সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি চিন্তা চৌবাচ্চা (think tank) ও সুশীল সমাজের কর্মীদের পক্ষ থেকে জাতীয় বাজেটের প্রস্তুতি, প্রস্তাব এবং বাস্তবায়ন ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনার যে প্রবৃদ্ধি (যদিও জিডিপিতে এই প্রবৃদ্ধি প্রতিফলিত হচ্ছে না!) ঘটছে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। আরও লক্ষণীয় যে, বাজেট নিয়ে রাজনীতিতে বিশেষ করে, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে গতানুগতিক প্রশংসা ও কূট সমালোচনাও এবার প্রসঙ্গত উধাও। অন্তর্বর্তীকালে, রাজনৈতিক অর্থনীতি পর্যায়ক্রমে স্রেফ অর্থনীতিমুখিন হওয়ার কথা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নভাবনা বা দর্শন (পরনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ম্ভরতাসহ রপ্তানিমুখিন হওয়া, স্থানীয় শিল্পোদ্যোগকে সুরক্ষা দিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকসইকরণ, অন্ন বস্ত্র বাসস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান ইত্যাদি) পরিবর্তনের সূচনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যালোচনা ক্রমবর্ধমান আমজনতার সচেতনতার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। এটি যেমন ইতিবাচক দিক, আবার বাজেট প্রাক্কলন এবং বাস্তবায়ন সিদ্ধান্ত প্রদানের নির্দেশনা ওপর থেকেই আসার বশংবদ প্রবণতা, বলা বহুল্য, বিপরীতধর্মী পরিস্থিতি নির্দেশ করবে।
বাজেটে চাহিদা ও সরবরাহের ভাবনা বা প্রস্তাব নিচ থেকে ওঠা উচিত। প্রথা তাই-ই আছে, কিন্তু ওপর থেকে এঁকে দেওয়া নকশায় প্রাক্কলন করা হলে নিচে ক্ষত্রিক পর্যায়ে তা বাস্তবায়নে জটিলতা উদ্ভব হয়, চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় এবং প্রাক্কলন ঘন ঘন পুনর্বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যা প্রকারান্তরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে ফেলে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। শিল্প ও বণিক সমিতির পক্ষ থেকে অনুযোগ উঠছে, বাজেট বক্তৃতায় বিধৃত বক্তব্যের সঙ্গে অর্থবিলে প্রস্তাবিত ফিসক্যাল মেজারসগুলোর সমিল খুঁজতে কষ্ট হয়। পরস্পরবিরোধী কিংবা স্ববিরোধিতার বশংবদ অবস্থা ব্যবস্থার অবসান হওয়া উচিত। অন্তত নিরপেক্ষ সময়ের এই বাজেটে, বাজেটের মূল প্রাক্কলন বড় দাগে সংশোধনযোগ্য হচ্ছে এবং সংশোধিত বাজেট প্রাক্কলনের ওপর নতুন প্রাক্কলনের শতকরা হারে ব্যবধান ব্যাপকভাবে বাড়ছে, সম্পূরক বাজেট পেশ ও পাশের পরাকাষ্টায় নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেওয়ার মতো আত্মঘাতী প্রয়াস প্রচেষ্টা প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠছে।
ইতিমধ্যে ক্রমশ এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, বাজেট বড় কিংবা উচ্চাভিলাষী হওয়ার সমালোচনা ফিকে হয়ে আসছে এ কারণে যে, বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য না হলে উচ্চমাপের বাজেট বানানো আয়-ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই সমূহ সমস্যার সৃষ্টি করে। সুতরাং বাস্তবায়নযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বা রেখেই বাজেটের আকার বাড়ানো বা কমানোর যৌক্তিকতা খুঁজতে হবে। এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই যে, বাংলাদেশের বাজেট আয় (ট্যাক্স জিডিপি রেসিও বর্তমানের ১০.৩ থেকে কমপক্ষে ১৫ পৌঁছানো পর্যন্ত) এবং ব্যয় (বর্তমানে জিডিপির ১৭.৪% থেকে ন্যূনতম ২৫% পর্যন্ত) উভয় ক্ষেত্রেই বড় করার সুযোগ-সম্ভাবনা-যৌক্তিকতা সবই রয়েছে। ব্যয় বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারলে বা সক্ষমতা অর্জিত না হলে এবং খাত ও ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ব্যতিরেকে আয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ধরলে, অগ্রগতি অর্জন আর পুষ্টিকর পথে থাকে না। আর তা না থাকলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সক্ষমতা অনুপাতে বাড়বে না, নানান রোগ-শোকে হতাশা ও অপব্যবহারে বখাটে (ংঢ়ড়রষবফ) হয়ে যেতে পারে। বয়স ও খায় খাদ্য অনুযায়ী যে বাবুর (শিশু) গ্রোথ (ওজন, মেধা ও উচ্চতা) যেখানে ১০-১২ হওয়ার কথা সেখানে ৭-৮ দেখেই আহ্লাদে আটখানা হওয়ার মতো অবিবেচক অভিভাবকের সমালোচনার শেষ থাকে না।
বর্তমান প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটে সম্পূরক ও নতুন বাজেটে আয় ব্যয়ের উভয় প্রাক্কলনই স্বাভাবিক ও বাস্তবায়নানুগ হওয়ার আবশ্যকতা থাকবে। ব্যয়ে অস্বাভাবিক বরাদ্দ বাড়লে কিংবা কমলে অনুৎপাদনশীল খাতে অস্বচ্ছ ও অসাশ্রয়ী ব্যয় বাড়ে এবং অবকাঠামোগত কার্যকর ব্যয় কাটছাঁটের শিকার হয়। তেমনি আয়ের অস্বাভাবিক প্রাক্কলন হলে, তা অর্জনে শিষ্টের দমন ও দুষ্টের পালন প্রক্রিয়াই প্রসার লাভ করে।
বেসরকারি বিনিয়োগের ক্রমহ্রাসমান পরিস্থিতি তলানিতে পৌঁছিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির শতাংশ হারের হ্রাস-বৃদ্ধি বাস্তসম্মত করা যাবে না। স্রেফ রাজনৈতিক উচ্চ অভিলাষে সরকারি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি ব্যাহত হয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অবৈধ উপায়ে মূলধন পাচারের কারণে অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত মূলধন গঠনের অভাব রয়েছে, যা জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে বাড়তে দিচ্ছে না।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪-এর পলায়ন পর্ব পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৫৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার অর্থ অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। ২০১০ সালে অবৈধ অর্থ পাচারের পরিমাণ ৫৪০ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ছিল, যা ২০২৩ সালে প্রায় তিনগুণ দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে অব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল তদারকি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজের দুর্বলতা সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পথে যে বাধা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, তা দূর করা আবশ্যক।
প্রত্যাশা থাকল, সাধ আর প্রাপ্তির মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়াস প্রতিফলিত হওয়া সমীচীন হবে সদ্য সমাপ্তির ও নয়া বাজেটে। প্রসংগত যে, পতিত সরকারের বাজেটটি যথাসময়ে সংশোধন না করে পুরো অর্থবছরটি কাঁধে চেপেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের । অথচ ২৪-এর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রত্যাশা মিটিয়ে আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে, অনেক কিছু করার ছিল বা আছে। এ জন্য প্রগতিশীল করনীতি অনুসরণ, কৃষি প্রণোদনা, ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির রূপরেখা বাজেটে প্রতিফলিত হতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে গুরুত্বসহ ২০২৬-এ গ্র্যাজুয়েশন লাভের পথপরিক্রমা স্পষ্ট করা আবশ্যক। পাশাপাশি এতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার কার্যক্রমে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।
জিডিপির সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানোর বার্তা শুধু নয়, অর্জনের উপায়ও নির্দেশ করতে হবে। দেশের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকি আগের চেয়ে বেশি লাগতে পারে। বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বাড়তি বরাদ্দ দানের মাধ্যমে। কিন্তু শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধির বিষয়ে পথনকশা ও নির্দেশনা থাকা আবশ্যক হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল এবং রপ্তানি আয় জোরদার করার ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। এডিপি হচ্ছে সরকারের বিনিয়োগ ব্যয়, অর্থনীতির আয়। সুতরাং বিকাশমান অর্থনীতির জন্য এডিপি বড় হওয়া উচিত। তবে এডিপি বাস্তবায়ন না করা গেলে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। ‘সবকিছু প্রস্তুত না দেখে’ প্রকল্প অনুমোদিত হলে বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বারবার প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাব করতে হয়। প্রকল্প গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নে কঠোরভাবে সময় বেঁধে দেওয়া, লক্ষ্যমাত্রা ধরে দেওয়া, প্রকল্প পরিচালকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সময় বৃদ্ধি মানে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়া, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতির। এডিপির সফল বাস্তবায়ন অর্থনীতির জন্য উপকার। প্রকল্প যথাসময়ে করা গেলে তা থেকে অর্থনীতি উপকৃত হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হবে। কিন্তু দেরি হলে বঞ্চিত হবে। প্রকল্প থেকে যত দ্রুত উপকার পাওয়া যাবে, ততই এটি জিডিপিতে অবদান রাখতে পারবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ না হওয়ার পেছনে একটি কারণ হলো, যথাসময় এডিপির প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত না হয়েও অর্থ ব্যয় হওয়া। কারণ যে অবকাঠামো বা সেবা আমাদের পাওয়ার কথা, তা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এ জন্য সঠিক সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন করা জরুরি। এটা না করা হলে অর্থনীতিতে সম্পদ সৃষ্টি হবে না, রাজস্ব আয়ও কমে যাবে। বেসরকারি খাতে তেমন বিনিয়োগ নেই। এমন অবস্থায় দেশীয় শিল্প অরক্ষিত হলে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানো দুরূহ হবে। পতিত সরকারের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার যে মহাপরিকল্পনা, তা কবে নাগাদ পূর্ণতা পাবে, তার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা থাকুক বাজেটে।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক
mazid.muhammad@gmail.com