সাতে পা, মানব সন্তানের বেলায় শিশু। তবে প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে হতে পারে একটু ভিন্নতা, সাত বছর একেবারে কম নয়। মার্জিত, রুচিশীল একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হিসেবে পাঠকের মন জয় করে এগিয়ে চলা বিরাট কৃতিত্বের। অন্য অনেক দৈনিকের মতো অন্তত আলোর মুখ দেখার আগেই নিভে যায়নি প্রাণপ্রদীপ। এগিয়ে চলেছে স্বমহিমায়, স্বগৌরবে। বলছিলাম, চেনা রূপে দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার বর্ণময় ৭ বছরে পা দেওয়ার কথা। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, পাঠকপ্রিয়তা আছে বলেই দেশ রূপান্তর নিঃসন্দেহে দেশের রুচিশীল একটি দৈনিক। পাঠকের চাহিদা বিবেচনায় পত্রিকার গুণগত মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই সোচ্চার দেশ রূপান্তর ম্যানেজমেন্ট। সংবাদপত্রকে ব্যবসায়িক বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এই অভিযোগ দেশ রূপান্তরের নেই বললেই চলে। একটি পরিচ্ছন্ন ও পাঠকের নির্মল আনন্দ উপভোগের সেরা মাধ্যম হিসেবে ভালো মানের পত্রিকা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অবাধ স্বাধীনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্জলা এ সত্যটাকে সম্ভবত বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বিধায়, দেশ রূপান্তর দেশের রুচিশীল পত্রিকা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। জনপ্রিয় দৈনিক হিসেবে পাঠক সমাজে বেশ সমাদৃত দেশ রূপান্তর। সংগত কারণে ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখে দেশের স্বনামখ্যাত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ গ্রুপ। হাজারো মিডিয়ার ভিড়ে, কোনো বিতর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়ে এই ব্যবসা সফল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত দেশ রূপান্তর স্বর্ণালি সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ঊষালগ্নে নিয়মিত কড়া নেড়ে চলেছে পাঠকের দুয়ারে।
একজন সাংবাদপত্র কর্মী হিসেবে আমি বিনম শ্রদ্ধা জানাই প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, দেশবরেণ্য সাংবাদিক প্রয়াত অমিত হাবিবকে। তার নিখুঁত সম্পাদনা, মেধা ও বিচক্ষণতায় হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলা দেশ রূপান্তর পৌঁছে গেছে সুনামের শেকড় থেকে শিখরে। সবার প্রিয় অমিত দা আমাদের মধ্যে নেই। পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেও তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন, তার বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতার ইতিহাসে।
জনপ্রিয় দৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার ছয় বছর অত্রিক্রম করে সাতে পা দেওয়া অবশ্যই কৃতিত্বের, প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ আলোর মুখ দেখার আগেই আঁধারে লুকিয়ে যায়নি রূপায়ণ গ্রুপের মতো বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঘটা করে প্রকাশিত হওয়া দৈনিক দেশ রূপান্তর। সম্প্রতি বেশ কিছু দৈনিক পত্রিকা নানা ঝুট ঝামেলায় বন্ধ হয়ে গেছে পাঠক ঠিক মতো হাতে নেওয়ার আগেই। এরমধ্যে ঘটা করে প্রকাশিত দৈনিক সকালের খবর অন্যতম। সে হিসেবে স্বমহিমায় উজ্জ্বল দেশ রূপান্তর। ধন্যবাদ জানাই প্রকাশক প্রতিষ্ঠানকে। ভেতরের খবর ততটা না জানলেও, যতদূর শুনি বা জানি, তাতে সংবাদকর্মী নির্যাতনের ন্যক্কারজনক ঘটনা এই হাউজে নেই। নির্যাতন বলতে শারীরিক নয়, বেতন-ভাতা ঠিকমতো না দেওয়া, স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারা। চাকরি চলে যাওয়া বা অব্যাহতি পরবর্তী পাওনা বুঝিয়ে না দেওয়া ইত্যাদি। নির্যাতনের পর্যায়ে পড়া এ ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনা দেশ রূপান্তরে ঘটেছে বলে অন্তত আমার জানা নেই। সংগত কারণে ব্যক্তিগত অভিনন্দন থাকবে ম্যানেজমেন্টের প্রতি।
আমার সাবেক কর্মস্থল দৈনিক জনকণ্ঠ থেকে ওয়াকিং ডিস্টেন্স বাংলামোটর মোড়ে রূপায়ণ টাওয়ার। এই হাউজ থেকে প্রকাশিত দেশ রূপান্তর কার্যালয়ে খুব একটা যাওয়া-আসা নেই। কদাচিৎ মন চাইলে, ঢুঁ মারতাম রূপায়ণ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা, সাবেক তারকা ফুটবলার আব্দুল গাফফার ভাই ও প্রাক্তন সম্পাদক ছোট ভাইতুল্য মোস্তফা মামুনের রুমে। ক্ষণিক সময়ের আলাপচারিতার মধ্যে চা পান আর বিড়ি ফোঁকা, ব্যস এই পর্যন্তই। তবে আপনার যদি কারও বাড়ির দুয়ারে বা ড্রয়িং রুমে এক দুইবার প্রবেশ করার সৌভাগ্য হয়, নিঃসন্দেহে বুঝতে বাকি থাকবে না সেখানকার পরিবেশটা কেমন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সুন্দর, গোছালো দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকা নিয়ে আলোকপাতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রশংসা, যা না করলেই নয়।
আট, বারো, ষোলো বা বিশ পাতার গোটা পত্রিকায় পাঠকের সরস খোরাক জোগানোর মতো প্রতিবেদন একটি বা দুটিই যথেষ্ট। হতে পারে, তা যে কোনো বিষয়ে। কিন্তু আজকাল দেখা যায় বেশিরভাগ দায়সারা। পাতার পর পাতা উল্টিয়ে তৃপ্তি পাওয়ার মতো নিউজ চোখে পড়ে খুবই কম। কাটপেস্ট, এখান থেকে, ওখান থেকে ‘পিক পকেট স্টাইল’ নিউজের ছড়াছড়ি। এক্ষেত্রেও বেশ ব্যতিক্রম দৈনিক দেশ রূপান্তর। খোদার তিরিশ দিন এই দৈনিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করলেও, যতটুকু দেখি বা পড়ি তাতে ভেজাল চোখে পড়ে না বললেই চলে। বরং মনের খোরাক হিসেবে পড়ার মতো অনেক কিছু খুঁজে পাই। আর এ কারণে ডিজিটাল যুগে, পত্রিকার মূল সুহৃদ পাঠকের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্বমহিমায় টিকে আছে দেশ রূপান্তর। বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যসমৃদ্ধ বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশে সচেষ্ট থাকলে একটি পত্রিকা সাদরে গ্রহণ করেন পাঠক। মোদ্দাকথা পাঠক স্বাগত না জানালে আলোচিত, সমৃদ্ধ সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব নয়। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পাঠক চাহিদা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আন্তরিক থাকলেই কাক্সিক্ষত সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। তা না হলে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বাধ্য। এক্ষেত্রে দেশ রূপান্তর সম্ভবত প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আর এ কারণে পথ হারায়নি এই জাতীয় দৈনিক। সগৌরবে রয়ে গেছে পাঠকের প্রিয় পছন্দের তালিকায়। এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে অগ্রযাত্রার আসন আরও সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবে দেশ রূপান্তর।
নতুন সংবাদপত্র হাতে নেওয়ার সময় সবার আগে পাঠক দৃষ্টি নিবদ্ধ করে থাকে সত্যের ওপর। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ বা প্রতিবেদনই পাঠক গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম সেরা মাধ্যম। শুরুতেই যদি পাঠকের হৃদয়ে হিট করা সম্ভব হয়, তবেই সাফল্য অনিবার্য। পত্রিকা বাজারে ছাড়ার আগে এই বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ ও যত বড় নামিদামি সম্পাদক, সাংবাদিক থাকুক না কেন, শুরুতেই পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটতে না পারলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা খুবই কঠিন। সম্ভবত এ বিষয়টাকে শুরু থেকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে দেশ রূপান্তর। আর এতে সময়ের পথপরিক্রমায় সাফল্যের সঙ্গে ৬ বছর অতিক্রম করে দেশ রূপান্তর গৌরবের সঙ্গে পা দিয়েছে ৭ বছরে। সন্দেহ নেই, আগামীর পথ চলায় যা বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে। পাঠকের পছন্দের একটি পত্রিকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশ রূপান্তর পরিবারের সদস্যরা নিঃসন্দেহে নিরলস শ্রম দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। তাদের সবার পরিশ্রমের ফসলই পাঠক সমাদৃত আজকের দেশ রূপান্তর। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ হিসেবে আমার প্রথম পছন্দ খেলার পাতা। তারপর রাজনীতি, বিনোদন, সম্পাদকীয় ও বিশেষ প্রতিবেদন ইত্যাদি। খেলাসহ দেশ রূপান্তরের অনেক প্রতিবেদন আমাকে আকৃষ্ট করে। উৎসাহ বোধ করি পত্রিকাটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধে। হয়তো আমার মতো দেশের অগণিত পাঠককুলও। এখানেই পত্রিকাটির প্রকৃত সার্থকতা। দেশের ক্রান্তিলগ্নে সমৃদ্ধ লেখনীর মাধ্যমে আলোর দিশারি হয়ে পথ দেখানো। উৎসবে, আনন্দে পত্রিকার পাতায় পাঠকের জন্য বিশেষ কিছু উপহার সার্থক করে তোলে প্রকাশনার আয়োজন। এখানেও বেশ সফল দৈনিক দেশ রূপান্তর।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে নানামুখী চাপে দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া হাউজ। নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় আন্দোলন, মালিক-সংবাদিক অসন্তোষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুই গ্রুপে মারামারি, ভাঙচুর, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এখন নিত্য ঘটনা। এক্ষেত্রে স্রোতের ধারায় বেশ কিছু মিডিয়া হাউজে, স্বাভাবিক নিয়মে কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। তবে ব্যতিক্রম দৈনিক দেশ রূপান্তর। আশীর্বাদ থাকবে প্রতিষ্ঠার সপ্তম বর্ষে ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের অহঙ্কার নিয়ে সাফল্যের সপ্তম স্বর্গে অরোহণ করুক এই দৈনিক পত্রিকা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক