সংস্কারের দাবি ঐক্য পরিষদের

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন চরম বৈষম্যপূর্ণ

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে চরম বৈষম্যপূর্ণ বলে মত দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক জাতীয় ঐক্য পরিষদ। পরিষদের নেতারা বলেছেন, প্রতিবেদনে ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ব্যাপারে কোনও প্রস্তাবনা নেই। বরং এই স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে অনেক ভুল ও অসঙ্গত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তারা এই এই প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন।

আজ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবাদ জানানো হয়। সম্মেলনে কমিশনের প্রতিবেদনে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা খাত সংক্রান্ত নানা অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়।

সম্মেলনে এই চিকিৎসা খাত নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তুলে ধরেন পরিষদের আহ্বায়ক ডা. মির্জা লুতফর রহমান লিটন ও সদস্য সচিব ডা. তাওহিদ আলবেরুনী। এ সময় পরিষদের সদস্য সদস্য ডা. আমিনুল বারী কানন, ডা. মিজানুর রহমান খান, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগ, ডা. কাজী হাবিবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এই চিকিৎিসকরা দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক খাতে ইতিবাচক সংস্কার ও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দেন এবং এ জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আশু সুদৃষ্টি কামনা করেন।

সম্মেলনে বলা হয়, কমিশনের প্রতিবেদনে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অসঙ্গত তথ্য উপস্থাপন ও চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কমিশনে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা খাতের কোনও প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এমনকি কমিশন হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ, ইউনানী আয়ুর্বেদিক বোর্ড, কাউন্সিল,স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট খাতের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের থেকে মতামত নেয়নি।

প্রতিবেদনে এই চিকিৎসা খাত নিয়ে অনির্ভরযোগ্য ও অসংগতিপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগ করা হয়। বলা হয়, প্রতিবেদনের ৫১ ও ৭৩ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, বিগত এক বছরে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সেবা এবং ১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সেবা নিয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ড ও বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ২০-৪০ শতাংশ মানুষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৮ শতাংশ এবং ঢাকায় চিকিৎসা নেন ৩১ শতাংশ, কিছু কিছু স্থানে ৪০ শতাংশ বা তারও অধিক মানুষ। একইভাবে ২০-৩০ শতাংশ মানুষ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নেন এবং ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্যাডিশনাল মেডিসিন গ্রহণ করেন। এসব চিকিৎসার হার ক্রমাগত বাড়ছে।

পরিষদ আরও জানায়, কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- দেশে ৮৪৪ জন স্নাতক ও ৩ হাজার ৭৩৩ জন ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক ডিপ্লোমা চিকিৎসক রয়েছেন। এই তথ্য ভূল। কারণ বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্রাটেজি ২০২৪ এর তথ্য মতে, দেশে হোমিওপ্যাথিক স্নাতক চিকিৎসক রয়েছেন  ১ হাজার ৮৬৫ জন, হোমিওপ্যাথিক ডিপ্লোমা চিকিৎসক ৩৮ হাজার ৫৪ জন, ইউনানী স্নাতক চিকিৎসক ৭৮০ জন, ইউনানী ডিপ্লোমা ও সার্টিফাইড প্র্যাক্টিশনার ৭ হাজার ৫৯৫ জন এবং আয়ুর্বেদিক স্নাতক চিকিৎসক ৬৪৮ জন, আয়ুর্বেদিক ডিপ্লোমা ও সার্টিফাইড প্র্যাক্টিশনার ৪ হাজার ৮২৮ জন।

পরিষদ জানায়, কমিশনের প্রতিবেদনের ২৩ ও ১১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএমডিসিসহ বিভিন্ন কাউন্সিলের নাম উল্লেখ থাকলেও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল ও প্রক্রিয়াধীন ইউনানী এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের কথা উল্লেখ নেই। এমনকি আইন, বিধিমালা ও নীতিমালায় ইউনানী আয়ুর্বেদিক প্রাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩, হোমিওপ্যাথিক প্রাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩, বাংলাদেশ  হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন ২০২৩ উল্লেখ করা হয়নি।

এ সময় হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী, আয়ুর্বেদিক এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ওষুধের চাহিদা বেড়েছে। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের বাজার বর্তমান ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। বর্তমানে বিশ্বে আয়ুর্বেদিক ওষুধের বাজার ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগামী ২০৩২ সাল নাগাদ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের উন্নীত হবে। পাশাপাশি ইউনানী ওষুধেরও সারা বিশ্বে ব্যাপক বাণিজ্যিক বাজার গড়ে উঠছে।

এই চিকিৎসকরা জানান, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৩২৩ টি অ্যালোপ্যাথিক, ২৮৬ টি ইউনানী, ২০৬ টি আয়ুর্বেদিক এবং ৭১ টি হোমিওপ্যাথিক ও ৩৯টি হার্বাল ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ধরনের মোট ৬০৭টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ সারা বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই খাতের ওষুধে চাহিদা দেশে ও বিদেশে ব্যাপক হারে বাড়ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা খাত অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-‘এমবিবিএস ও বিডিএস ব্যতিত কেউ চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা প্রদান করতে পারবে না’। তাহলে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা কিভাবে চিকিৎসা দেবেন? কমিশনের এই প্রস্তাবনা বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন ২০২৩ এবং ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক প্র্যাক্টিশনার্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ পরিপন্থী।