কলকাতার ইডেন গার্ডেনস বা অনেক ব্যাটসম্যানের কাছে স্বর্গের উদ্যানের মতো পরম আকাক্সিক্ষত হলেও সাংবাদিকদের জন্য ঠিক উল্টো। আক্ষরিক অর্থেই কাকের বাসার মতো উঁচুতে টানানো লোহার খাঁচায় প্রেস বক্স, তাতে ফার্মগেটের কোচিং সেন্টার সদৃশ্য বেঞ্চিতে দুজন করে বসার ব্যবস্থা। হাঁটলে পায়ের নিচে কাঠের মেঝে মচমচ করে। বছর ছয়েক আগে সেই কাকের বাসায় বসেই দেখেছিলাম বিরাট কোহলির এক অনন্য কীর্তি। গোলাপি বলে, দিনরাতের টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে বিরাট কোহলির ১৩৬ রানের ইনিংস, যা এখন অবধি গোলাপি বলে ভারতীয় কোনো ব্যাটসম্যানের একমাত্র শতরান।
টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিয়েছেন বিরাট কোহলি। অঞ্জন দত্তের ‘মালা’ গানের সুবাদে ১২ মে তারিখটা এমনিতেই অনেকের কাছে বিশেষ। অঞ্জন দত্ত তার উদাস করা সুরে গেয়েছেন, ‘আজ ১২ মে তুমি চলে গিয়েছিলে, জীবন থেকে আমার...’, বিরাট কী করে যেন এই তারিখটাই বেছে নিলেন সাদা পোশাকটা তুলে রাখতে। ঠিক ব্যাটিং অর্ডার মেনে নামার মতো, রোহিত শর্মার টেস্ট অবসর ঘোষণার দিন তিনেক পর বিরাটও বলে দিলেন, টেস্ট ক্রিকেট তোমায় দিলাম ছুটি। আরও ৭৭০ রান করলে ১০ হাজার রান হতো টেস্টে, তবে সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় তার জন্য হয়তো লেগে যেত বছর দেড়েক বা তারও বেশি। এক দশক আগের বিরাট হলে অন্য কথা, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন পাঁচ টেস্টের সিরিজেই হয়তো অনেকটা কাছাকাছি চলে যেতেন। কিন্তু হালফিলে শ্বেতবসনে বিরাট রাজত্বে ক্ষয় ধরেছে। ২০২৪ সালে ১০ টেস্ট খেলে ১৯ ইনিংসে গড় ২৫-এর কিছু কম, একটা মাত্র শতক। ঘরের মাঠে পাঁচ টেস্ট খেলে ১০ ইনিংসে সর্বোচ্চ মোটে ৭০। ফর্মে ফিরতে ১৩ বছর পর রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ খেলতে হয়েছে তাকে। সেই ম্যাচেও অখ্যাত এক বোলার টিমবাসের চালকের পরামর্শ অনুযায়ী বল করে আউট করেন কোহলিকে!
দেশে নিউজিল্যান্ডের কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়া, অস্ট্রেলিয়া সফরে ৩-১ ব্যবধানে হার, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে না পারা...সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল ভারতের ক্রিকেটারদের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে। নড়বড়ে হয়ে যায় কোচ গৌতম গম্ভীরের চেয়ারও। ছাঁটাই হয়েছেন একাধিক সহকারী কোচ। স্পষ্ট হয়ে যায় বিসিসিআইয়ের রূপরেখা, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নতুন চক্রে একদম নতুন পরিকল্পনা নিয়েই এগোতে চায় ভারত। যেখানে শুবমান গিল, যশস্বী জয়সওয়াল, সরফরাজ খানরাই এগিয়ে নেবেন তেরঙ্গাকে। যুদ্ধের জেরে আইপিএল থেমে যেতেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন রোহিত, দিন কয়েক পর বিরাটও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানালেন, ‘ভারতের টেস্ট দলের নীল টুপিটা পড়েছি ১৪ বছর হয়ে গেল। সত্যি বলতে, ভাবিনি যাত্রাপথ এতটা সুদীর্ঘ হবে। এই যাত্রা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, গড়েছে, পরখ করেছে, আমাকে আজকের আমি বানিয়েছে। সাদা পোশাকে খেলার একটা আলাদা আনন্দ আছে। একটা নীরব কিন্তু দাঁতচাপা লড়াই, লম্বা সব দিন, ছোট ছোট আনন্দের সব মুহূর্ত, যেসব কেউ দেখবে না, কিন্তু আজীবন মনে থাকবে। আমি এই সংস্করণ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি, সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ ছিল না, তবুও মনে হচ্ছে এটাই সঠিক। আমি এই সংস্করণের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলাম, যা দিয়েছি বিনিময়ে পেয়েছি অনেক বেশি। কৃতজ্ঞচিত্তে এই সংস্করণকে বিদায় বলছি, নিয়ে যাচ্ছি একরাশ ভালোবাসা। যাদের সঙ্গে খেলেছি, প্রত্যেকটা মানুষ যাদের সঙ্গে এই দীর্ঘ যাত্রাপথে দেখা হয়েছে, সবার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। আমার টেস্ট ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে আমি সবসময় তৃপ্তির হাসিই দেখতে পাব।’
ফিরে যাই ইডেনের সেই সন্ধ্যায়। এবাদত হোসেন তার জীবনের অন্যতম সেরা স্পেলটা করেছিলেন। কুহক সন্ধ্যায়, ফ্লাডলাইটের আলোয় প্রায় অদৃশ্য গোলাপি বলটাকে বিরাট যেভাবে খেললেন, তাতেই বোঝা গেল মাঠের বাকি ২১টা খেলোয়াড়ের চেয়ে তিনি কোথায় আলাদা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকেই যেতে হয় অস্তাচলে। তবে মধ্য সাঁইত্রিশেও সুপার ফিট বিরাট চাইলে আরও কিছুদিন টেস্ট ক্রিকেট খেলতেও পারতেন। তারপরও যে ভারতীয় দলের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিজেকে সরিয়ে নিলেন, তাতেই মাহাত্মটা আরও বেড়ে গেল। ১০ হাজার রানের জন্য মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে এই মর্যাদাটা হয়তো থাকত না।