ঘূর্ণিঝড় রেকর্ড ভাঙছে মে মাস। গড়ে প্রায় প্রতি বছর মে মাসে এক বা একাধিক লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় এবং এগুলো থেকে কমপক্ষে একটি হলেও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে থাকে। চলতি মাসের আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বঙ্গোপসাগরে একাধিক লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল এবং একটি ঘূূর্ণিঝড় সৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল।
তবে এবার আর তা হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। আবহাওয়ায় এত নিশ্চিত করে বলার কোনো সুযোগ না থাকলেও মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ের আপদ না হওয়ার বিষয়ে প্রায় বেশিরভাগ আবহাওয়াবিদই প্রায় একই মত প্রকাশ করেন। আবহাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বজলুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মাসে আর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সুযোগ নেই। অন্যান্য বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় হলেও এবার আর তা হচ্ছে না।’
কেন হচ্ছে না? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবার ২০০৯ সালের পর ৮ দিন আগে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করেছে। আর মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর দেশের আবহাওয়ার ইতিহাসে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির রেকর্ড তেমন একটা নেই (২০১৫ সালের জুলাইয়ে সৃষ্ট ‘কোমেন’ ছাড়া)। বড়জোর মৌসুমি লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। আর এর প্রভাবে দেশে বৃষ্টিপাত হতে পারে। সে হিসেবে ২৭ মে এর দিকে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং তা পরে উপক‚লে উঠে স্থল নিম্নচাপে রূপ নিতে পারে, কিন্তু ঘূর্ণিঝড় হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তাহলে প্রশ্ন আসছে মৌসুমি বায়ু কবে প্রবেশ করল? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা কাজী জেবুন্নেসা বলেন, ‘গত শনিবার (২৪ মে) দেশের টেকনাফ অঞ্চল দিয়ে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করেছে। আর এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতও হচ্ছে।’
মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করলে ঘূর্ণিঝড় কেন হবে না?
জলবায়ু বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস উলম্বভাবে ওপরের দিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওঠে এবং আনুভ‚মিকভাবে ৫০ থেকে ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয় আনুভ‚মিকভাবে। ফলে মৌসুমি বায়ু ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসকে ওপরের দিকে উঠতে বাধা দেবে। আর তখন তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে না। আর এ কারণেই বর্ষাকালে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হয় না মৌসুমি বায়ুর তোড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র শক্তির ঘূর্ণিঝড় কখনো কখনো হয়ে থাকে তবে তা খুবই কম। ঘূর্ণিঝড় না হলেও নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ হয়ে থাকে যার প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয়।
তাহলে যেহেতু দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত টেকনাফ দিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে মৌসুমি বায়ু দেশে প্রবেশ করেছে। এখন কি আর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে ড. কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সুযোগ তেমন একটা নেই। তবে লঘুচাপ বা নিম্নচাপ হলেও হতে পারে। তারপরও প্রকৃতি নিয়ে এত আগাম নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন।’
এ বিষয়ে কথা হলে সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘মৌসুমি বায়ু সেট হওয়ার পর সাধারণত ঘূর্ণিঝড় হয় না। আর এ কারণে এবার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সুযোগ নেই। তবে এ সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে মৌসুমি বায়ুর আগাম এসে যাওয়া।’
মৌসুমি বায়ু আগাম কেন এলো?
প্রতি বছর এপ্রিল ও মে মাসের তীব্র গরম থেকে দেশবাসীকে বাঁচাতে সুবাতাস হিসেবে আন্দামান সাগর থেকে মিয়ানমার হয়ে টেকনাফ উপক‚ল দিয়ে জলীয় বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর তা প্রবেশের পরপরই বাংলাদেশে ঋতুচক্রের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শুরু হয় বর্ষাকাল। এপ্রিল ও মে মাসের গরম থেকেও রক্ষা করে এই বাতাস। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা এই জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস ও উত্তরের শুষ্ক বায়ুর সংঘর্ষে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। শুষ্ক বায়ুর ছোঁয়ায় এসে গলে যায় জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু এবং দেশে বর্ষাকাল শুরু হয়। এ বাতাস জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে প্রবেশ করার কথা। সে হিসেবে ১ জুনকে ধরা হয় মৌসুমি বায়ু আগমনের দিন। সর্বশেষ ২০০৯ সালে ২৪ মে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করেছিল। এরপর থেকে প্রতি বছর জুনের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে এ বাতাস প্রবেশ করেছে। এর আগে মে মাস জুড়ে দেশের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকত বলে জানান আবহাওয়াবিদ ড. মোহন কুমার দাশ। তিনি বলেন, ‘এ বছর মে মাস জুড়ে তেমন তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি। আর এতে সাগরের তাপমাত্রা কম ছিল। সাগরের তাপমাত্রা কম থাকায় সেখানে কোনো লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়নি। ফলে শান্ত সাগর দিয়ে মৌসুমি বায়ু বিনা বাধায় আগেভাগে চলে এসেছে। এর সঙ্গে বৈশি^ক জলবায়ুগত বিষয়ও রয়েছে।’
মে মাসের যত ঘূর্ণিঝড়
দেশের ইতিহাসে এপ্রিল ও মে মাস এবং সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস হলো সবচেয়ে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ সময়। এ সময়েই সবচেয়ে বেশি ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এ বিষয়ে বুয়েটের ড. কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মে মাসের শেষার্ধ হলো ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সবচেয়ে অনুকূল সময়। আর এ কারণে বর্ষার পূর্বে বেশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে বর্ষা শুরু হলে সাধারণত ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় না।’
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ আঘাত করেছিল উপক‚লে। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ মে ‘মোখা’, ২০২১ সালের ২৭ মে ‘ইয়াস’, ২০২০ সালের ২১ মে ‘আম্ফান’, ২০১৯ সালের ৪ মে ‘ফণী’, ২০১৭ সালের ৩১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’, ২০১৬ সালের ২২ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানা’, ২০১৩ সালের ১৬ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’, ২০১০ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘লায়লা’, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’, ২০০৮ সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’, ২০০৭ সালের ১৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আকাশ’ উপক‚লে আঘাত করেছিল। তবে মৌসুমি বায়ু সেট হওয়ার পর ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ ২ আগস্ট মিয়ানমার উপক‚লে আঘাত করেছিল।