সন্ত্রাসমেঘ কাটবে কবে?

এক সময় এ দেশের রাজপথ ছিল, অজানা আতঙ্কের নাম। লাল-সবুজ পতাকা ওড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার নিচে অনেক সময় মানুষের গাঢ় কষ্ট, আর্তনাদ আর নিঃশব্দ কান্নার ধ্বনি চাপা পড়ে যেত। শিক্ষাঙ্গনে একটা সময় ছিল, যখন টেন্ডার মানেই ছিল ‘ভাগাভাগির খেলা’। যেখানে যোগ্যতা নয়, চলত রাজনৈতিক দম্ভ আর ‘আপন লোকের’ শেল্টার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের হাতে বইয়ের বদলে থাকত তালিকা কে কার পক্ষে, কে কোথায় দখলে থাকবে। গুম, খুন, হুমকি, চাঁদাবাজি এসব ছিল তখনকার দৈনন্দিন শব্দ। সমাজ যেন হয়ে উঠেছিল একটি রাজনৈতিক ল্যাবরেটরি, যেখানে মানুষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় আর নৈতিকতা ছিল অবাঞ্ছিত শব্দ। ৫ আগস্টের পর আজকাল আমরা অনেকেই বলি ‘না না, আমরা তো অনেক দূর এগিয়ে গেছি।’ কিন্তু সত্যিই কি আমরা এগিয়েছি? মনুষ্যত্ব কি সত্যিই জেগেছে? মুখোশ পাল্টে যাওয়া আর বাস্তবতার পরিবর্তন এক জিনিস নয়। সেসব সন্ত্রাসের দিনগুলো কি সত্যিই পেছনে ফেলে এসেছি আমরা? নাকি তারা আজও ঘুরে বেড়ায় নতুন মুখ, নতুন কৌশলে? আমরা কি শিখেছি মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই? নাকি অন্য মোড়কে আবারও মানবিকতাকে গলা টিপে ধরা হচ্ছে? আমরা যারা সেই সময়কে দেখেছি, জানি-স্বাধীনতা শুধু একটা শব্দ নয়, এটি দায়িত্বের নাম। আর সেই দায়িত্ব থেকে যদি আমরা মুখ ফিরিয়ে থাকি, তবে ইতিহাস একদিন ঠিকই ক্ষমা করবে না। ফলে এদেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল  হোক। মানুষ শান্তিতে বাঁচুক।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। এতে অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দমন করার কথা বলা হয়েছে। দেরিতে হলেও এটি নিঃসন্দেহে সাহসী উদ্যোগ। যদিও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলা যাবে না। তারপরও শান্তির সুবাতাস কিছুটা পাচ্ছি আমরা। এই অধ্যাদেশ যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা হতে পারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। কারণ, আজ যখন দেশের প্রতিটি প্রান্তে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ ও অস্ত্রের দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তখন একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নই পারে এই নৈরাজ্য থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে। কেবল অধ্যাদেশ জারি করলেই হবে না, প্রয়োজন হচ্ছে এর কঠোর প্রয়োগ। যার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক সচেতনতা। এই অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা এখন এতটাই গভীর যে, দেরিতে হলেও একে স্বাগত জানাতে হয়। কারণ, আজ বাংলাদেশের রাজপথ থেকে গ্রামের অন্ধকার গলি পর্যন্ত মানুষ একটাই প্রশ্ন করছে আমরা আর কতকাল ভয়ে-আতঙ্কে বাঁচব? এই অধ্যাদেশ যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটাই এখন চ্যালেঞ্জ। অতীতে এমন বহু আইন হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবে সেগুলোর মৃত্যু ঘটেছে কেবলই ফাইলের ভেতরে। প্রশ্নও জাগে, এই অধ্যাদেশ কি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার জন্য? নাকি সত্যিকারের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে? মানুষ সেই উত্তর খুঁজছে। নানা প্রশ্নের মাঝেও অনুমোদনকৃত এই অধ্যাদেশের ব্যাপারে কিছুটা হলেও আস্থা তৈরি হয়েছে জনমনে। অনেকেই বলছেন, ড. ইউনূস সরকার হয়তো এর বাস্তবায়ন করবে।

সন্ত্রাসীরা আজ আর মুখোশ পরে থাকে না। চাঁদাবাজি, জমি দখল, স্কুলে প্রভাব বিস্তার, এমনকি খুন-ধর্ষণ সবকিছুতেই তাদের দাপট। অস্ত্র যেন হয়ে উঠেছে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার।  প্রশাসনের চোখের সামনে এই অপরাধীরা বড় হচ্ছে, ঘাঁটি গেড়ে বসছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলেও সেই আতঙ্ক কাটেনি। দেশবাসী এখন ঘুমাতে গেলেও চোখে ভেসে ওঠে সেই ভয়াল দৃশ্য মাঠে শোয়ানো তরুণকে লাঠিপেটা করছে  কোনো দলের নেতা, রড দিয়ে পেটানো হচ্ছে ছাত্রদল কর্মীকে, ছাত্রী হলে জোর করে ঢুকে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এসব কিছুর ভিডিও এখন সাধারণ মানুষের হাতে। ফেসবুক, ইউটিউব আর সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত উঠে আসছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্যচিত্র, যা কেবল ভয়ংকর নয়, বর্বরতার নতুন সংজ্ঞা। এসব ভিডিও কেবল দৃশ্য নয়, এগুলো জাতির সন্ত্রস্ত চিৎকারের দলিল। এসব প্রমাণ করে এ দেশে যারা দলীয় ছত্রছায়ায় ছিল, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রক্তের রাজনীতি চালিয়েছে। মানুষ আর চায় না সেই আওয়ামী লীগের মতো সন্ত্রাসের দুঃশাসন। এই প্রেক্ষাপটে সরকার যখন ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’ জারি করে, তখন তা নিছক আইন নয়, এটি হতে হবে ইতিহাসের সামনে এক কঠিন জবাবদিহি। তবু শঙ্কা থেকে যায়। সন্ত্রাসীরা দল পাল্টেছে। অন্য কারও ছত্রছায়ায় এসেছে। থেমে নেই তারা। ওই অস্ত্রগুলো এখনো আছে। সেসবের দাপটে এখনো সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। তবে পুলিশ যেন কোনো ‘বড় ভাইয়ের লোক’ না হয়ে যায়, সেই প্রত্যাশা আমাদের। পুলিশ-প্রশাসন যেন রাজনৈতিক দলের ‘ছায়া সংস্থা’তে পরিণত হয়, সেখানে আইন প্রয়োগ হয় নির্বাচিতভাবে। এক পক্ষের দখলে পুলিশ থাকলে, অপর পক্ষ দমিত হয়। এই চিত্র আমরা বারবার দেখেছি। আর যেন তা দেখতে না হয়। সন্ত্রাস দমনে পুলিশের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ভূমিকা না থাকলে, অধ্যাদেশও নিষ্ফলা হয়ে যাবে। মানুষ জানতে চায় এবার কি পুলিশও দলনিরপেক্ষ হবে? সন্ত্রাসীরা দল বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না। পরিস্থিতি বুঝে এক দলের ছায়া থেকে অন্য দলে আশ্রয় নেয়। তারা হয়তো রাজনৈতিক পতাকা বহন করে, কিন্তু আদতে তারা কেবল নিজের স্বার্থই দেখে।এটা বাস্তব যে, সম্মিলিত পদক্ষেপ না হলে কোনো আইন কার্যকর হবে না। প্রধান উপদেষ্টা কিংবা উপদেষ্টা পরিষদের যে সম্মিলিত আহ্বান এসেছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু আইন দিয়ে সবকিছু হয় না। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে যদি দলীয় বিবেচনা না আসে, তবে তা সত্যিই দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। প্রশ্ন আসে, এবার সত্যি কি বদলাবে দৃশ্যপট? তবু মানুষ হতাশ। তারা বহুবার দেখেছে রাজনৈতিক ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি, দেখেছে নতুন নতুন আইন, কিন্তু কিছুদিন পরই সেই হুমকি ফিকে হয়ে গেছে। আইন কার্যকর হয় না। এবারও যদি তা-ই হয়, তাহলে আর কেউ রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করবে না। সন্ত্রাস দমন চাই, আর রাজনৈতিক লালন নয়। এ দেশে সাধারণ মানুষ আর দলীয় সন্ত্রাস দেখতে চায় না। তারা নিরাপদ স্কুল, শান্তিপূর্ণ বাজার এবং নির্ভয়ে চলাফেরার স্বাধীনতা চায়। রাজনীতিবিদদের হাতে আর যেন সন্ত্রাসী বেড়ে না ওঠে। চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী, লুটেরা যারা দেশের শান্তি ও উন্নয়নের পথে বাধা তাদের পরিচয় দল দিয়ে নয়, অপরাধ দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে। সন্ত্রাস দমনের এখনই সময়। এই সুযোগ যেন আর হাতছাড়া না হয়।

সন্ত্রাস দমনের পূর্বশর্তই হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার। অস্ত্র উদ্ধার ছাড়া সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসে? কাদের ছত্রছায়ায় ছড়িয়ে পড়ে? মূলত এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী একটি চোরাচালান চক্র, যারা রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে এই ব্যবসা নির্বিঘেœ পরিচালনা করছে। সন্ত্রাস শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি একটি দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় প্রতিবন্ধকতা। যখন বিনিয়োগকারী নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।  আন্তর্জাতিক মহলেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। তাই সন্ত্রাস নির্মূল মানে শুধু অপরাধ দমন নয়, এটি একটি টেকসই উন্নয়ন কৌশলও বটে। বাংলাদেশে অস্ত্র আইন, দাঙ্গা দমন আইন, চাঁদাবাজি বিরোধী আইন সবই আছে। আইন যদি থাকে, প্রয়োগ কোথায়? বাস্তবতা হলো, আইনের প্রয়োগ খুবই পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্বল। অনেক সময় পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্য এই সন্ত্রাসীদের ‘বন্ধু’ হয়ে ওঠে। তারা হয় ঘুষ নেয়, না হয় রাজনৈতিক চাপের কারণে চুপ থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে থানা এবং প্রশাসন রাজনৈতিক নেতার নির্দেশ ছাড়া কোনো পদক্ষেপই নিতে পারে না। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭২% নাগরিক মনে করে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অধিকাংশ সন্ত্রাসী পার পেয়ে যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনেও বারবার বলা হয়েছে, গুম, খুন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার বিচার হচ্ছে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পথ নেই। সন্ত্রাস দমন করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। সরকারের প্রতিটি অঙ্গের আন্তরিকতা ছাড়া শুধু আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কঠোর বার্তা দিতে হবে যে, তাদের আশ্রয়ে কেউ সন্ত্রাসে লিপ্ত হলে, তাকেও রেহাই দেওয়া হবে না। দলের ভেতরে ‘সন্ত্রাসী লালন’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা না হলে এই অভিশাপ ঘুচবে না। পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় জরুরি সন্ত্রাসী ও অপরাধী ধরার জন্য কেবল পুলিশের ওপর নির্ভর করে লাভ নেই। র‌্যাব, সিআইডি, এনএসআই, ডিবি সব সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং একসঙ্গে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, এক সংস্থার হাতে ধরা পড়া অপরাধী আরেক সংস্থার হস্তক্ষেপে ছাড়া পেয়ে যায়। এমন অনৈক্য সন্ত্রাস দমনের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সন্ত্রাস নির্মূলে সম্ভাব্য করণীয় : ১. অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে হবে। ২. সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ বিবেচনায় বিচার করতে হবে। ৩. পুলিশ প্রশাসনকে দুর্নীতি ও পক্ষপাতহীনভাবে শক্তিশালী করতে হবে। ৪. রাজনৈতিক দলগুলোকে লিখিতভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। ৫. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করতে হবে। ৬. সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাস্তবায়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ৭. সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে ভয়ের ঊর্ধ্বে রেখে সত্য প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। সন্ত্রাস এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই এটি দমন করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এখানে আপসের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং জনগণ সবার সম্মিলিত সদিচ্ছাই পারে এই ভয়াবহ ব্যাধিকে নির্মূল করতে। শুধু আইন তৈরি নয়, দরকার এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। এমন বাস্তবতায় সরকার যখন ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’ অনুমোদন দেয়, তখন তা অবশ্যই আমরা নিঃশর্তভাবে সমর্থন করি। তবে এটি নিয়ে বিতর্ক না উঠুক। সন্ত্রাসমেঘ কাটুক।

লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক

newsstoremir548@gmail.com