জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বাড়তে থাকা তীব্র তাপপ্রবাহ গর্ভবতী নারীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রাল। আজ বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে দেশে ‘প্রসবকালীন ঝুঁকিপূর্ণ তাপপ্রবাহের দিন’ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা গর্ভকালীন জটিলতা ও সময়ের আগেই সন্তান প্রসবের ঘটনা বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ৩৪ দিন রেকর্ড করা হয়েছে, যেগুলোতে তাপমাত্রা ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় ৯৫ শতাংশের বেশি ছিল। এসব দিনকে ‘প্রসবকালীন ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। ২০২০-২০২৪ সময়ে শহরটিতে গড়ে ৩০টি অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ দিন রেকর্ড হয়েছে, যা দেশের মোট ঝুঁকিপূর্ণ দিনের ৬১ শতাংশ। ঢাকায় এই হার মাত্র ৮ শতাংশ। এ কারণে চট্টগ্রামকে দেশের অন্যতম ‘তাপমাত্রা হটস্পট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ক্লাইমেট সেন্ট্রাল।
প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. ক্রিস্টিনা ডাল বলেন, ‘মাত্র একটি চরম তাপমাত্রার দিনও গর্ভকালীন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা এখনো সবার কাছে সহজলভ্য নয়, সেখানে এমন গরম পরিস্থিতি গর্ভবতী নারীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত গরম দিনের পেছনে মূল দায় জীবাশ্ম জ্বালানির—তেল, গ্যাস ও কয়লার ব্যবহার। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৫০-এর দশক থেকে দেশে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়লেও, কিছু এলাকায় তুলনামূলক ভিন্ন প্রবণতা দেখা গেছে। এই ব্যতিক্রমের পেছনে স্থানীয় আবহাওয়া, পরিবেশগত বৈচিত্র্য বা তথ্যসংগ্রহের সীমাবদ্ধতা কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ক্লাইমেট সেন্ট্রাল বলছে, বাংলাদেশের এই সংকট বৈশ্বিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। বিশ্বের ২৪৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ৯০ শতাংশেই গত পাঁচ বছরে প্রসবকালীন ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার দিন দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ দেশে বছরে অন্তত এক মাস ধরে এমন দিন সহ্য করতে হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যারা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে কম অবদান রাখে।
নারী স্বাস্থ্য ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ব্রস বেক্কার বলেন, ‘এটি শুধু পরিবেশগত নয়, একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী দেশগুলোর এ সংকটে বেশি দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশু।’
এই সংকট মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসাসেবা, তাপপ্রবাহ নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং তাপ সহনশীল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশ মাতৃস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন সেই অগ্রগতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। আমাদের দরকার একটি জলবায়ুবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি।’
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গর্ভবতী নারীরা আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হবেন। তাপপ্রবাহ শুধু একটি পরিবেশগত নয়, বরং একটি মানবিক সংকট—যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।