নাদিলে দূরে যাওয়ার অনুমতি, না দিলে কাছে আসার অধিকার। সারাজীবন তোমার বৃত্তেই ঘুরলাম। এটা তোমার ভাবনা, আমি তোমাকে কোনো দিন এমন কোনো কথা বলিনি। যাতে তুমি এমন ভাবতে পার। সব কথা কি মুখে বলতে হয়। মধুমিতা বুঝতে পারল তর্ক করে লাভ নেই। আচ্ছা ঠিক আছে, হঠাৎ ডুব দিয়েছিলে কোথায়? তুমি কি জান আমি অনেক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। হ্যাঁ জানি, কিন্তু বেশিরভাগই অকাজ। নিজের জন্য তো একটু ভাবতে হয় সুশোভন! বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বেশ কয়েকটা মিনি ম্যাগাজিন বের হয়েছিল। বন্ধুদের অনুরোধে একটা কবিতা লিখেছিল মধুমিতা যতদূর ছোট সম্ভব। ‘তুমি কেমন আছো সুশোভন? ভালো। তুমি? আমি! বাংলার আর পাঁচটা মেয়ের মতন’। জুনিয়র এক সহকর্মী মিতাকে প্রশ্ন করেছিল, সুশোভন কে আপা? সত্যিই তো সুশোভন আমার কে? ‘সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে ভেসে আসা সবুজ বাতাস’ কিংবা ‘আকাশের রংধনু’। সেই সুশোভন আট-দশ বছর পরে এসে হাজির হয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মিতার বন্ধুরাসহ সবাই জানত সুশোভন বাম দলের সঙ্গে যুক্ত। তাই নিয়ে সবাই ওর সঙ্গে কত মজাই না করত। এই যে প্রলেতারিয়েত মশাই কেমন আছেন!’ প্রতিবাদ না করে মিষ্টি করে হাসত। সচ্ছল পরিবারের সন্তান সুশোভন, বাড়ির জন্য কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না। যাকে বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। সুশোভনের সঙ্গে একবার যারা মিশেছে তারা তাকে পছন্দ না করে পারবে না। মিতার বন্ধুরা সবাই মিলে পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে অনেক সময় কাটিয়েছে সুশোভনের সঙ্গে। ভালো ছাত্র হিসেবে নাম ছিল তার। লাইব্রেরিতে দেখা যেত গভীর মনোযোগসহ অধ্যয়নরত সুশোভন। মাথাভরা ঘন চুল, বড় বড় চোখের গভীর চাহনি দিয়ে যখন চারদিকে তাকা তো মুগ্ধ হয়ে যেতে হতো। মিতার বন্ধুরা সবাই তাকে খুব পছন্দ করত। কিন্তু সুশোভনের বেশি আগ্রহ ছিল মধুমিতার প্রতি তা বুঝতে তার সময় লেগেছিল। পরীক্ষার পরে যে তাদের এ ব্যাপারে কথা হবে সে সময় তারা কেউ পায়নি। এমন রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলো যার প্রভাব তাদের প্রায় সবার জীবনে পরিবর্তন নিয়ে এলো। দেশকে মুক্ত করার অদম্য বাসনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এ দেশের তরুণ, বৃদ্ধ, যুবা। ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণের সুযোগ অনেকেই পেল না। মেয়েরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হল ছেড়ে চলে গেল। জীবন দিল অনেকে হয় স্বাধীনতা নয় মৃত্যু। শুধু ইউনিভার্সিটি নয়, সারা দেশ জেগে উঠল। যুদ্ধে চলে গেল এ দেশের দামাল ছেলেরা। অনেক ত্যাগ, জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে নয় মাসের মাথায় এ দেশের মুক্তি নিয়ে এলো। এ দেশের আপামর জনতা। সুশোভনও থাকতে পারেনি চলে গিয়েছিল যুদ্ধে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাকে নতুন করে গড়ার লক্ষ্যে তরুণ সমাজ উদ্বুদ্ধ হলো। কিন্তু যে আশা নিয়ে তারা জেগে উঠেছিল সে স্বপ্ন তাদের ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ভিন্ন পথ ধরে তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইল। এমনই একজন সুশোভন। রেসকোর্স ময়দানে পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন বন্ধুদের সঙ্গে উপস্থিত থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই চলে গিয়েছিল বগুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। চলে গিয়েছিল দেশ গড়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। যুদ্ধের নয় মাসের মধ্যে সে তার মা-বাবা-বোন আরও অনেক আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়েছিল। একেবারে মুক্ত। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে তুং, চারু মজুমদার, সিরাজ শিকদার, বদরুদ্দিন ওমর কিছুই তার মাথায় নেই। এ যন্ত্রণা ভুলে যাওয়ার জন্য তাকে অনেক দূরে যেতে হবে। আপনজন কাউকেই এ জীবনে চাই না। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলা গেছে। কিন্তু মুজিব সরকার!! দেশ এ কোন পথে চলছে! তাই সে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ বেছে নিল। এরই ফাঁকে একদিন চলে এলো মধুমিতার বাড়িতে। প্রথমে অবাক বিস্ময়ে কতক্ষণ তাকিয়ে রইল মধুমিতা। তুমি? কোথা থেকে? আমার ঠিকানা পেলে কোথায়? তোমার খোঁজ তো কোথাও পাইনি। ধীরে বন্ধু, একটু বসতে দাও। একটু জিরিয়ে নেই। এক গ্লাস পানি দাও। তাই তো, লজ্জা পেল মধুমিতা। তুমি বসো। অনেকটাই শুকিয়ে গেছে সুশোভন। তবে চোখের দৃষ্টি কেমন যেন তীক্ষè হয়ে গেছে। এক গ্লাস পানি আর সামান্য খাবার নিয়ে এলো মধুমিতা। এবারে বোস। তোমার সব খবর আমি রাখি মধুমিতা। যুদ্ধ থেকে ফিরে প্রথমেই তোমার খবর নিয়েছি। শুনেছি ভালো আছ। সুখের সংসার-জীবন, সঙ্গে শিক্ষকতা করছ। খুব খুশি হয়েছি। দুপুরে খেয়ে যাবে তো? আমি মাকে বলে আসি। সুশোভনের মন ছুটে গেল যুদ্ধকালীন সময়ে। মধুমিতাকে নিয়ে কত না ভেবেছে। ভেবেছে ফিরে আসতে পারলে প্রথমেই মধুমিতাকে মায়ের কাছে ধরে নিয়ে যাবে। চিন্তায় মাকে আর মধুমিতাকে কত না মিলিয়েছে। নিশ্চয়ই মধুমিতাকে দেখে মা ভীষণ খুশি হবে আর বলবে, ‘শোভন তুই কি করে বুঝলি এমন মেয়েই আমার পছন্দ। মা তোমার পছন্দ কি আমি বুঝি না! ফিরে এসে দেখল কেউ নেই, কিছু নেই, শূন্য ভিটা। আর ইচ্ছা হয়নি মধুমিতার কাছে আসার। এতকাল পরে কেন এসেছি, জিজ্ঞেস করলে না? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মধুমিতা। লোভ সামলাতে পারিনি। খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল তুমি কেমন সংসার করছ। আসিফ হঠাৎ করে অফিস থেকে চলে এলো। এ সময় তার আসার কথা না। বসার ঘরে এসে বলল, তোমার নাকি গেস্ট এসেছে মিতা। সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বলল, নিশ্চয়ই তোমাদের সব বন্ধুদের সেই প্রিয় মানুষটি। সুশোভন উঠে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে হাত মেলাল। কী করে বুঝলেন? আপনার যে বর্ণনা শুনেছি তাতেই ধরে ফেলেছি। অনেক গল্পের পরে বলল কতকাল এভাবে ঘুরে বেড়াবেন। এবার কোথাও বাঁধা পড়–ন। জীবন দীর্ঘ সময়ের নয়। আমার অফিসের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এসেছিলাম একটা পেপার নিতে। মধুমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার বন্ধুকে কিন্তু না খাইয়ে ছেড় না। মাকে দেখলাম কী কী সব রান্না করছেন। আচ্ছা আসি ভাই। আপনার আসাতে খুব খুশি হয়েছি। চলে গেল আসিফ। মধুমিতা তোমার হাজবেন্ডকে খুব ভালো লেগেছে। তোমার জন্য এমনই ভেবেছিলাম। বলল সুশোভন ঘরে এসে ঢুকলেন আসিফের মা একটি তিন-চার বছরের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে। মাকে ছালাম করে শিশুটিকে কাছে বসিয়ে অনেক আদর করল সুশোভন। মধুমিতা ভেবেছিল আজ কলেজে যাবে না। কিন্তু ডিপার্টমেন্ট থেকে চেয়ারম্যানের ফোন পেয়ে বুঝল না গিয়ে পারবে না। সুশোভন শুনে বলল, অবশ্যই তুমি যাও। খালাম্মা আছেন, তোমার বাপী আছে। আমি বেশিক্ষণ বসব না। তাড়াহুড়া করে একটু তাড়াতাড়িই ফিরল মধুমিতা। কিন্তু বাড়িতে এসে সুশোভনকে পেল না। তোমার ভাইটি তো বেশ ভালো বৌ। কত গল্প আমার সঙ্গে। বাবুকে হাতে করে খাওয়ালো। কথা প্রসঙ্গে বোললাম বিয়ে করোনা কেন বাবা? বলল কি জানো? আপনার বৌমাকে কতবার বললাম একটু ঠিক করে দাও। আমার তো কেউ নেই। তা তার সময়ই হয় না। একটু ব্যবস্থা করে দাও না কেন বৌ? বয়স হয়ে যাচ্ছে। মাকে বোঝানো যাবে না এসবই তার মুখের কথা। অনেকবার বলা হয়েছে। একই জবাব। বিয়েটাই সব। দেখ না চেষ্টা করে, ভাগ্যটা একটু বদলায় কি না! চারু মজুমদারের নকশালবাড়ির আন্দোলন এক সময় শুধু বাংলা নয়, পুরো ভারতের শাসকগোষ্ঠীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তার চলে যাবার পরে তারই দলের একটি মেয়ে সুতপা প্রতিপক্ষের হাতে জঘন্যভাবে নিগৃহীত হয়েছিল, হয়েছিল লাঞ্ছিত। সে কষ্টের যন্ত্রণায় সুতপা পাগল হয়ে গিয়েছিল। চোখের পানি নয়, বুকের মধ্যে আগুন দাউ দাউ করে জ¦লছিল। সে আগুনে যদি সংসার, সমাজ, দেশ সব কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু অসহায় সুতপা তা পারছে না। বুকের আগুন চোখের জল হয়ে অনবরত ঝরতে লাগল। কাঁদছে সুতপা কাঁদছে, কাঁদছে। সুতপারা কাঁদছে। কাঁদছে পৃথিবীময়। মধুমিতার বুকে তুষের আগুন ধিকিধিকি জ¦লছে। শেষবার যখন সুশোভন এলো তাও আচমকা। কেমন যেন অস্থির লাগছে মধুমিতা, তাই না এসে পারলাম না। মাথায় ওপর চলিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কেন নিজেকে এসবের মধ্যে জড়াচ্ছ? আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা এটা মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া কি অপরাধ। অপরাধ ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝানো। ক্লাসে গিয়ে বইয়ের পড়ানোর বাইরে যদি শেখানো হয় সত্যকে নিয়ে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। সেটা কি অপরাধ মধুমিতা? একনাগাড়ে কথা বলে একেবারে চুপ হয়ে গেল সুশোভন। সব বাদ দিয়ে এবারে একটু নিজের কথা ভাব। যতদিন বেঁচে থাকব এ সত্য থেকে আমি দূরে যেতে পারব না। তোমার এ জীবনের জন্য আমিই দায়ী সুশোভন। আমি কি কোনো দিন কোনো অভিযোগ করেছি। আমি নিজেই নিজেকে এভাবে গড়েছি মধুমিতা। তুমি দুঃখ নিও না। তুমি যে আছ! এই আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল তোমার হাজব্যান্ড কিন্তু ভালো মানুষ, সজ্জন ব্যক্তি। তাকে কখনো দুঃখ দিও না। মনে মনে ভাবছিল সুশোভন আমি তোমাকে এলোমেলো করে দিতে পারি মধুমিতা। আমি জীবনে কিছু পাইনি বলে তুমিও বঞ্চিত হবে। এ হয় না। এ তো আমার ভাগ্য! তুমি ভালো থেকো তোমরা সুখে থেকো। আমি যাই মধুমিতা। চলে গেল আকাশের রংধনু। মিলিয়ে গেল কোন আঁধারে। ঘাসের ওপর দিয়ে সবুজ বাতাস কি আর ভেসে আসবে! এরপর বহুদিন আর কোনো খবর নেই। আসিফ একদিন বলল, সিরাজ শিকদারের পরে বেশ কয়েকজন এভাবে মারা গেছে। মধুমিতার বুকটা কেঁপে উঠল। তাহলে সুশোভন কি এর মধ্যে আছে? সমস্ত দেহের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা। অনেক দিন পরে চোখের পানি অজস্ত্র ধারায় নেমে আসছে। কাঁদছে সুতপা। শাশুড়ির সাড়া পেয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল মধুমিতা। তুমি এখানে বসে আছ কলেজ থেকে ফিরে কিছু খেলেও না। দেখো তোমার ছেলে কি পেনসিল জানি খুঁজছে। ছলছল চোখে মায়ের গা ঘেঁষে দীপ্ত এসে দাঁড়াল। কী হয়েছে বাবা? রঙিন পেনসিল চাচ্ছ? ছেলে মাথা নাড়ল।
চল বাবা খুঁজে দেখি।