বাংলাদেশের টেস্ট দলে ইদানিং দেখা যাচ্ছে এক অভিন্ন ফরমেশন। ছয় ব্যাটার, পাঁচ বোলার ও একজন অলরাউন্ডার। মেহেদী হাসান মিরাজ নিয়মিতভাবেই সেই অলরাউন্ডারের ভূমিকা পালন করছেন। কখনো কখনো সাহসী এই কৌশল এনে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যও। তাই ধারণা ছিল, জাতীয় দলের পাইপলাইন হিসেবে কাজ করা এ দলেও হয়তো একই কৌশলের অনুসরণ পথে হাঁটবে। যাতে ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে তৈরি হয় সঙ্গতি।
সেই আশার আলো দেখা গিয়েছিল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম অনানুষ্ঠানিক টেস্টে। নুরুল হাসান সোহানের নেতৃত্বে ‘এ’ দল মাঠে নামে ছয় ব্যাটার ও পাঁচ পেসার নিয়ে—একটি সাহসী ও পরীক্ষাধর্মী একাদশ। সিলেটের বাউন্সি, সিম-সহায়ক উইকেটে ম্যাচটি হয়ে ওঠে দারুণ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। দুপক্ষই দেখিয়েছে প্রভাব বিস্তারের মুহূর্ত, কিন্তু শেষ বিকেলের ঝাপসা আলোয় ভেঙে পড়ে স্বাগতিকদের ব্যাটিং। সুযোগ কাজে লাগিয়ে সফরকারীরা তুলে নেয় স্মরণীয় জয়, সিরিজে নেয় ১-০ ব্যবধানে লিড।
ফল যাই হোক, বড় লক্ষ্যের পথে স্থির ছিলেন ‘এ’ দলের প্রধান কোচ মিজানুর রহমান বাবুল। বলেছিলেন, ‘দল নিয়ে একটু আলাদাভাবে ভাবছি। ঘাস ও বাউন্সযুক্ত উইকেট বানিয়ে খেলোয়াড়দের শেখাতে চাই, কেমন করে এমন কন্ডিশনে জেতা যায়।’ দ্বিতীয় টেস্ট শুরুর আগে বাবুল ছিলেন আরও প্রত্যয়ী। জানিয়ে দেন, ড্র নয়, এবার জয়ের লক্ষ্যেই নামবে দল, ‘জিততেই হবে—হারলেও সমস্যা নেই, কিন্তু ড্রয়ের চিন্তা করার সুযোগ নেই।’
কিন্তু সিলেটের পরাজয়ের পর দৃশ্যপট বদলে গেল রাতারাতি। সাহসী পরিকল্পনা, পেস বোলিং বিকাশ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি—সব ম্লান হয়ে গেল এক কৌশলগত ঘূর্ণিতে। মিরপুর টেস্টে ফিরল পুরনো, রক্ষণাত্মক কৌশল। একাদশে এবার সাত ব্যাটার, তিন স্পিনার ও কেবল একজন পেসার। যে কৌশল থেকে জাতীয় দল বহু আগেই বেরিয়ে এসেছে।
উইকেটের স্পিন সহায়ক চরিত্র মাথায় রেখেই হয়তো দলে নেওয়া হয় নাঈম হাসান, নাসুম আহমেদ ও হাসান মুরাদকে। একমাত্র পেসার হিসেবে সুযোগ পান খালেদ আহমেদ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বিস্ময় জাগায়—বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন পেস বোলিংয়ের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুর্ভাগ্যবশত স্পিনাররা কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেননি। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচটি গড়ায় ড্রয়ে, আর সিরিজ ১-০ ব্যবধানে জিতে নেয় নিউজিল্যান্ড ‘এ’। অথচ খালেদই ছিলেন একমাত্র ধারাবাহিক উইকেট-শিকারি।
সেই ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে অধিনায়ক সোহান বলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—জয়। ‘আমি যখন জানলাম ‘এ’ দলের অধিনায়ক হয়েছি, তখনই একটা সভা করি। সবার সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়—ব্যক্তিগত লক্ষ্য নয়, খেলব দলের জন্য। আমরা আলোচনায় রেখেছিলাম কেবল একটি প্রশ্ন—কীভাবে ম্যাচ জেতা যায়। কেউ নিজের মাইলস্টোন নিয়ে ভাবেনি।’
এই দলীয় কৌশলের প্রতিফলন দেখা গেছে আরেক উন্নয়ন ইউনিট ‘ইমার্জিং’ দলের ক্ষেত্রেও। রাজশাহীতে দক্ষিণ আফ্রিকার ইমার্জিং দলের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে জয় পেলেও (২-১), কৌশলগত দোলাচল ছিল স্পষ্ট। প্রথম দুটি ম্যাচে তিন পেসার নিয়ে নামলেও, তৃতীয় ও নির্ধারক ম্যাচে খেলা হয় তিন স্পিনার নিয়ে—যেটি মিরপুরের ধারারই প্রতিফলন। জয় এলেও রেখে গেল প্রশ্ন।
এমনকি চলমান চট্টগ্রামের চারদিনের ম্যাচেও দেখা যাচ্ছে স্পিন-নির্ভর একাদশ। পেসারদের উপেক্ষা করে যেন প্রতিটি সিদ্ধান্তেই প্রাধান্য পাচ্ছে স্বল্পমেয়াদি জয়।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—‘এ’ দল হোক বা ইমার্জিং, আদৌ কি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে? নাকি ক্ষণিকের সাফল্যই হয়ে উঠছে একমাত্র ধ্যানজ্ঞান?
বাংলাদেশ ক্রিকেটের এখন দরকার একটি সুসংহত ও সাহসী পরিকল্পনা—যেখানে সাময়িক ফলাফলের মোহকে ছাপিয়ে গড়ে তোলা হবে ভবিষ্যতের জন্য এক মজবুত ভিত।