বিজয়ীরাই ইতিহাস লিখে থাকেন। পরাজিতরা যথারীতি হা-পিত্যেশ করেন। এই চর্চা সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই। বিজয়ীরাই ক্ষমতাসীন হন। ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন বছরের পর বছর দশকের পর দশক।
এই ক্ষমতাকাল যত দীর্ঘায়িত হয়, তাদের দোসরদের চোখের ছানির পুরুত্ব ততই বাড়তে থাকে। একসময় তেমন কিছুই আর চোখে পড়ে না। আমার এই লেখাটির তিনটি প্রধান চরিত্র : মীর জাফর আলী খান, এডলফ হিটলার এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো।
আমার শৈশবের নায়ক সিনেমার সিরাজউদ্দৌলা। সিনেমা দেখে ও শুনে যে কটি পঙ্ক্তি মুখস্থ করেছি, তা কেবল আমার মুখস্থ নয়, কয়েক প্রজন্ম ধরে আমাদের অনেকেরই। ‘বাংলা বিহার উড়িশ্যার মহান অধিপতি তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের প্রশ্রয় দিও না, তুমি বলেছিলে, সুযোগ পেলেই তারা এ দেশ কেড়ে নেবে; আমি তাদের প্রশ্রয় দেব না।’ ঐতিহাসিক সেই সিনেমায় আরও একজন আছেন, প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান। তার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই বাংলার ‘স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত’ হয়েছে। নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা।
১৯৯৭ সালে প্রশিক্ষক হিসেবে চাকরি করেছি বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। একজন জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষকের অবর্তমানে আমাকে দেওয়া হলো তার একটি ক্লাস ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব বাংলা ও ভারতবর্ষে। তখন জাতির পিতা নিয়ে একটি আলোচনা বেশ চলছে, আলোচকদের অধিকাংশই দলকানা বুদ্ধিজীবী। জাতির পিতার ধারণাটি মাথায় রেখে ক্লাসের শুরুতেই বলে ফেললাম, আধুনিক ভারতবর্ষের জাতির পিতা মীর জাফর আলী খান। আলোচনায় ঢোকার আগেই সদ্য-চাকরিতে আসা বিসিএস কর্মকর্তাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো, কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেন একজন বললেন, একজন বিশ্বাসঘাতককে এমন সম্মানের আসনে বাসানো ঠিক নয় (অর্থাৎ আপনি ভুল করছেন)।
আমি ধরেই নিলাম, মূল্যায়নের সময় এই প্রশিক্ষার্থীরা আমাকে এত কম নম্বর দেন যে, এরপর হয়তো অযোগ্য বিবেচনা করে আমাকে আর ক্লাসে পাঠানোই হবে না।
দুর্বল যুক্তি দিয়ে বললাম, যদি মীর জাফর আলী খান লর্ড ক্লাইভের টাকা খেয়ে বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন সম্ভবত থেকে যেত সিরাজের শাসন। রাজভাষা ফার্সিই থেকে যেত। প্রশিক্ষার্থীদের কেউ কেউ হতেন বড়জোর মুন্সি, কেউ খতিব, কেউ টোলের প-িত। বিসিএস পাস করে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসতে হতো না; প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলো অধিকার করার স্বপ্নও দেখা হতো না। গুঞ্জন কমে এলো। কেউ কেউ বললেন, ঠিকই বলেছেন। মীর জাফরই ভারতে ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিকতা এনে দিয়েছেন।
আমি বললাম, এখনই সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। চন্দননগরের যুদ্ধে মঁশিয়ে দুপ্লে জিতে গেলে ইংরেজির স্থান দখল করত ফরাসি ভাষা, আমরা হতাম ফ্রেঞ্চ কলোনি।
প্রশিক্ষার্থীরা এটা মানতে তেমন রাজি হলেন না, বললেন ইংরেজিই ভালো।
ইংরেজ শাসনের মন্দ দিক নিয়ে বেশ ঝাড়া একটা বক্তৃতা দিলাম। কিন্তু মনে হলো, সেই ক্লাসে তাদের অনেকেই একটা বিষয় গ্রহণ করেছেন পলাশীর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরই আধুনিক ভারতের জাতির পিতা। ১৭৫৬-এর পর পরবর্তী দুটি মাইলস্টোন ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ গ্রহণ করুন বা না-ই করুন জাতির পিতা আর দুজন কে? একটু ভিন্ন চোখে দেখুন। সে ক্লাসে আমার মূল্যায়ন নম্বর নব্বইয়ের ঘরেই ছিল।
১৯৪৭-এ ভারতবর্ষের স্বাধীনতায় হিটলারের অবদান ১৯৪৭-এ ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ দ্বিখ-িত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। এই স্বাধীন দু’খন্ডের জাতির পিতা কে? ভারতের জন্য মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী? আর পাকিস্তানের জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ? ভারত ভাগের কৃতিত্ব পেতে পারেন জিন্নাহ। কিন্তু স্বাধীনতার বেলায় গান্ধী-নেহরু-প্যাটেল-জিন্নাহ-লিয়াকত কেউ নন। বরং গান্ধীকে তো একালে চিহ্নিত করা হচ্ছে ‘গান্ধী, অ্যান অবস্টাকল ফর দ্য ফ্রিডম ইন ইন্ডিয়া’ ভারতের স্বাধীনতার পথে বাধা হিসেবে।
১৯৪৭-এর স্বাধীনতার জনক তাহলে কে?
এডলফ হিটলার। ইতিহাসে তার স্থান মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হলেও ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নির্মোহ ইতিহাস যারা লিখবেন, হিটলারকে তার প্রাপ্য অবশ্যই দিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ ঔপনিবেশিক শক্তিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের ওপর হিটলারের আঘাত অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে।
বিশেষ করে, ব্রিটেনের অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল যে, মহাযুদ্ধোত্তর মার্শাল প্ল্যানের আওতায় মোট ঋণের এক-চতুর্থাংশ তাদেরই দিতে হয়েছে।
১৯৪৩ সালের অক্টোবরে আর্চিবল্ড পার্সিভ্যাল ওয়াভেল ভাইসরয় হিসেবে ভারতে এলেন। ততদিনে ইংরেজ খেদাও ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলন দ্যুতিহীন হয়ে পড়েছে। ১৯৪৫ সালে ওয়াভেল লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দিলেন : ‘দুর্বলতা বলি কিংবা অন্য যা কিছু বলি, আমাদের হাতিয়ার হচ্ছে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ উপাদান। এদিকে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধাচারীদের হাতে ভারতের নগরসমূহ পরাস্ত হয়েছে আর গ্রামাঞ্চল চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’ দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধ ভারতকে নাস্তানাবুদ করেছে। কেন্দ্র স্বয়ং হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছে ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানে তাদের জোগান দেওয়ার ক্ষমতা আর নেই। ওয়াভেল সাফ জানিয়ে দিলেন, ভারতবর্ত শাসন করার শক্তি তারা সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছেন।
ভারতীয় গান্ধীপূজারী ঐতিহাসিকরা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সাফল্যের মিথ সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক নেই। দরবারি ঐতিহাসিকদের ভ্রান্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা এখন পরিত্যক্ত। যদি হিটলার না থাকতেন, যদি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ না হতো, যদি মহাযুদ্ধ ব্রিটেনের আর্থিক মেরুদ- ভেঙে না দিত, যদি ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের অন্তরাত্ম কাঁপিয়ে না তুলত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের বুদবুদ অচিরেই মিলিয়ে যেত আর স্বাধীনতা পেতে লেগে যেত আরও অনেক দশক। ততদিনে গান্ধীর প্রয়াণ ঘটত আর ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকত অনেক স্বাধীনতা আন্দোলনকারী একজন হিসেবে। যেমন বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, মোতিলাল নেহরু, দাদাভাই নওরোজি কিংবা চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে। স্পষ্টত, গান্ধীর মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে; হয়েছে হিটলারের মাধ্যমে, যিনি ব্রিটেনকে একটি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া রাজত্বে পরিণত করেছিলেন। স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের মাধ্যমে। তবে গান্ধী ও জিন্নাহ উভয়ের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তবাদ ভারতবষর্কে দ্বিখ-িত করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি আজন্ম বৈরী রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটিয়েছে।
সুষ্মিত কুমারের ‘গান্ধী : অ্যান অবস্টাকল ফর দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্স অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে ১৯৩০-এর দশকেই জনগণের মধ্যে গান্ধীর জনপ্রিয়তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছিল, কারণ বাস্তবে গান্ধীর কোনো ধারণাই ছিল না কেমন করে ভারতের স্বাধীনতা আনতে হবে। ১৯২৭ সালে মাদ্রাজ কংগ্রেসে যখন প-িত জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো স্বাধীনতাকামী নেতা ভারতের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তাব পাস করালেন, গান্ধী তখন বিরক্ত হয়েছিলেন। তাকে সন্তুষ্ট করতে পরের বছর ১৯২৮-এর কলকাতা কংগ্রেস মিশনে মাদ্রাজ রেজল্যুশন বদলে লেখা হলো ব্রিটিশ শাসনে ভারতের জন্য ডমিনিয়ন মর্যাদা চেয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে অনুরোধ করা হবে। ওদিকে ১৯৪৫-এ মহাযুদ্ধ যখন শেষ হলো আর্থিক পঙ্গুদশার বাইরেও ‘ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী’ পদ্ধতিসমূহ উদ্দেশ্যহারা হয়ে পড়ল। ভারতে ব্রিটিশ স্বার্থের ব্যবস্থাপক যারা ছিলেন ক্রমবর্ধমান প্রতিকূলতার মুখে জীবনের ঝুঁকি ও আর্থিক প্রতিকূলতায় ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষা করার নব নব উদ্ভাবনে আর সাহসী হলেন না।
কেবল ভারতবর্ষ নয়, ১৯৪৬-এ ব্রিটেন জর্দানকে ছেড়ে দেয়, ১৯৪৭-এ প্যালেস্টাইন, ১৯৪৮-এ শ্রীলঙ্কা, একই বছর মিয়ানমার, ১৯৫২-তে মিসর, ১৯৫৭-তে মালয়েশিয়া। কেবল ব্রিটেন নয়, হিটলারের আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়া ফ্রান্স ছেড়ে দিল লাউস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম; নেদারল্যান্ডস ছাড়ল ডাচ, ইস্ট ইন্ডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া।
যদি হিটলার ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙে না দিতেন স্বাধীনতা পেতে এ দেশগুলোর কয়েক যুগ লেগে যেত।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা লাভ করা দেশগুলোর জন্য হিটলার পরোক্ষভাবে হলেও জাতির পিতা। পিতাদের চেয়ে কম অবদান রাখেননি।
ভুট্টো কেন জাতির পিতা হবে না?
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সম্ভবত তার পরামর্শক ও গোয়েন্দাদের কাছ থেকে সঠিক ব্রিফিং পাননি। পেলে ১৯৭০-এর লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) নিশ্চয়ই জারি করতেন না। এই আদেশ জনসংখ্যানুপাতিক জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ করে দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়ে ১৬২ আসন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি। পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে দেওয়ায় সেখানে চারটি প্রদেশের পুনঃঅভ্যুদয় ঘটে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। সেনানায়ক ইয়াহিয়া খান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং স্বীকার করতেই হবে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। নারী আসনসহ এ দলের প্রাপ্ত আসন দাঁড়ায় ১৬৭টি। আর চারটি নারী আসনসহ জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির মোট আসন দাঁড়ায় ৮৮টি।
১৯৭০-এর ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান দেশবাসীকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানান এবং ঘোষণা করেন বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ প্রধান ‘শেখ মুজিবুর রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।’
এই নির্বাচনের পূর্বনির্ধারিত তারিখ ছিল ৫ অক্টোবর ১৯৭০, কিন্তু বন্যা এসে যাওয়ায় এবং কয়েকটি কিঞ্চিৎ জনপ্রিয় রাজনীতিক দলের নির্বাচন পেছানোর দাবির কারণে প্রেসিডেন্ট ‘নজিরবিহীন’ বন্যার দোহাই দিয়ে নির্বাচনে জনগণের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে নির্বাচন পেছানোই যৌক্তিক মনে করেন। তারিখ নির্ধারিত হয় ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০। পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান বলেন, একটি বিশেষ দলকে সুবিধা প্রদান করতে নির্বাচন পেছানো হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের আবহাওয়া ভালো হয়ে এসেছে এবং অক্টোবরের মধ্যেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করবে।
নির্বাচনে নিরঙ্কশ বিজয় অর্জনের পর তখনকার সব পূর্ব পাকিস্তানির চাওয়া শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। এ চাওয়া শেখ মুজিবুর রহমানেরও।
কোনো যুক্তিই চলবে না, শেখ মুজিব তার দেশের ৮৫.৭ শতাংশ ভূ-ভাগ বিসর্জন দিয়ে কেবল ১৪.৩ শতাংশ ভূ-ভাগের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। তার অখ- পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের ঘোর মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আলিঙ্গন করা পর্যন্ত বহাল ছিল। তিনি বলেছেনও তুমি কেমন করে হবে, আমিই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, আমিই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা।
প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন অটুট থাকা অবস্থায় তার সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে পূর্ব পাকিস্তান বদলে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ী এদেশ বিশ্ব-মানচিত্রে বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু তা কেমন করে হলো?
পশ্চিমা ষড়যন্ত্র, পাঞ্জাবিদের ষড়যন্ত্র এসব বলে পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিবিদরা মুখে ফেনা তুলেছেন পুরো তেইশ বছর। কিন্তু তাতে অবস্থার তেমন হেরফের হয়নি। ১৯৭০-এর ৫ অক্টোবর, অর্থাৎ সাধারণ নির্বাচনের বেশ আগে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল নূর খান প্রকাশ্য জনসভায় জানিয়ে দিলেন, ভুট্টো আমলাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন।
কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা নূর খান বললেন, যারা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর চান তাদের বিরোধিতা করে পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো অগণতান্ত্রিক শক্তিকে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন।
নূর খানের বক্তব্যের খানিকটা তুলে ধরছি :
ভুট্টো বর্তমান শাসকদের খুব ঘনিষ্ঠজন এবং সরকারের কোনো কোনো মহলের সঙ্গে তার বিশেষ ধরনের মাখামাখি রয়েছে। কাজেই সরকার কখন কোন সিদ্ধান্তে যাচ্ছে তার সবই ভুট্টোর জানা। এই প্রেক্ষাপটটি বিবেচনায় এনে মনে রাখতে হবে, ভুট্টোর আকস্মিক প্ররোচনামূলক ও কটুবাক্যপূর্ণ বক্তব্যের ভিন্ন কারণ রয়েছে। বিবেকবান যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ১৮ মাস ধৈর্য ধারণ করে যিনি বর্তমান সরকারকে (ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার) সয়ে গেলেন নির্বাচনের মাত্র দু’মাস আগে তার এমন ধৈর্যহারা হওয়ার কারণটা কী?
তিনি বলেন, সাবেক স্বৈরশাসকের এই শিষ্য দেশের জনগণের সামনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে শান্তিপূর্ণ সংগ্রামী প্রক্রিয়া তা দূষিত করে ছাড়বেন।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবনীয় শক্তির কারণে শেখ মুজিব পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী সম্বোধিত হতে শুরু করলেন। তিনি এই প্রত্যাশা নিয়েই এগোতে থাকলেন। ২০ ডিসেম্বর ১৯৭০ পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো তার লাহোর ঘোষণায় জানিয়ে দিলেন : ‘পিপিপির সহযোগিতা ছাড়া সংবিধান প্রণীত হতে পারে না; তার সহযোগিতা ছাড়া কেন্দ্রে কেউ শাসন করতে পারবে না।’ আরও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন ‘পিপিপি জাতীয় সংসাদে বিরোধী দলের আসনে বসতে প্রস্তুত নয়।’
পিপিপি জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ক্ষমতায় না থাকলে সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটবে না। জনগণের সমস্যার কোনো সমাধান হবে না এ অবস্থায় পিপিপি আর একটি নির্বাচনের জন্য আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে পারবে না।
তিনি শেখ মুজিবের প্রশংসাও করেন জাতীয় পরিষদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তিনি আওয়ামী লীগকে উঠিয়ে এনেছেন ভুট্টো তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু ভুট্টো মনে করেন, জাতীয় রাজনীতিতে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেই গণ্য করা হয় না। সিন্ধু ও পাঞ্জাবে পিপিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে কেন্দ্রের প্রকৃত ক্ষমতা ওই দুই প্রদেশেরই কাজেই পিপিপির অংশগ্রহণ ছাড়া পকিস্তান সরকার এখানে কোনো কাজ করতে পারবে না।
তাকে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসার পরামর্শ দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
পকিস্তান টাইমস্-এ পরদিনই ভুট্টোর কথার জবাব দিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ : পাঞ্চাব ও সিন্ধু তার কাছে ক্ষমতার দুর্গ হয়ে থাকতে পারে। জনগণ ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ বিজয়ী করেছে। স্পষ্ট জনসমর্থন এই দলের সঙ্গে কাজেই সংবিধান প্রদান ও কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ক্ষমতা আমাদেরই।
৩ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের ঘোষিত তারিখ। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো পেশোয়ারে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দেন তার দল অধিবেশনে যোগ দিতে যাবে না অপর একটি দলের তৈরি সংবিধান সত্যায়নের কাজ আমাদের নয় সেখানে যেতে পরি না এবং অপমানিত হয়ে ফিরতেও পারি না।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ যথারীতি দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক হলো। শেখ মুজিবুর রহমান যথারীতি পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচিত হলেন; সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলেন ডেপুটি লিডার, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি কামারুজ্জামান হলেন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি। দিনাজপুরের এমএলএ ইউসুফ আলী হলেন পার্টির চিফ হুইপ, টাঙ্গাইলের আবদুল মান্নান ও কুষ্টিয়ার আমিরুল ইসলাম হুইপ নির্বাচিত হলেন। পাকিস্তান অবজার্ভার জানাল, স্পিকারের দায়িত্ব পেতে পারেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। পার্টিপ্রধান বলেন, কায়েমি স্বার্থবাদী মহল শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও এটাই প্রত্যাশিত যে, নির্বাচনে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানই পকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
ভুট্টোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ‘জাতীয় পরিষদ কসাইখানায় পরিণত হবে।’ অপর একটি হুমকি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যেসব সদস্য অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা আসবেন তাদের পা ভেঙে দেওয়া হবে। অতঃপর ১ মার্চ ১৯৭০ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে সবই দলিলীকৃত। যেকোনো দলেরই হোক না কেন, দলদাস ঐতিহাসিক ও লেখকরা যা লিখে থকেন, এক সময় তা ভাগাড়ে নিক্ষেপ করে।
২৫ মার্চের ভয়াল রাতে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হয়েছেন না পাকিস্তানি পিশাচ সৈনিকদের সামনে একটি নিরস্ত্র জাতিকে কামানের ফডার হিসেবে রেখে তিনি আত্মসমর্পণ করেছেন সে বিতর্ক এক সময় শেষ হবে। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো যে নির্বাচনের ফলাফল নাকচ করতে সামরিক ও পশ্চিম পাকিস্তানি বেসামরিক এলিটদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন লারকানার কন্সপিরেসি প্রকাশ্যে চলে এসেছে এসব ঐতিহসিক সত্য। অনুসন্ধিৎসু পাঠক অনেক গ্রন্থের সঙ্গে খাদেম হোসেন রাজার ‘অ্যা স্টেঞ্জার ইন মাই অওন কান্ট্রি’ গ্রন্থটি পড়ে দেখতে পারেন। আর ২৫ মার্চ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে, মার্চের শুরু থেকেই ভারতের প্রস্তুতির বিবরণও পেতে পারেন।
জয়রাম রমেশের ইন্টারটুইন্ড লাইভস : পিএন হাকসার অ্যান্ড ইন্দিরা গান্ধী।
যার ভূমিকা বাংলাদেশকে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো। ভূমিকা রেখেছেন আরও অনেকেই, কিন্তু ভুট্টোর সমকক্ষ আর কেউ নন।
১৯৭৪-এ ভুট্টো ও শেখ মুজিবের আলিঙ্গনের স্মরণীয় ছবিটি কি মনে পড়ে? এটা কীসের স্বীকৃতি ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পরোক্ষ কারিগর যেমন হিটলার, ১৯৭১-এর স্বাধীনতার তেমনি এক কারিগর নন কি, জুলফিকার আলী ভুট্টো? একটু ভিন্ন চোখে দেখলে, ইতিহাস আসলে তাদের কোথায় অধিষ্ঠিত করবে?
লেখক : চাকরিজীবী ও লেখক