ইটভাটার দূষণ রোধে নয়া কৌশল

দেশে ইট ভাটার দূষণ কমাতে ও বায়ুর মান উন্নত করতে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী নতুন এক কৌশল উদ্ভাবন করেছেন দেশি-বিদেশি গবেষকরা। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই কৌশলের মাধ্যমে ইট উৎপাদন করলে কার্বন নির্গমন ২০ শতাংশ কমে, জ্বালানি সাশ্রয় হয় ২৩ শতাংশ এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সুফল আর্থিক ব্যয়ের তুলনায় ৬৫ গুণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব পাবলিক হেলথ (বিইউএসপিএইচ) ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), গ্রিনটেক নলেজ সলিউশনস ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকরা এই নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছেন।

গত শুক্রবার আইসিডিডিআর,বি এই গবেষণার তথ্য জানিয়েছে। এই ‘র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড’ নামে এই নতুন কৌশলের ট্রায়ালের ফলাফল আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ৬৫ শতাংশ ইটভাটা মালিক এই কৌশল প্রয়োগ করেছেন। এতে জ্বালানির সাশ্রয় ২৩ শতাংশ কমে এবং পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড ও পিএম ২.৫ নির্গমন ২০ শতাংশ কমে। পাশাপাশি কয়লা খরচ কমে এবং উচ্চমানের ইট উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

গবেষকরা ধারণা করছেন, প্রতি টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর জন্য মাত্র ২ দশমিক ৮৫ ডলার খরচ হয়। এক বছর পর ইটভাটাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই কৌশল ব্যবহার বেড়েছে।

গবেষক দল হিসাব করেছে, প্রতিটন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের ফলে পরিবেশ ও সমাজে যে ক্ষতি হয়, তার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮৫ ডলার। এই কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে কার্বন নির্গমন কমে যাওয়ায় সামাজিক ক্ষতির পরিমাণ আগের তুলনায় ৬৫ ভাগ কমে এসেছে। যদি বাংলাদেশের সব জিগজ্যাগ ইটভাটা মালিকরা এই কৌশল প্রয়োগ করেন তা হলে শুধু একটি ইট পোড়ানোর মৌসুমেই কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ২ দশমিক ৪ টনে কমে আসবে যা দেশের বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ ২ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করবে।

গবেষণায় বলা হয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে কয়লা পুড়িয়ে ইট উৎপাদন করা হয়, যাতে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড, সূক্ষ্ম বস্তুকণা ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ নিঃসরণ হয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে এই খাত মানব স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জ্বালানি-সাশ্রয়ী কৌশল শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারত ও নেপালের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও প্রয়োগ করা সম্ভব। কারণ এসব দেশে ইট উৎপাদনের ধরন অনেকটা একই। এমনকি অন্যান্য শিল্প খাতেও এই পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।

এ ব্যাপারে আইসিডিডিআর,বি-র সহকারী বিজ্ঞানী ও গবেষণার সহ-লেখক দেবাশীষ বিশ্বাস, কঠোরভাবে নিয়মকানুন বাস্তবায়ন না করেও শ্রমিকদের কল্যাণে মনোযোগ দিলে ব্যবসাও লাভবান হতে পারে এমন সমাধান খুঁজে বের করা গেলে পরিবর্তন সম্ভব। এটা নিয়ে সামনে আমাদের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

ভারতের নয়াদিল্লিভিত্তিক গ্রিনটেক নলেজ সলিউশনস-এর উপদেষ্টা এবং গবেষণার সহ-লেখক ড. সমীর মৈথেল বলেন, এই গবেষণায় যে সব জ্বালানি-সাশ্রয়ী পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞ ইট প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্ভাবনগুলো দ্রুত বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে এখনই একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ সহকারী গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. স্টিফেন লুবি বলেন, এই গবেষণার আশাব্যঞ্জক সাফল্য প্রমাণ করে স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা থাকলে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া সম্ভব।