ইন্তার দুরূহ পরিস্থতিতে কিন্তু!
নাটকের তৃতীয় অঙ্ক তখনো বাকি। সান সিরোয় চ্যাম্পিয়নস লিগে ৯৭২ দিন অপরাজিত (১৫ ম্যাচের ১২টিতে জয়, ৩টিতে ড্র) থাকা ইন্তার হাল না ছাড়ার পণ করল যেন। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ডামফ্রিসের ক্রস থেকে গোল করে বার্সাকে স্তব্ধ করে দেন সেন্টারব্যাক ফ্রান্সেসকো আচেরবি। মনে হচ্ছিল, যেন রূপকথার দেবদূত নেমে এসেছে সান সিরোতে। বিশ্বাস না হলে তার শরীরে খোদাই করা ডানাওয়ালা ট্যাটুর দিকে তাকালেই যথেষ্ট। ইউরোপে আচেরবির ক্যারিয়ারে করা প্রথম এই গোলই ম্যাচটিকে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের নবম মিনিটে ইরানি স্ট্রাইকার মেহদি তারেমির পাস থেকে দারুণ এক গোলে ইন্তারকে চালকের আসনে বসিয়ে দেন দলটির ‘ক্রাইসিস ম্যান’ হয়ে ওঠা দাভিদে ফ্রাত্তেসি। ২৫ বছর বয়সী এই ফ্রাত্তেসির গোলেই কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে বায়ার্ন মিউনিখকে তাদেরই মাঠে হারিয়েছিল ইন্টার।
ম্যাচ শেষে ইন্তার ম্যানেজার সিমোনে ইনজাগির অনুভূতি ছিল দর্শকের মতোই রোমাঞ্চিত। মুখে ছিল এক দার্শনিক মন্তব্য, ‘হ্যাঁ, আমরা কষ্ট পেয়েছি। তবে কষ্ট ছাড়া তো কোনো ফাইনাল হয় না।’ নেরাজ্জুরিদের অধিনায়ক লাউতারো বলেন, ‘আমরা প্রথম দিন থেকেই চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে চেয়েছি। আসলে ইন্তাম্বুলের ফাইনালে হারার পর দিন থেকেই এই চাওয়া গেঁথে গিয়েছিল আমাদের মনে। চলুন সবাই মিলে এই পথচলার শেষটুকু উপভোগ করি।’ বার্সার হয়ে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া লামিন ইয়ামাল লিখেছেন, ‘আমরা নিজেদের সবকিছু দিয়েছি। এই বছর সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমরা ফিরে আসব। আমরা এই ক্লাবকে তার যোগ্য জায়গা শীর্ষে পৌঁছে না দিয়ে থামব না।’ সংবাদ সম্মেলনে বার্সা কোচ হানসি ফ্লিক বলেছেন, ‘খেলোয়াড় ও দলের সম্মান প্রাপ্য। আমরা শিরোপা জিততে চাই। লিগ জিততে চাই। যখন ফিরব, আয়নায় তাকিয়ে খেলোয়াড়রা যেন গর্ব অনুভব করে। চক্রটা শুরু হয়েছে, কিন্তু আমরা এখনো সেরাটায় পৌঁছাতে পারিনি।’
খেলার ধরনই এটা কেউ জিতবে আর কেউ হারবে। তবে কখনো মাঠের খেলা এমন পরিস্থিতি উপহার দেয় যেখানে কোনো দল ছাপিয়ে জিতে যায় খেলাটি। এবারের সেমিফাইনালটি ইতিহাসে সেভাবেই মনে রাখবেন ফুটবলপ্রেমীরা।