অনুমতি ছাড়াই বারে অভিযানের অভিযোগ, র‍্যাবের বিরুদ্ধে বাড়ছে ক্ষোভ

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সধারী বারে বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার পরিচয়ে হঠাৎ অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযানে অংশগ্রহণকারীরা কখনও র‍্যাব বা পুলিশের পরিচয় দিচ্ছেন, আবার কখনও থাকছেন সাধারণ পোশাকে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অভিযানে কোনো বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয় না, বরং কাগজ না থাকার অজুহাতে ভয়ভীতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো বাহিনীর এককভাবে অনুমোদিত বারে অভিযান চালানোর বিধান নেই।

এই পরিস্থিতিকে হয়রানি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বার মালিকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী পিছিয়ে থাকলেও র‍্যাবের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত অভিযান চলছে। অভিযানে অংশগ্রহণকারীরা সাদা পোশাকে থাকায় তারা আদৌ র‍্যাব সদস্য কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া এসব অভিযানের সময় বিনা মূল্যে অ্যালকোহল সেবন, পারসেল নেওয়া এবং মাসোহারা দাবি করার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন মালিক। কেউ কেউ মাসোহারা দিতে রাজি না হওয়ায় পরে তাদের বারে অভিযান চালানো হয়েছে বলেও দাবি।

সম্প্রতি র‍্যাব-১ পরিচয়ে উত্তরা আবদুল্লাহপুরের লাইসেন্সধারী বার ‘টাইগার এন্টারটেইনমেন্ট’-এ একদল ব্যক্তি অভিযান চালায়। অভিযানের শুরুতেই তারা সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো করে ফেলে এবং ফুটেজ খুলে নিয়ে যায়। বার কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিযানে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, চারটি ল্যাপটপ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাতটি মোবাইল ফোন, লাইসেন্স-আমদানি-উত্তোলনের কাগজসহ অফিসিয়াল ফাইল এবং বৈধভাবে উত্তোলিত শতাধিক বিয়ারের কেস জব্দ করা হয়। এ ছাড়া কেরু অ্যান্ড কোং-এর প্রায় ৫০ কেস অ্যালকোহল ও ব্র্যান্ড রেজিস্ট্রেশন থাকা পণ্যও নিয়ে যায় অভিযানের সদস্যরা। একই সঙ্গে বার কর্মকর্তাদের মারধর করে চারজনকে আটক করা হয়।

এর আগে রমজান মাসে মহাখালীর 'বেরন' ও বনানী ১১ নম্বর সড়কের একটি বারে একই ধরনের অভিযান চালানো হয় র‍্যাবের নাম ব্যবহার করে। সংশ্লিষ্ট বার কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই সময় নগদ টাকা ও কোটি কোটি টাকার অ্যালকোহল জব্দ করা হলেও তার কোনো তালিকা বা প্রমাণাদি দেওয়া হয়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২০ থেকে ২৩ ধারা অনুযায়ী বারে অভিযান পরিচালনার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। আইনের ২০ ধারায় বলা আছে, অনুমোদিত বারে প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা একমাত্র ডিএনসির মহাপরিচালক বা তার নিযুক্ত কর্মকর্তার রয়েছে। অন্য কোনো বাহিনীর নাম সেখানে নেই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বারের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও তদারকি একমাত্র তারাই করে থাকেন। কোনো বাহিনী যদি বারে অভিযান চালাতে চায়, তাহলে অধিদফতরের অনুমোদন নিতে হবে এবং তাদের প্রতিনিধি সঙ্গে রাখতে হবে।

তথ্য অনুযায়ী, উত্তরার টাইগার বারসহ যেসব বারে সম্প্রতি অভিযান চালানো হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেই ডিএনসিকে অবহিত করা হয়নি এবং কোনো প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন না। ঢাকা উত্তরা জোনের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ জানিয়েছেন, টাইগার বারে অভিযানের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। অন্যান্য অভিযানের ক্ষেত্রেও এমনই অবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সংস্থার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে রেস্টুরেন্ট ও বার মালিকরা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডিএনসির মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ডিএনসি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি সার্কুলার জারি করে, যেখানে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়—বারে কারা ও কীভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। সার্কুলারটি দেশের সব এসপি, ডিআইজি, বিভাগীয় কমিশনার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ ২৭টি সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়। উত্তরার টাইগার বারে পরিচালিত সাম্প্রতিক অভিযান এই সার্কুলার ও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার দুটি বারের মালিক জানান, ‘বারের লাইসেন্স পাওয়া সহজ নয়। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দফতরে ঘুরে কাগজপত্র জমা দিয়ে, নিয়ম মেনে তবেই অনুমোদন মেলে। কিন্তু এরপর শুরু হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি ও হয়রানি।’

এদিকে টাইগার বারে অভিযান প্রসঙ্গে র‍্যাব-১ এর কর্মকর্তা মেজর আহনাফ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম চালাচ্ছিল এবং বিদেশি মদের কোনো কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স বা ডিএনসির অনুমতি ছিল না।

অন্যদিকে টাইগার রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম দাবি করেছেন, তাদের বৈধ বার লাইসেন্স রয়েছে—যার নম্বর ০১/২০২১/২০২২। তিনি বলেন, অভিযানের সময় র‍্যাব সদস্যরা কোনো কাগজ দেখতে চাননি এবং বৈধ-অবৈধ মদ আলাদা করে যাচাই করেননি। সব মদ ও বিয়ার ঢালাওভাবে জব্দ করা হয়। তাছাড়া অভিযানে ডিএনসির কোনো প্রতিনিধিও ছিলেন না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে মোট ১৮৯টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত রেস্টুরেন্ট ও বার রয়েছে, যেগুলোর সব ধরনের লাইসেন্স, নবায়ন ও মজুত তদারকি তারাই করে থাকে।

বাংলাদেশ বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) জাহাঙ্গীর বলেন, ‘র‍্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রতিনিধি ছাড়া কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারে অভিযান চালাতে পারে না। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে।’

তিনি জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে র‍্যাব মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের বৈঠক ডাকা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতের দ্বারস্থ হবো—এই ধরনের বেআইনি অভিযানের প্রতিকারে।’