জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শিক্ষক হয়েছেন, শিক্ষকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনিই চবির সর্বপ্রথম উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), যার দায়িত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের আগে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন গবেষণায়। সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকং থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এর আগে তিনি সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জুরিখ থেকে এডভান্স মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। চবির সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সেরা গবেষক হিসেবে তিনি অর্জন করেন রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২২।
নবাগত তরুণ এই প্রশাসকের হাত ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রকাশনা দপ্তর নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রিন ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছে। ক্যাম্পাস নিয়ে প্রশাসনের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আজিম সাগর। আজ থাকছে তার প্রথম পর্ব।
দেশ রূপান্তর: ছাত্র থেকে শিক্ষক হয়েছেন, এখন প্রশাসনের দায়িত্বে আছেন। আপনার অনুভূতি কেমন?
ড. কামাল উদ্দিন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শিক্ষক হওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করার মধ্যে দিয়ে আমার একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। সারা জীবনের অর্জিত বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমি সামনে দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সেবা দিতে চাই।
দেশ রূপান্তর: নিকট অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনেক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আগামী দিনে শিক্ষক নিয়োগে কিভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে?
ড. কামাল উদ্দিন: একটা সময় ছিল যখন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক ভালো ফলাফল, উচ্চ ডিগ্রি ও মেধাবীদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। সে সময়ও কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল, তবে বর্তমান সময়ের মতো এত নির্লজ্জতার দৃষ্টান্ত ছিল না। বিগত ১৫ বছরে অনেকেই ছিল যারা থার্ড ক্লাস পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। ফলে পুরো জাতি দেখেছে, টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভাইবা নাটক সাজিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতো।
তবে এ সমস্যা সমাধানে বর্তমান চবি প্রশাসন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে। ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামের আওতায় শিক্ষক নিয়োগে তিনটি ধাপে পরীক্ষা নেওয়া হবে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর লিখিত পরীক্ষা, পরে ক্লাস প্রেজেন্টেশন নেওয়া হবে এবং সর্বশেষ ভাইবা পরীক্ষা নেওয়া হবে। এই তিন ধাপে যে প্রার্থী সর্বাধিক নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হবে তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগ এবং তাদের পদোন্নতিতে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে আমাদের এই কাজ চালু হয়ে গেছে।
দেশ রূপান্তর: ডি-নথি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আপনাদের কার্যক্রম কতদূর?
ড. কামাল উদ্দিন: পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে অটোমেশনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করা হয়েছে। ডিজিটাল নথি বা ডি-নথি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের অন্যতম পরিকল্পনা হলো, আমরা এখন থেকে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে দক্ষ ও আধুনিক কম্পিউটার জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিবো। তাদেরকেও কয়েক ধাপে পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাছাড়া যারা বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে আছেন তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইউজিসি’র সহায়তায় প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করবো। দুর্নীতি ও কাজের প্রতি অবহেলা দূর করতে আমরা নিয়মিত দক্ষতা বৃদ্ধিসহ শুদ্ধাচার ও সততা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ লোকবল গড়ে তুলবো। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন রেজিস্ট্রার, গ্রন্থাগারিক, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান হিসাব নিয়ামক ইত্যাদি পদে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যোগ্য লোকদের নিয়োগ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত শব্দের অভিশাপ থেকে আমরা বেরিয়ে আসবো।
দেশ রূপান্তর: চাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের পরিকল্পনা জানতে চাই।
ড. কামাল উদ্দিন: চাকসু নির্বাচনের জন্য এর নীতিমালাকে যুগোপযোগী করতে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। সকল অংশীজনের সাথে আলোচনা করে চূড়ান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। রমজানের ঈদের আগে প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছে। তাদের মতামত আমরা শুনেছি। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করবো। তাছাড়া চাকসু নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সকল অংশীজনের সাথে বসে আলোচনা করে নির্বাচনের মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে কমিটি। আশা করি এই বছরের মধ্যেই আমরা চাকসু নির্বাচন করতে পারবো।
দেশ রূপান্তর: বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদ যেমন সিনেট, সিন্ডিকেট, রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট ও ডিন নির্বাচনের বিষয়ে প্রশাসন কী ভাবছে?
ড. কামাল উদ্দিন: বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এসব পর্ষদের নির্বাচন হলো গণতান্ত্রিক নির্বাচন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে সরকারের সবুজ সংকেত নিয়ে এইসব নির্বাচন আয়োজন করবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় এসব নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। তার আহ্বানে এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
দেশ রূপান্তর: Outcome Based Education (OBE) নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পদক্ষেপ গুলো জানতে চাই।
ড. কামাল উদ্দিন: প্রতিটি বিভাগে OBE ব্যবস্থা কার্যকর করতে আমাদের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করছে। কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রচলন করা হবে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নিয়ম থাকলেও তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। শিক্ষার্থীরা তাদের নাম প্রকাশ না করেই মূল্যায়ন করতে পারবে। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা পুনরায় নিরীক্ষার পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে প্রশাসন। এজন্য পরীক্ষার খাতা পুনরায় নিরীক্ষার পদ্ধতির বিষয়টি একাডেমিক কমিটিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স কমিটিতে প্রেরণ করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
দেশ রূপান্তর: শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রশাসনের পদক্ষেপগুলো জানতে চাই।
ড. কামাল উদ্দিন: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে একটা সেন্টার তৈরি করা হবে। সেখানে পরিচালক, সহকারী পরিচালকসহ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হবে। মনোবিজ্ঞান বিভাগের অভিজ্ঞ শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা কাউন্সেলিং এ অংশ নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনা করবে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা কেন্দ্রে নতুন করে দুটি পদ তৈরি করা হয়েছে। একজন নারী সহকারী ও একজন পুরুষ সহকারী থাকবে।
দেশ রূপান্তর: শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণামুখী করতে আপনারা কী ভাবছেন?
ড. কামাল উদ্দিন: শিক্ষার্থীরা শুধু ক্লাসে পাঠ গ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকবে এটা আমরা চাই না। বরং গবেষণা সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সেলের পরিচালক হিসেবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকাশনা নীতিমালা আধুনিকায়ন করতে আমরা কাজ করেছি। এই কাজে আমার সাথে ছিল রিসার্চ সেলের আরেকজন সদস্য নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খাজিদা মিতু। বেশকিছু নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
এরমধ্যে অন্যতম হলো, প্রতিটি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গবেষক নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদেরকে সেই গবেষণায় সম্পৃক্ত করবেন। নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীকে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তাছাড়া তথ্য সংগ্রহে যেন শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হয় সেই নীতিমালাও আমরা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা বাজেট প্রণয়ন করবে।