সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতা ও যূথবদ্ধতার শক্তি

বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি নাট্যকর্মী সম্প্রতি আফসোস করে বললেন, “মিরপুর, উত্তরা, বসুন্ধরা, বনানী এত বড় জনপদে একটি থিয়েটার হল নেই, নেই বইয়ের দোকান, সিনেমা হল। অথচ ধানমন্ডিতে ১৩৫০টি রেস্টুরেন্ট। অর্থাৎ আমাদের সমাজে ‘খাওয়া’ হয়ে উঠেছে প্রধান বিনোদন এমন এক মানসিকতা যেখানে জাতির মনন তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে গেছে।”  উনার এই বক্তব্যে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে, পক্ষে-বিপক্ষে লোকে যুক্তি দিচ্ছে। কেউ কেউ সোনালি দিনের কথা ভেবে আফসোস করছেন আর আমাদের তথাকথিত অবক্ষয়ে শিউরে উঠছেন, এর বিপরীতে আবার কেউ  বলছেন উনার আলাপটা আবেগস্বর্বস্ব। বই বা থিয়েটারের মতো ব্যাপার সেকেলে হয়ে গেছে, আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের মনন কেবল এসব ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নেই। হাতে হাতে মুঠোফোন আর ইন্টারনেটের সর্বব্যাপিতা আমাদের মননকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলছে। দুটি আলাপেই যুক্তি আছে, এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক চলবেই। তবে এই আলাপ থেকে আসলে সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে, আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক রূপান্তর এখন কোন দিকে যাচ্ছে। বিশেষত, গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর, যার মাধ্যমে এদেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। যার ফলে দেশ জুড়ে আশার পালে হাওয়া লেগেছিল যে, কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক আবহেরও পরিবর্তন হবে।

দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারের অধীনে থাকার অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে, দেশের মানুষের মধ্যে বিভক্তি। এই বিভক্তি তৈরি করাই স্বৈরাচারের টিকে থাকার মূলমন্ত্র। ডিভাইড অ্যান্ড রুলের যে আদি নীতি, তা আধুনিক যুগেও সমান কার্যকর। যার ফলে বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রীতিমতো বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। যেই মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল এমন এক দেশ, যেখানে মানুষের ওপর শোষণ কমবে, গণমানুষের স্বাধীনতা থাকবে আর থাকবে সাম্য ও মৈত্রীর ভিত্তিতে এ দেশের মানুষের বস্তুগত এবং আত্মিক উন্নয়ন, সেসব বস্তুগত ব্যাপারকে উপড়ে ফেলে মুক্তিযুদ্ধকে বানিয়ে ফেলা হয় রীতিমতো বায়বীয় চেতনায়। যে চেতনাকে নেশার মতো ব্যবহার করে একদিকে দেশের মানুষকে বুঁদ রাখা আর সেই সুযোগে অপশাসন এবং এন্তার লুটপাট। কিংবদন্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলতেন, ‘তুমি সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারো এবং কিছু মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারো, কিন্তু তুমি সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারো না।’ স্বৈরশাসকদের বেলাতেও তাই হয়, সব মানুষকে সবসময় বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। যে কারণে, আমরা দেখতে পাই যে, একসময় গণবিদ্রোহ দেখা যায়, অভ্যুত্থান হয়। মানুষ এক হয়ে জেগে ওঠে।

স্বৈরাচারের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়াই অবশ্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষ কথা না। এরপর দেশগড়ার কাজে মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। এর জন্য দরকার মননশীল অনুশীলন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ। আর দরকার মানুষের সামষ্টিক উপস্থিতি, যা চরম শক্তিশালী স্বৈরাচারের পতন ঘটায়, যা দেশকে স্বাধীন করে। কেবল চেতনার বায়বীয় আস্ফালনে দেশ আগায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, এ দেশ গড়া কীভাবে সম্ভব হবে?

ঢাকা শহরের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও জনবহুল এলাকাগুলোতে বইয়ের দোকান না থাকাতে আবার ফিরে আসা যাক। বিগত শতকের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে, ঢাকা এতটা বর্ধিষ্ণু এবং সমৃদ্ধ না হলেও এর পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি ছিল। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই সংস্কৃতি ছিল। মানুষ নানারকম উদ্যোগে স্থানীয় লাইব্রেরি করত, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার জন্য সংগঠন করত। বিশেষ বিশেষ দিনে গোটা এলাকার মানুষ নিয়ে উৎসব করত। বারো মাসে তেরো পার্বণের এদেশে একটা দারুণ সামষ্টিক জীবন ছিল। এই সামষ্টিক জীবন দেশকে একটা সঞ্জীবনী শক্তি দেয়, এর গুরুত্ব অসীম।

তবে গত শতকের শেষ দিকে দুনিয়া জুড়ে নবউদারতাবাদের নামে নেমে আসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন। মূলত কঞ্জুমারিজমের লাভের আশায়, বেশি বেশি পণ্য বিক্রির আশায় উৎসাহ দেওয়া হয় সামষ্টিক জীবনকে ভেঙে একক জীবন কাটানোর। যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবার গঠন করা। কারণ, যত বেশি পরিবার হবে, তত বেশি পণ্য কেনা হবে। যূথবদ্ধতার বদলে মানুষ একক জীবন কাটালে শাসকেরও লাভ। টেলিভিশন নামক বোকা বাক্সে দিনমান বুঁদ করে রেখে তাকে অচেতন রাখা যায়। কিন্তু মানুষ অনন্য হয়ে উঠেছে তার যূথবদ্ধতার কারণেই। মানুষের বাঘের মতো বড় দাঁত, হাতির মতো বড় শরীর কিংবা চিতার মতো ক্ষিপ্রতা নেই। তার সবচেয়ে বড় দুইটি সম্বল, কল্পনাশক্তি এবং সামষ্টিকতা। তা দিয়েই সে দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরায়। মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এই প্রয়াস আসলে তার স্বভাববিরুদ্ধ। বিস্তারিত আলাপ বাদই দিলাম, এই যুগে এসে বিচ্ছিন্ন মানুষের যে সামাজিক মাধ্যমে বিপুল সময় কাটানো, তার পেছনে কাজ করে এই যূথবদ্ধ হওয়ার আকাক্সক্ষা। সে সবার সঙ্গে মিশতে চায়, নিজেকে মেলে ধরতে চায়। হাজারের মধ্যে এক হয়ে উঠতে চায় উভয় অর্থেই।

সমস্যা কি তাহলে কেবল বইয়ের দোকান বা পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি না থাকা? ‘রেস্টুরেন্ট কালচার’ গড়ে তুলে কেবল খাওয়ার পেছনে যাওয়া? সমস্যাটা আরেকটু গভীর। মননশীল হতে হলে কেবল বই-ই পড়তে হবে তা একটি মৌলবাদী আলাপ। বই স্রেফ একটা মাধ্যম। ভিডিও দেখে, ইন্টারনেট ঘেঁটে, মানুষ বই পড়ে অর্জিত মননশীলতা ও সৃজনশীলতার চেয়ে বহুগুণে সেসব অর্জন করতে পারে। মূল সমস্যা হচ্ছে, নবউদারতাবাদ আর পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে, অর্থ উপার্জনই জীবনের মোক্ষ এই নীতিতে বিশ্বাস করা এবং এই লক্ষ্যে মানুষের জীবনকে যন্ত্রের মতো সর্বোচ্চ ব্যবহার করা।

যখন আমাদের সামষ্টিক জীবন ছিল, ‘পাড়া-কালচার’ ছিল তখন আমরা ঘুষখোর, অবৈধ উপার্জনকারীদের প্রতি এক ধরনের সামষ্টিক প্রতিরোধ না হোক অন্তত ঘৃণা উৎপাদন করতে পারতাম। সেসব ধনীরা হয়তো নানারকম বস্তুবাদী ভোগ করতেন, কিন্তু সামাজিক ঘৃণার খচখচে কাঁটায় বিদ্ধ হতেন। কিন্তু নবউদারতাবাদের কালে, সেই কাঁটা উবে গেছে। বরং যিনি বা যারা এই টাকা কামানোর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন, তাদের ‘বেকুব’ বা ‘অক্ষম’ ঠাওরানো হয়। সামাজিক যে প্রতিরোধ ছিল তা সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলা হয়েছে, এমনকি ধর্মের মতো সামাজিক শৃঙ্খলা ও প্রতিরোধের মাধ্যমও কলুষিত হচ্ছে। টাকা কামানেওয়ালাই মসজিদ কমিটির প্রধান হচ্ছেন, এলাকায় সবচেয়ে বড় বড় সেলাম পাচ্ছেন। সততা, প্রজ্ঞা, মানুষের প্রতি দরদ এসব গুণকে ছেদো করে ফেলা হয়েছে।

শুধু তাই না, মানুষের সামষ্টিক আবেগকেও পণ্য করে ফেলা হয়েছে দারুণ সফলভাবে। মানুষের যোগাযোগের আকুতিকে সামাজিক মাধ্যম দারুণভাবে ব্যবহার করে ব্যবসা করছে। সিনেমা হলে একসঙ্গে যে সিনেমা দেখা, তা তো কেবল শিল্পের উপভোগ নয় বরং ভাগাভাগি করা, তার বদলে চলে এসেছে হাতে হাতে মুঠোফোনে দেখা। ফুটবল খেলার মতো দারুণ সামষ্টিক আবেগ সীমিত হয়ে গেছে টিভি স্ক্রিনে। সেই উনিশ শতকেই, যখন এসব শুরু হয়, তখন জুল ভের্নের এক গল্পে এক চরিত্র বলেছিল, তাজা মাছের স্বাদ কি আর কৌটায় দিনের পর দিন শুঁটকি মাছের মধ্যে পাওয়া যাবে?

আমাদের যে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ঘ্রাণশক্তি তাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সামষ্টিকতার অভাবে। সবুজ ঘাসের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে, উল্লসিত পাশের জনের ঘামের গন্ধ উপেক্ষা করে ফুটবল মাঠে যে উল্লাস সেই সুতীব্র অনুভূতি কি টেলিভিশনের সামনে বসে পাওয়া যাবে? একযোগে কোরাস গেয়ে অশ্রুসিক্ত বা আনন্দের যে আবেগী নাগরদোলা তা কি ঘরে বসে ইউটিউব শুনতে শুনতে পাওয়া যাবে? আর মননশীলতা? যদি নিজের বোধ আর জ্ঞান ভাগই না করা গেল, তুল্যমূল্য বিচার করে, নানা দৃষ্টিভঙ্গির কষ্টিপাথর দিয়ে ঝালাই করা না-ই গেল, তবে তার কি আসলেই উন্মেষ ঘটে? তা কি বেপথু হয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে না? চারদিকে যে এখন এত অস্থিরতা, ধর্ম কিংবা জাতীয়তাবাদ সবস্থানেই সহি হয়ে উঠে অন্যকে আক্রমণ করার খায়েশ, তা কি এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই উদ্ভূত নয়? কারণ সামষ্টিকতা মানুষের অহং কমায়, সহমর্মিতা বাড়ায়, যন্ত্রের মতো কেবল সহী হওয়া আর কর্মদক্ষতা বাড়ানোর এককেন্দ্রিক দর্শনে বুঁদ করে না। বরং মানুষ যে মানুষ হয়ে উঠেছে আড্ডা দিয়ে, কল্পনা করে, সেসবের শক্তি বাড়ায়। নয়তো, মানুষের চেয়ে কর্মদক্ষতা আর উৎপাদন ক্ষমতায় তো পিঁপড়া ঢের এগিয়ে। সে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, সম্পদের পাহাড় বানায়।

কার্ল মার্ক্স বলতেন সবচেয়ে খারাপ, সবচেয়ে অদক্ষ যে শিল্পী তিনিও বাবুই পাখির চেয়ে উন্নত। কারণ, একটা বাবুই পাখি লাখো বছর ধরে একই প্রক্রিয়ায় ঘর বানাচ্ছে। সে কল্পনা করতে পারে না, এর ব্যত্যয় হতে পারে। অথচ একজন অদক্ষ শিল্পীও ঘর বানানোর আগে মানসচক্ষে দেখে নেয়, এই ঘরটার আকার কেমন হবে। একটি বাঘ কাঁচা মাংস খায় যুগের পর যুগ। অথচ, আমাদের আদিম পূর্বপুরুষরা কল্পনা আর ক্রমাগত এক্সপেরিমেন্ট করে রান্নাশিল্পের উদ্ভাবন করেছিল। এই কল্পনাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আশ্চর্যজনকভাবে, প্রযুক্তির উন্নয়নে যখন মানুষের বিরক্তিকর যান্ত্রিক কাজ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা, তখন হচ্ছে উল্টোটা। একদিকে মানুষ গায়ে টেনে আরেকজন মানুষকে পরিবহন করছে, অন্যদিকে সৃজনশীল আর মননশীল কাজের জন্য ভর করছে চ্যাটজিপিটি, ডিপসিকের ওপর। প্রযুক্তির ‘মিন্স অব প্রোডাকশন’ তথা দখল থাকছে গুটিকয়েক সংখ্যালঘুর হাতে, যারা অসীম সম্পদ উপভোগ করে বাকিদের দিয়ে কেবল তা খাটিয়েই উৎপাদন করাচ্ছে। তারা যেন অনেকটাই পিঁপড়া কলোনির রানী আর বাকিরা দুর্ভাগা শ্রমিক। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে শ্রমিক শ্রেণি কেবল কাজ করেই জীবন অতিবাহিত করলেও তার জন্য কোনো উদ্ধৃত থাকে না, তাকে আরও বেশি বেশি কাজ করে যেতে হয় শুধু টিকে থাকার জন্য।

আলাপটা বাংলাদেশ দিয়ে শুরু করলেও তা বৈশ্বিক পর্যায়ে চলে গেল। বিশ্বায়নের এই যুগে আসলে স্থানীয় আলাপে সীমিত করা কঠিন, কারণ স্থানীয় সমস্যার গোড়া রয়ে যায় বিশ্বায়নের বাতায়নে। পুঁজিবাদ আর নবউদারতাবাদের নীতি নিয়ে আলাপ না করলে, মানুষকে অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে সীমিত করার উদ্দেশ্যের বড় ছবিটা না বুঝতে পারলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে বোঝাপড়াটা অন্ধের হস্তিদর্শনের মতোই হবে।

আমাদের সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতাকে টিকিয়ে রাখতে, মননশীলতাকে সামনে এগিয়ে নিতে দরকার সামষ্টিকতার চর্চা। কঞ্জুমারিজমের ফাঁদ কেটে প্রাণে প্রাণ মেলানোর গল্পে উদ্বুদ্ধ হওয়া। প্রতিমুহূর্তে ‘স্কোর’ করা আর যন্ত্রবৎ দক্ষতার বদলে মানবিক হয়ে ওঠা, সহমর্মিতা উপলব্ধ করা। এই একুশ শতকে, সারভেইলান্স ক্যাপিটালিজমের যুগেও, আমাদের দেশের মানুষ জীবনের বিনিময়ে দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছে। যান্ত্রিক নবউদারতাবাদের চিন্তা আর যুক্তিতে তা এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। যান্ত্রিকতা দিয়ে এর হিসাব মেলানো যায় না। এই হিসাব কেবল মেলে মানুষের প্রচ- যূথবদ্ধতার, মানবিক হওয়ার শক্তিতে। কিন্তু আমরা কি এই প্রচন্ড অর্জনকে সামনে এগিয়ে নিতে পারব আমাদের সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতার শক্তিতে?

লেখক : সাংবাদিক