পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা

বাংলাদেশের নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে আলোচনার প্রারম্ভেই অকপটে স্বীকার্য যে, আমাদের জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও নদীমাতৃকতার বিকাশমান ধারা ও সমৃদ্ধি, দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তথা মুক্তিযুদ্ধে নদীভিত্তিক জাতীয় চেতনা সৃজনে উল্লেখযোগ্য ভিত্তি হিসেবে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। আমদের পরম আরাধ্য জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি স্বাধীন ভূখন্ডের বিজয় ত্বরান্বিতকরণে সেই অনবদ্য অবদানকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, যা বাংলাদেশকে ও এই জাতিকে করে তুলে গর্বিত, স্থাপন করে অনন্য উচ্চতায়। এই পর্যালোচনাটা সেই বলিষ্ঠ জাতি গঠনের ভিত্তি বাংলাদেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের সেই শাশ্বত ধারাকে উত্তরোত্তর টেকসইকরণ এবং সুসংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার পরম লক্ষ্যে ও গভীর প্রত্যাশায় নিবেদিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশের এই পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, জলাভূমি এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের ধারাকে আমরা অক্ষুন্ন ও অব্যাহত রাখতে পারিনি; এক কথায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি। বিপন্ন করেছি নানাভাবে দখল-অপদখল ও অপব্যবহার এবং দূষণের মত নির্দয় ও নির্মম বিবেকহীন আচরণের মাধ্যমে।

১. বাংলাদেশের নদ-নদীভিত্তিক সুপ্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও নদীমাত্রিকতার প্রভাব : (ক) পৃথিবীর প্রাচীন মানব সভ্যতাগুলোর [মিসরীয়/ব্যবিলনীয়/রোমান/চীন/সিন্ধু ইত্যাদি] ন্যায় বাংলা/বাংলাদেশের সভ্যতাও নদ-নদীভিত্তিক ও সুপ্রাচীন। নদ-নদী ও সমুদ্র ঘিরেই নদীমাতৃক আমাদের মাতৃভূমি। ইতিহাসের অমোঘ সত্যি হলো যে, পৃথিবীর বহু জাতি-গোষ্ঠী বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্মপ্রচার, আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে নদীপথেই পাড়ি জমায় এ জনপদে। চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, মোগল-পাঠান, শকহুন দল এবং হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মীয় লোকজনের আগমনে বিচিত্র মানুষের দুর্বার স্রোত ধারায় হয়েছে হারা। তাদেরই অপ্রতিরোধ্য মহাসম্মিলনে বাঙালি জাতি হয়েছে শংকর। আমাদের ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, ঐতিহ্য,

কৃষ্টি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি হয়েছে সমৃদ্ধ ও বিকশিত; (খ) ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রবাহ প্রাকৃতিকভাবেই উজানে ভারতবর্ষের নদ-নদীর অবিচ্ছেদ্য উৎসধারা। বাংলাদেশ ভারতবর্ষের সমরূপ ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরই ধারক এবং উজানের উৎসস্থলের পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের সমঅধিকার বা ন্যায্য হিস্যার প্রাকৃতিক দাবিদার। বিধাতার সৃষ্ট অখন্ড পৃথিবী আমরা নিজস্ব স্বার্থে কিংবা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে করে ফেলেছি খন্ডিত ও বিভাজিত। এসব মানবসৃষ্ট কারণেই আমাদের নদ-নদীর প্রাকৃতিক উৎসমুখ হয়েছে বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন; সৃষ্টি হয়েছে নাব্যতাহীন যা ক্রমান্বয়ে নদ-নদী অবৈধ দখলের ও দূষণের মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে; (গ) বাংলাদেশের নদীমাতৃকতা ও মাটির উর্বরতা : নদ-নদীকে ঘিরেই জীবন-জীবিকার বিকাশ ও অব্যাহত অগ্রযাত্রা; নদ-নদী ও সমুদ্রকে ঘিরেই সার্বিক জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সচল থেকেছে এবং নদীবাহিত ও পলিবিধৌত উর্বর মাটির কৃষি ব্যবস্থা আমাদের অর্থনীতির মূলভিত্তি, যা আমাদের জাতীয় মৌলিক দর্শন এবং ভূখন্ডের অধিকার, নদী ও পানি সম্পদ সংরক্ষণে জাতীয় ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের চালিকাশক্তি। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা ও দান-বাংলাদেশকে করেছে উর্বর-ভূমির ঐশ্বর্যমন্ডিত ও অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। তা না হলে জনবহুল চরম ভূমি সংকটের এ দেশে জীবনধারণ বা টিকে থাকা অসম্ভবই হয়ে উঠত; বিধাতা তাই বাংলাদেশকে করেছেন মহান ও বাঙালির সাবিক জীবনব্যবস্থা, উর্বর মাটির কৃষিব্যবস্থা, আমাদের অর্থনীতির মূলভিত্তি ও চালিকাশক্তি। বাঙালি-বাংলাদেশের সার্বিক অস্তিত্ব এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাবলিক-সম্পত্তি-পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের শক্ত ভিত্তি।

২. আমাদের নদ-নদীর প্রাকৃতিক উৎসমুখ মানবসৃষ্ট কারণেই হয়েছে আজ বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন এবং নাব্যতাহীন, যা ক্রমান্বয়ে নদ-নদী অবৈধ দখলের ও দূষণের মূল কারণ হিসেবে পরিগণিত। বাংলাদেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, জলাভূমি ও জলাধার (খাল-বিল, হাওর, বাঁওড়, জলাশয়, সমুদ্র উপকূল) সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং জীবন-জীবিকার ওপর বহুবিধ প্রভাব সুস্পষ্টরূপে লক্ষণীয়; (খ) বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বাস্তবচিত্র পর্যালোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতার ক্রমবৃদ্ধিসহ বহুবিধ প্রভাব সুস্পষ্টভাবে উন্মোচিত হচ্ছে এবং (গ) উন্নয়নের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ক্রমান্বয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে।

৩. নদীমাতৃক বাংলাদেশেও নদীকে আজ চরম হুমকির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আজ বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ‘মুখ থুবড়ে পড়ে আছে’ বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের মাটির উর্বরতা ও এর ফসল ফলানোর সক্ষমতা সারা বিশ্বে অনন্য। বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় ও জলাধার ক্রমবর্ধমান ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক শক্তির জন্যই এই দেশ ‘সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা’ এবং ‘বাংলার শস্যভান্ডার’ নামে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে, যা আজ হারাতে বসেছি আমরা। একে মলিন হতে/হারাতে দেওয়া যায় না কিছুতেই ।

৪. আমাদের নদ-নদীর প্রাকৃতিক উৎসমুখ মানবসৃষ্ট কারণেই হয়েছে উত্তরোত্তর বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন এবং নাব্যহীন, যা ক্রমান্বয়ে নদ-নদী অবৈধ দখলের ও দূষণের মূল কারণ হিসেবে পরিগণিত।

৫. এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, জলাভূমি, জলাধার (খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়, জলাশয়, সমুদ্র উপকূল) সংরক্ষণ এবং পানি ব্যাবস্থাপনা ও উন্নয়ন এবং জীব বৈচিত্র্য এবং মানুষ ও প্রাণীর জীবন-জীবিকা তথা অস্তিত্বের ওপর বহুবিধ প্রভাব ক্রমান্বয়ে প্রকটতর হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং শহরায়ণ ও শিল্পায়ন অপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যহীনভাবে নানাবিধ সমস্যা সংকুলকরণ, স্বজনপ্রীতি, সীমাহীন দুর্নীতি এই অবস্থা-দুর্দশার জন্য দায়ী বলে দেশের প্রায় সবাই ঐকমত্য প্রকাশ করছেন।

৬. পৃথিবী-প্রকৃতি ও আকাশম-লীর সৃষ্টির দর্শন এবং ধর্মীয় ও বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা-পর্যালোচনায় এটি প্রমাণিত সত্য যে, নদ-নদী, পানি ও পরিবেশ-প্রতিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তা মানুষ ও জীববৈচিত্র্য এবং প্রাণ ও প্রাণীর অস্তিত্ব প্রাকৃতিক অখন্ডতা সৃষ্টিকর্তা টিকিয়ে রেখে চলেছেন। এই পৃথিবী-প্রকৃতি ও আকাশম-লী এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মানুষের দায়িত্ব ও দায় রয়েছে অপরিসীম। দুঃখজনক হলেও সত্য আইন, প্রশাসন ও উন্নয়ন ধারাবাহিকতা পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী ও জলাভূমির সংখ্যা নির্ধারণে ও জটিলতা নিরসনে দেশে সুবিস্তৃত উপজেলা, জেলাভিত্তিক প্রকৃত তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশোধনী আনয়নের বিষয়ে প্রস্তাবনা পর্যালোচনা যা বহুল আলোচিত ও প্রত্যাশিত কাজ; এসব কার্যক্রম অর্জিত স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শুরু হলেও তা আজ অবধি সফলতার সঙ্গে নিষ্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর অনাগ্রহ ও অবহেলাকেই সুশীল সমাজ ও বিশিষ্টজনরা এবং সর্বোপরি সর্বজন দায়ী করছেন। 

৭. (১) বাংলাদেশের নদনদীভিত্তিক সুপ্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও নদীমাত্রিকতার অতীত অনুভূতিকে কাজে লাগাতে হবে; (২) বাংলাদেশের নদনদীর অবস্থা ও অবস্থান : দখল, দূষণ, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য (ক) নদ-নদীর দখলের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হলে এবং তরুণদের অদম্য সৃষ্টিশীল শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। (৩) বাংলাদেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, জলাশয় ও জলাধার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও অবৈধভাবে দখলকৃত/হস্তান্তরিত ভূমি উদ্ধারে আইনি প্রয়োগকে শতভাগ সফল করতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। (৪) বাংলাদেশের নদ-নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন ও বিধি-বিধানকেই প্রয়োগকে শতভাগ সফল করতে হবে (৫) নদ-নদীর পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় দূষণ প্রতিরোধ : উজানের প্রবাহে ক্রমে পঙ্কিলতা, কর্দমাক্ততা ও অসচ্ছতার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে ক্রমহ্রাসমান পানি প্রবাহের বিরূপ প্রভাবে নিপতিত হচ্ছে। একে যেকোনো মূল্যে রোধ/ প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করতে সর্বাত্মক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। (৬) শুষ্ক মৌসুমে পানির DO, BOD I COD  হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প ও ফ্যাক্টরি-পেপারমিল/চিনিকল/সারকারখানার বর্জ থেকে অব্যাহতভাবে নদীপথ, খালবিল, জলাধারগুলো দূষিত হচ্ছে। চঋঅঝ মোকাবিলা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

৮. (১) নদ-নদীর বিশেষ মর্যাদা ও পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি ঘোষণা এবং নদী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্যের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। (২) পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, খাল-বিল, সমুদ্র উপকূল, জলাশয় ও জলাধার রক্ষায় আইন-কানুনের প্রয়োগ এবং (৩) নদ-নদী, খাল-বিল, সমুদ্র উপকূল, জলাশয় ও জলাধারের ক্ষতিসাধন, দখল কিংবা নাব্যতাহীনতা বা অপমৃত্যু ঘটানোর অপরাধ ও শাস্তির বিধান বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

৯. (১) নদীর প্লাবন ভূমি বন্ধ করে স্থাপনা নির্মাণ (২) ভাঙন রোধ ও টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা (৩) নদ-নদীর ওপর ব্রিজ, কালভার্ট,  স্লুইসগেট, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ (৪) নদীর জায়গায় অবৈধভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ (৫)। নদী বা সমুদ্রবন্দর বা ফোরশোর লিজ/সাবলিজ প্রদান সংক্রান্ত জটিলতা। (৬) ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন ও ব্যবহারের ক্রমবর্ধিষ্ণু চাপ মোকাবিলা (৭) নদ-নদীর ক্ষতিসাধন : (ক) অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ও নদীর ভাঙন (খ) অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ এবং (৮) পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, হাওর-বাঁওড় ও জলাভূমির ক্ষতিসাধন প্রতিরোধে/বন্ধে সংশ্লিষ্ট আইনকানুন ও হাইকোর্ট/সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশ তথা বিশ্বনন্দিত রায়গুলো অনুসরণ ও বাস্তবায়ন স্থিমিত, এক কথায় হতাশাব্যঞ্জক। এক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের ধাক্কা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু সংগঠনের বিভিন্নমুখী কর্মতৎপরতা ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হলেও তা উপযুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে গতিশীল তৎপরতা গ্রহণে সফল হয়নি।

১০. এ অবস্থা আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। তা না হলে পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, হাওর, বাঁওড় ও জলাভূমি এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নকে টেকসই করা সম্ভব হয়ে উঠবে না।

১১. (ক) নদীর কাছে আমাদের ঋণ অশেষ, যা পরিশোধযোগ্য নয়। জাতি-বর্ণ-ধর্ম এবং দল-মত-শ্রেণি-পেশা ও ধনী-গরিব নির্বিশেষে নদ-নদীর অধিকার ‘জীবন্ত সত্তা’ ও পাবলিক প্রপার্টিকে যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে সচেতন, সহনশীল ও নদ-নদীর স্বার্থের অনুকূলে কার্যক্রম করতে উদ্বুদ্ধ করবে; নদী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে অগ্রপথিকের ভূমিকা পালনে সৎ সাহসও শক্তি জোগাবে।

 (খ) আশার কথা যে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত আদেশে সমস্ত জলাভূমি (Wetlands) পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি (Public Trust Property) হিসেবে ঘোষিত হওয়ায় আমাদের নদ-নদী, নদ-নদীর পাড়, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নালা, ঝিল, ঝিরি, সব উন্মুক্ত জলাভূমি রক্ষায় আশার প্রদীপ জ¦লে উঠেছে, যদিও তা এখনো কার্যকরী প্রয়োগে পিছিয়ে রয়েছে রাষ্ট্র এবং সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ/বিভিন্ন সংস্থা।

(গ)। পরিবেশ, জলবায়ু, জলাভূমি, তথা সমুদ্র, সমুদ্রসৈকত, নদ-নদী, নদ-নদীর পাড়, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নালা, ঝিল, ঝিরি এবং সকল উন্মুক্ত জলাভূমি, পাহাড়-পর্বত, বন, বন্যপ্রাণী এবং বাতাস যেহেতু পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি (Public Trust Property) তথা জনগণের সম্পত্তি (Refer to HCD writ petition no. 13989/2016 (judgment on 30th January and 3 Feb 2019; and Supreme Court Civil Petition for Leave to Appeal no. 3039 of 2019 Judgment on 17-2-2020).

(ঘ)। আরও আশার কথা যে, জনগণ ও সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের এই পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি (Public Trust Property) বিশেষ করে দেশের জলাভূমি রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও সংগঠিত হচ্ছেন।

(ঙ)। বাংলাদেশের অনেক নদী প্রাকৃতিক ও মনুষ্য-সৃষ্ট নানাবিধ কারণে বিনষ্ট হচ্ছে। সামাজিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে নৌ-পরিবহন ইতিবাচক অবদান রাখে। আগামী প্রজন্মকে বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে নদী সুরক্ষা খুবই জরুরি।

১২. আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী

(১) নদীমাতৃক বাংলাদেশের মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ পানি সম্পদ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও অন্যান্য জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল। দেশের অভ্যন্তরে ১২০৮+টি নদ-নদী (এ সংখ্যা আরও বাড়বে দেশের ৬৪টি জেলা থেকে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই সুসম্পন্ন হওয়ার পর, যা এখনো চলমান রয়েছে)। ৫৭টি আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত সংযোগ নদ-নদীর সংখ্যা মোট ৫৭, যার মধ্যে ৩টি বেসিনে মোট ৫৪টি ভারতের সঙ্গে এবং মাত্র ৩টি মিয়ানমারের সঙ্গে; তবে আরও ১৬টি নদী জে আর সি কর্তৃক এই তালিকার সঙ্গে যোগ করার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ যোগ্য যে, পৃথিবীতে রয়েছে ২৮৬টি আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী। জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে আমাদের নদ-নদী ও জলাশয় ক্রমে দূষণের কবলে নিপতিত হচ্ছে।

(২) এই আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদীগুলোর কারণে দেশের পানি ও নদ-নদীর দূষণ মাত্রা অত্যাধিক বেশি; ভাটির দেশ হওয়ায় বাংলাদেশকে উজান থেকে আসা দূষিত পানির হার ৯০%-এর চেয়েও বেশি; ক্রমান্বয়ে পলি মিশ্রিত আবর্জনার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। (৩) আইনি কাঠামো এবং বেসিনভিত্তিক কর্মকৌশল :bilateral and multilateral approach/protocol  এবং দূষিত পানি ব্যবস্থাপনা নতিমালা এবং কৌশল ও কার্যক্রম ও পরিকল্পনা এবং ৩জ (3R (Reduce, Reuse & Recycle) Technology প্রয়োগ আবশ্যক। ২০০৬ সাল থেকে জাপানি ৩জ (3R (Reduce, Reuse & Recycle) Technology বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক হিসাবে চালু করার কার্যক্রম জাপানি সহযোগিতায় শুরু হলেও তা বেশি দূর এগোতে পারেনি; মাঝ পথেই থেমে যায়।

(৪) যৌথভাবে সমীক্ষার প্রয়োজনীয়তা : আন্তঃসীমান্ত ৫৭টি নদীগুলোর সার্বিক তথ্যাদি, বর্তমান ভৌত অবস্থা, পানি ধারণ ও প্রবাহ, নিষ্কাশন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সমৃদ্ধ রিপোর্ট তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ/দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে সমীক্ষা করা প্রয়োজনীয়তা জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন সভা/পর্যালোচনা/মতবিনিময় ও মূল্যায়ন করে জেআরসি-কে জানিয়ে দিয়েছে। সরকারকে বারবার বলা হলেও গতিশীল ভূমিকা ছিল অনুপস্থিত। (৫) আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর বর্তমান সংখ্যা ৫৭টি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি। এই সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মতভেদ দূরীকরণার্থে জেআরসি, পাউবো, স্পারসো, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন যৌথভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে hydro-morphological  এবং Geo-physical সমীক্ষা/গবেষণা করে নদ-নদীর সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থান ও অবস্থা চূড়ান্ত করবে। উক্ত যৌথ সংস্থাগুলো/কর্তৃপক্ষ এ সব নদীপথের পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত ও থিমেটিক ম্যাপও তৈরি করবে, এক্ষেত্রে BD Delta Plan 2100-এর আওতায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করা ও তার পর্যাপ্ত অর্থায়নও বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন এক্ষেত্রে সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করবে। এসব পরামর্শ ২০১৮-২০২০ সালে প্রদান করা হলেও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়নি। (৬)। আন্তঃসীমান্ত নদ-নদী সুশাসন, সংরক্ষণ ও বণ্টন ব্যবস্থাপনা এবং পাহাড়ি ঢল, বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য যৌথ তথ্যভান্ডার/তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের কার্যকর উদ্যোগ যৌথ নদী কমিশনকে গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হলেও তার বাস্তবায়নে উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়নি; (৭) স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গবেষকগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : নদী রক্ষায় পানি ও পরিবেশগত দূষণের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। পানি সুরক্ষা (Water Security), কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নদী দূষণের প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণের লক্ষ্যে scientific Ges technical studz চালাতে হবে। নদী, জলাশয় এবং পরিবেশের সামগ্রিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে গবেষকগণ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবেষণা করে কর্মপদ্ধতি প্রণয়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের কারিগরি ও প্রযুক্তি বিভাগকে সক্ষম করতে কারিগরি সমাধান নির্ণয় করতে পারেন; (৮)। নাব্যহীনতা এবং নদী-সম্পদের অপব্যবহারের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এ জন্য বর্তমানে আমাদের নদ-নদী ও জলাশয় রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে; (৯) গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়। পানিসম্পদের টেকসই উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সরকার গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীগুলোর অববাহিকাভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে প্রকল্প প্রণয়ন ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ তার পুরোপুরি হিস্যা না পেলেও সহযোগিতা জে আর সির মাধ্যমে চলমান থাকে। যদিও তিস্তা চুক্তি ছলে-বলে অধরাই রয়ে যায়; প্রতিবেশী উজানের দেশের বারবার প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ বাংলাদেশের জনগণের চরম অবিশ্বাস ও অনাস্থার জন্ম দেয়; (১০) উজানের প্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা-অববাহিকায় প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির অধীনে গঙ্গার প্রবাহ হতে শুষ্ক মৌসুমে পানি বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে, তবে তা চুক্তি কিংবা বাস্তব চাহিদার চেয়ে অনেক কম। বাস্তবিক তথ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর ও উত্তর-মধ্য অঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল অববাহিকা শুষ্ক মৌসুমে ক্রমান্বয়ে নাব্যতার গভীর সংকটে নিপতিত হচ্ছে; তবে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ গঙ্গা অববাহিকায় প্রায় ১০% ও যমুনা অববাহিকায় ৩৩% বৃদ্ধি পায় (স্পারসো জরিপ প্রতিবেদন); (১১) প্রায় প্রতি বছরই উজান থেকে অপ্রতিরোধ্য ঢল এবং বন্যা/আকস্মিক বন্যায় দেশের, বিশেষ করে, উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভেসে যায় এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিমজ্জিত হয় জলাবদ্ধতায়; বিপন্ন করে দেয় দেশের অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনপথ ও সম্পদ। নদ-নদীর এ দুরবস্থা আমাদের সভ্যতা, অস্তিত্বের ও প্রজন্মের ধারাকে করে চলেছে জনপদকে বিপন্ন, মানুষ ও প্রাণি সম্পদকে বিপদগ্রস্ত এবং পানি, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে করছে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটাপন্ন। জে আর সির সমন্বয়হীনতা, আগ্রিম সতর্কবার্তা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা, অবহেলা ও অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে ভাটির দেশ বাংলাদেশের। কার্যত বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে এই সব দুর্যোগ, দুর্ভোগ এবং ধ্বংসাত্মক সর্বগ্রাসী প্লাবন ও অপ্রতিরোধ্য ঢলের মরণ ছোবলে পড়ছে। অথচ প্রকৃতির বিরূপ অবস্থার পাশাপাশি উজানের প্রতিবেশীর নির্দয়তা ও মর্মস্পর্শিতা ভাটির জনগণকে করে তুলে দিশেহারা, গৃহহারা, স্বজনহারা, এক কথায় সর্বহারা। এ অবস্থার পরিবর্তনে ভাটির বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী উজানের দেশের আন্তরিক যৌথ কার্যকর টেকসই কর্মপরিকল্পনার বিকল্প নেই।

১৩. আন্তঃনদীপথ ও অববাহিকাঞ্চল ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম :

(ক) আমাদের মৌলিক জাতীয় দর্শন ও দেশের ভূখন্ডের অখ- নদ-নদী সীমানা ও সীমান্তের পানির প্রাকৃতিক ও উজানের উৎসস্থলের পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের অবিচ্ছিন্ন ধারা সমঅধিকার বা ন্যায্য হিস্যার অংশীদারত্ব, যা বাংলাদেশের মৌলিক ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও প্রোটোকল অনুযায়ী প্রাপ্য। (খ) মৌলিক ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও প্রোটোকল অনুযায়ী প্রাপ্য বাংলাদেশর এ ন্যায্য হিস্যা ও অংশীদারত্ব অর্জনে ও আদায়ে আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে সচেষ্ট হতে সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, পারস্পরিক দেন-দরবার, দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বৈঠক, সমঝোতা সমান তালে, সম্মান, সক্ষমতা ও দক্ষতার সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে চালিয়ে যেতে সমর্থ হতে হবে। সবার ওপরে দেশ ও দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে লড়তে হবে।

১৪. নদীর জমির মালিক জনসাধারণ : The State Acquisition and Tenancy Act (SATA) ১৯৫০ এর ৮৬ ও ৮৭ ধারার বিধানাবলি এবং মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন-৩৫০৩/২০০৯ (৩০৩৯/২০১৯ নং রায়ে প্রদত্ত নির্দেশনা) পর্যালোচনায় সুস্পষ্ট যে, নদ-নদীর জমির মালিক জনসাধারণ; নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য নয় ও বন্দোবস্তযোগ্যও নয়।

 প্রণিধানযোগ্য, নদ-নদীর জমি, তীরভূমি ও ফোরশোর রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার আইন ও বিধি-বিধান, খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধি-বিধান/নীতিমালার থেকে ভিন্ন, যা অবশ্যই প্রতিপালনীয়।

 ৮৬[২] : উক্ত সিকস্তিকৃত জমি ৩০ বছরের মধ্যে পূর্বস্থানে পয়স্তি/পুনঃউদ্ভব হলে, উক্ত জোতের মূল মালিক কিংবা তার উত্তরাধিকারীর স্বত্ব ও স্বার্থ বজায় থাকবে।

কার্যত : পাবলিক প্রপার্টি (Public Property) : নদ-নদী, জলাশয়-জলাভূমি, খাল-বিল, বনাঞ্চল, মাটি-পানি-আলো-বাতাসসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য (Rivers and Wetlands, Forests, Environment (Soil-Water-Light & Air), Ecology & Biodiversity) এবং ভূসম্পত্তিসহ জীবন ও জীবিকা (Lands and Populations, Lives & Livelihoods) বিধ্বংসী বহুমুখী সমস্যা ও নানাবিধ প্রতিকূলতার জন্ম দিয়েই চলেছে। এ বিষয়গুলোর রূপান্তরিত/পরিবর্তিত অবস্থা, দুরবস্থা, দুর্দশা ও চরম অব্যবস্থাপনা বাংলাদেশসহ বিশ্বকে/বিশ্ব বিবেককে ভাবিয়ে তুলছে।

 বাংলাদেশে নিম্নেবর্ণিত বিষয়গুলো ঘটে চলেছে বর্ধিষ্ণু হারে; ফলে ক্রমানুক্রমে সার্বিক অবস্থার অবনতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে/প্রকাশিত হচ্ছে :

 (ক) জনসংখ্যা ঊর্ধ্বগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তা সম্পদে রূপান্তরের পরিবর্তে চরম অব্যবস্থাপনায় নিপতিত হচ্ছে। ভূসম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে চাপ পড়ছে।

 (খ) পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদ দ্রুত আয়ত্তে নেওয়ার/রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য নানামুখী জটিল সমস্যার করাল গ্রাসে নিপতিত হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে; এসবই যেন দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে।

 (গ) ভূমি-মানুষ অনুপাত (Land-Man ratio) ক্রমশ নিম্নগামী বা তলানিতে যাচ্ছে; ভূমিহীন হতদরিদ্রের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে; যদিও ভূমিহীন হতদরিদ্রজনদের মধ্যে সরকারি খাসজমি বণ্টন করে চলেছে সরকার ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন আশ্রয়ণ/গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি সরকারি খাসজমি হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে তা বেহাত হয়ে চলেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে/কারণে ভূমিহীন হতদরিদ্রজন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন আশ্রয়ণ/গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত/রূপান্তরিত সরকারি খাসজমি যা মূলত পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি, তা সময়ের ব্যাপ্তি পরিসরে ধনী-ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছে বেচা-বিক্রির কিংবা নানা ছলচাতুরী/অন্যায় প্রভাব বিস্তারের কারণে হস্তান্তরিত হয়ে যায়/যাচ্ছে। এভাবে কার্যত নদনদী, জলাশয়-জলাভূমি, খাল-বিল, বনাঞ্চলের পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি হারিয়ে যাচ্ছে/হ্রাস পাচ্ছে/ফুরিয়ে যাচ্ছে।

 (ঘ) আরও প্রণিধানযোগ্য যে, সিকস্তি-পয়স্তিলব্ধ উক্ত নদ-নদী, জলাশয়-জলাভূমি, খাল-বিল, বনাঞ্চলের পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি ভুলক্রমে কিংবা যোগসাজশের মাধ্যমে কিংবা অন্যায়ভাবে, অবৈধ পন্থায় সংশ্লিষ্ট সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত কিংবা স্থানীয় সরকার বা বেসরকারি কর্তৃপক্ষের কর্তাব্যক্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীর নৈতিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাববলয়ের বা দালাল ও দুষ্ট চক্রের বহুরূপী প্রলোভন এবং নিগ্রহ/অত্যাচারের ফাঁদে বেহাত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ মিলছে।

 (ঙ) এই অব্যবস্থা ও অন্যায় কার্যকারণ স্পষ্টতই বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক-এর আইনি বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদর আইনি বিধানের পরিপন্থি কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক এর আইনি বিধান : ‘নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য।-(১) সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।’ ‘It is the duty of every citizen to observe the constitution and the laws, to maintain discipline to public duties and to protect public property.’

 (২) সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। Public propertyকে জাতীয় সম্পত্তি হিসাবে বাংলা করা হয়েছে। যা সিপি নং-৩০৩৯/২০১৯ ১৭-২-২০২০ তারিখের রায়ের নজীর, পৃষ্ঠা-৩৫ ও ৩৯);

(চ) নদ-নদীর জমি সিএস-পরবর্তী উক্তরূপ কোনো অননুমোদিত/অবৈধ জরিপে ব্যক্তি/গোষ্ঠী/সংস্থার নামে ও মালিকানায় হস্তান্তরিত হবার কিংবা হ্রাস পাবার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। নদ-নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য নয় কিংবা বন্দোবস্তযোগ্যও নয়, কিন্তু পরিবর্ধনযোগ্য। SATA ১৯৫০-এর ১৪৪ক ও ১৪৯(৪) ধারায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক বাতিলযোগ্য (ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২৩-৯-২০১৫ সার্কুলার এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশ)। [Public Right of Easement] : জনঅধিকারভুক্ত ও ব্যবহার্য সম্পত্তি হিসেবে হালনাগাদ করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কালেক্টর ক্ষমতাবান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত।

১৩. নদ-নদী, পানি ও পরিবেশ দূষণ ও প্রতিরোধ : (ক) নদ-নদীর জমি জনঅধিকারভুক্ত ও সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সম্পত্তি হিসাবে আইনে এবং দেশের উচ্চ অদালতের রায়ের অনুসরণে অবৈধ দখল/দূষণ : আইনসমূহের নির্দিষ্ট ধারায় অপরাধ : শাস্তি বা জরিমানার ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা যায়।

(খ) পরিবেশ সংরক্ষণ একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারকে এ দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত কার্যক্রম- সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা পালনে সমর্থ/বাধ্য করতে হবে; নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ ইউনূস (বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা)-এর ৩-শূন্য থিয়োরির (3 Zero Theory) একটি হলো শূন্য কার্বন নিঃসরণ (Zero Emission Theory), যা বিশ্বব্যাপী অনুশীলন হলেও তার সরকারি আমলে তার নিজ দেশেই সঠিক পরিচর্যা / অনুশীলন এবং কার্যকর বাস্তবায়নে যথা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি; এ যেন এক চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার করুণ সুর দেশের তথা ঢাকার আকাশে-বাতাসে অনুরণিত হচ্ছে। (গ) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর ও সংস্থাসমূহ এবং মাঠে কর্মরত অফিসগুলো এক্ষেত্রে কোনো ফলপ্রসূ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারেনি আইনকানুনের প্রয়োগ কিংবা প্রকল্প উন্নয়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় /স্বাক্ষর ফুটে উঠেছে। সচেতন জনগণের বিরূপ মন্তব্য ও সমালোচনা রয়েছে। আইনকানুনের প্রয়োগ কার্যত নেই; বিগত বছরগুলোর মতোই অবহেলা-অযত্নে শূন্য কার্বন নিঃসরণ (Zero Emission Theory) কার্যক্রম চরমভাবে জনগণকে হতাশ করেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক উক্ত মন্ত্রণালয়কে ও অধিদপ্তরকে প্রদত্ত সুশীল সমাজ ও বিশেষ কমিটি কর্তৃক বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশসমূহ অকার্যকরই রয়ে গেছে। এ যেন সেই ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’ কিংবা ‘যত গর্জে, তত বর্ষে না’ বচনের মতোই করুণ দশা-দুর্দশাগ্রস্ত।

 ১৪. জনসচেতনতা সৃষ্টি-যোগাযোগ ও সমন্বয়পূর্বক কার্যকর ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ :

(ক) ইতোমধ্যে নদী ও পরিবেশদূষণ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মোকাবিলায় পরিবেশ কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরিবেশ সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মোবাইল কোর্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিচার কার্যক্রম সফল করার জন্য বিচারপতি/আইনজীবীদের পরিবেশ ও নদীদূষণ, দখল এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য এবং নদী ও পরিবেশ রক্ষায় আইনি প্রয়োগ সম্পর্কিত তথ্য সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। (খ) জনবল, logistic এবং অর্থ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে পরিবেশ ও মোবাইল কোর্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে; (গ) জনসচেতনতার প্রচার ও প্রসারে তরুণ সমাজ ও ছাত্রছাত্রীসহ সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত ও উদ্বুদ্ধ করা সরকারের জরুরি কাজ; এ ক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা কিংবা কালক্ষেপণ পুরো জাতির জন্য বিপর্যয় ঘটাবে, যা জাতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না; এক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, সে যে পর্যায়েরই যত শক্তিশালীই হোক না কেন; (ঘ) নদী, জলাভূমি এবং তদসংলগ্ন পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি সুরক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে চাপ প্রদানকারী সংস্থা (Pressure Group) হিসেবে শক্তিশালী প্রচারণা (Strong Advocacy) চালাতে পারে। জনসচেতনতার প্রচার ও প্রসারে তরুণ ও ছাত্রছাত্রীরা কাজ করতে পারে; (ঙ) বেসরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা : নদীরক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তরা জনগণের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে পারে। নদীরক্ষায় আমজনতা তথা শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, ভূমি মালিকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে; (চ) নীতি, কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন : পরিবেশ নীতি- 

বাংলাদেশের নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে আলোচনার প্রারম্ভেই অকপটে স্বীকার্য যে, আমাদের জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও নদীমাতৃকতার বিকাশমান ধারা ও সমৃদ্ধি, দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তথা মুক্তিযুদ্ধে নদীভিত্তিক জাতীয় চেতনা সৃজনে উল্লেখযোগ্য ভিত্তি হিসেবে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। আমদের পরম আরাধ্য জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি স্বাধীন ভূখ-ের বিজয় ত্বরান্বিতকরণে সেই অনবদ্য অবদানকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, যা বাংলাদেশকে ও এই জাতিকে করে তুলে গর্বিত, স্থাপন করে অনন্য উচ্চতায়। এই পর্যালোচনাটা সেই বলিষ্ঠ জাতি গঠনের ভিত্তি বাংলাদেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের সেই শাশ্বত ধারাকে উত্তরোত্তর টেকসইকরণ এবং সুসংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার পরম লক্ষ্যে ও গভীর প্রত্যাশায় নিবেদিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশের এই পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, জলাভূমি এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের ধারাকে আমরা অক্ষুণœ ও অব্যাহত রাখতে পারিনি; এক কথায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি। বিপন্ন করেছি নানাভাবে দখল-অপদখল ও অপব্যবহার এবং দূষণের মত নির্দয় ও নির্মম বিবেকহীন আচরণের মাধ্যমে।

১. বাংলাদেশের নদ-নদীভিত্তিক সুপ্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও নদীমাত্রিকতার প্রভাব : (ক) পৃথিবীর প্রাচীন মানব সভ্যতাগুলোর [মিসরীয়/ব্যবিলনীয়/রোমান/চীন/সিন্ধু ইত্যাদি] ন্যায় বাংলা/বাংলাদেশের সভ্যতাও নদ-নদীভিত্তিক ও সুপ্রাচীন। নদ-নদী ও সমুদ্র ঘিরেই নদীমাতৃক আমাদের মাতৃভূমি। ইতিহাসের অমোঘ সত্যি হলো যে, পৃথিবীর বহু জাতি-গোষ্ঠী বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্মপ্রচার, আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে নদীপথেই পাড়ি জমায় এ জনপদে। চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, মোগল-পাঠান, শকহুন দল এবং হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মীয় লোকজনের আগমনে বিচিত্র মানুষের দুর্বার স্রোত ধারায় হয়েছে হারা। তাদেরই অপ্রতিরোধ্য মহাসম্মিলনে বাঙালি জাতি হয়েছে শংকর। আমাদের ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, ঐতিহ্য,

কৃষ্টি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি হয়েছে সমৃদ্ধ ও বিকশিত; (খ) ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রবাহ প্রাকৃতিকভাবেই উজানে ভারতবর্ষের নদ-নদীর অবিচ্ছেদ্য উৎসধারা। বাংলাদেশ ভারতবর্ষের সমরূপ ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরই ধারক এবং উজানের উৎসস্থলের পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের সমঅধিকার বা ন্যায্য হিস্যার প্রাকৃতিক দাবিদার। বিধাতার সৃষ্ট অখন্ড পৃথিবী আমরা নিজস্ব স্বার্থে কিংবা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে করে ফেলেছি খন্ডিত ও বিভাজিত। এসব মানবসৃষ্ট কারণেই আমাদের নদ-নদীর প্রাকৃতিক উৎসমুখ হয়েছে বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন; সৃষ্টি হয়েছে নাব্যতাহীন যা ক্রমান্বয়ে নদ-নদী অবৈধ দখলের ও দূষণের মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে; (গ) বাংলাদেশের নদীমাতৃকতা ও মাটির উর্বরতা : নদ-নদীকে ঘিরেই জীবন-জীবিকার বিকাশ ও অব্যাহত অগ্রযাত্রা; নদ-নদী ও সমুদ্রকে ঘিরেই সার্বিক জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সচল থেকেছে এবং নদীবাহিত ও পলিবিধৌত উর্বর মাটির কৃষি ব্যবস্থা আমাদের অর্থনীতির মূলভিত্তি, যা আমাদের জাতীয় মৌলিক দর্শন এবং ভূখ-ের অধিকার, নদী ও পানি সম্পদ সংরক্ষণে জাতীয় ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের চালিকাশক্তি। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা ও দান-বাংলাদেশকে করেছে উর্বর-ভূমির ঐশ্বর্যমন্ডিত ও অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। তা না হলে জনবহুল চরম ভূমি সংকটের এ দেশে জীবনধারণ বা টিকে থাকা অসম্ভবই হয়ে উঠত; বিধাতা তাই বাংলাদেশকে করেছেন মহান ও বাঙালির সাবিক জীবনব্যবস্থা, উর্বর মাটির কৃষিব্যবস্থা, আমাদের অর্থনীতির মূলভিত্তি ও চালিকাশক্তি। বাঙালি-বাংলাদেশের সার্বিক অস্তিত্ব এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাবলিক-সম্পত্তি-পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের শক্ত ভিত্তি।

২. আমাদের নদ-নদীর প্রাকৃতিক উৎসমুখ মানবসৃষ্ট কারণেই হয়েছে আজ বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন এবং নাব্যতাহীন, যা ক্রমান্বয়ে নদ-নদী অবৈধ দখলের ও দূষণের মূল কারণ হিসেবে পরিগণিত। বাংলাদেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, জলাভূমি ও জলাধার (খাল-বিল, হাওর, বাঁওড়, জলাশয়, সমুদ্র উপকূল) সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং জীবন-জীবিকার ওপর বহুবিধ প্রভাব সুস্পষ্টরূপে লক্ষণীয়; (খ) বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বাস্তবচিত্র পর্যালোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতার ক্রমবৃদ্ধিসহ বহুবিধ প্রভাব সুস্পষ্টভাবে উন্মোচিত হচ্ছে এবং (গ) উন্নয়নের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ক্রমান্বয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে।

৩. নদীমাতৃক বাংলাদেশেও নদীকে আজ চরম হুমকির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আজ বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ‘মুখ থুবড়ে পড়ে আছে’ বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের মাটির উর্বরতা ও এর ফসল ফলানোর সক্ষমতা সারা বিশ্বে অনন্য। বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় ও জলাধার ক্রমবর্ধমান ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক শক্তির জন্যই এই দেশ ‘সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা’ এবং ‘বাংলার শস্যভান্ডার’ নামে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে, যা আজ হারাতে বসেছি আমরা। একে মলিন হতে/হারাতে দেওয়া যায় না কিছুতেই ।

৪. আমাদের নদ-নদীর প্রাকৃতিক উৎসমুখ মানবসৃষ্ট কারণেই হয়েছে উত্তরোত্তর বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন এবং নাব্যহীন, যা ক্রমান্বয়ে নদ-নদী অবৈধ দখলের ও দূষণের মূল কারণ হিসেবে পরিগণিত।

৫. এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, জলাভূমি, জলাধার (খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়, জলাশয়, সমুদ্র উপকূল) সংরক্ষণ এবং পানি ব্যাবস্থাপনা ও উন্নয়ন এবং জীব বৈচিত্র্য এবং মানুষ ও প্রাণীর জীবন-জীবিকা তথা অস্তিত্বের ওপর বহুবিধ প্রভাব ক্রমান্বয়ে প্রকটতর হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং শহরায়ণ ও শিল্পায়ন অপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যহীনভাবে নানাবিধ সমস্যা সংকুলকরণ, স্বজনপ্রীতি, সীমাহীন দুর্নীতি এই অবস্থা-দুর্দশার জন্য দায়ী বলে দেশের প্রায় সবাই ঐকমত্য প্রকাশ করছেন।

৬. পৃথিবী-প্রকৃতি ও আকাশম-লীর সৃষ্টির দর্শন এবং ধর্মীয় ও বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা-পর্যালোচনায় এটি প্রমাণিত সত্য যে, নদ-নদী, পানি ও পরিবেশ-প্রতিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তা মানুষ ও জীববৈচিত্র্য এবং প্রাণ ও প্রাণীর অস্তিত্ব প্রাকৃতিক অখন্ডতা সৃষ্টিকর্তা টিকিয়ে রেখে চলেছেন। এই পৃথিবী-প্রকৃতি ও আকাশম-লী এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মানুষের দায়িত্ব ও দায় রয়েছে অপরিসীম। দুঃখজনক হলেও সত্য আইন, প্রশাসন ও উন্নয়ন ধারাবাহিকতা পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী ও জলাভূমির সংখ্যা নির্ধারণে ও জটিলতা নিরসনে দেশে সুবিস্তৃত উপজেলা, জেলাভিত্তিক প্রকৃত তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশোধনী আনয়নের বিষয়ে প্রস্তাবনা পর্যালোচনা যা বহুল আলোচিত ও প্রত্যাশিত কাজ; এসব কার্যক্রম অর্জিত স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শুরু হলেও তা আজ অবধি সফলতার সঙ্গে নিষ্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর অনাগ্রহ ও অবহেলাকেই সুশীল সমাজ ও বিশিষ্টজনরা এবং সর্বোপরি সর্বজন দায়ী করছেন। 

৭. (১) বাংলাদেশের নদনদীভিত্তিক সুপ্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও নদীমাত্রিকতার অতীত অনুভূতিকে কাজে লাগাতে হবে; (২) বাংলাদেশের নদনদীর অবস্থা ও অবস্থান : দখল, দূষণ, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য (ক) নদ-নদীর দখলের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হলে এবং তরুণদের অদম্য সৃষ্টিশীল শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। (৩) বাংলাদেশের পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, জলাশয় ও জলাধার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও অবৈধভাবে দখলকৃত/হস্তান্তরিত ভূমি উদ্ধারে আইনি প্রয়োগকে শতভাগ সফল করতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। (৪) বাংলাদেশের নদ-নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন ও বিধি-বিধানকেই প্রয়োগকে শতভাগ সফল করতে হবে (৫) নদ-নদীর পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় দূষণ প্রতিরোধ : উজানের প্রবাহে ক্রমে পঙ্কিলতা, কর্দমাক্ততা ও অসচ্ছতার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে ক্রমহ্রাসমান পানি প্রবাহের বিরূপ প্রভাবে নিপতিত হচ্ছে। একে যেকোনো মূল্যে রোধ/ প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করতে সর্বাত্মক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। (৬) শুষ্ক মৌসুমে পানির DO, BOD I COD  হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প ও ফ্যাক্টরি-পেপারমিল/চিনিকল/সারকারখানার বর্জ থেকে অব্যাহতভাবে নদীপথ, খালবিল, জলাধারগুলো দূষিত হচ্ছে। চঋঅঝ মোকাবিলা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

৮. (১) নদ-নদীর বিশেষ মর্যাদা ও পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি ঘোষণা এবং নদী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্যের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। (২) পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, খাল-বিল, সমুদ্র উপকূল, জলাশয় ও জলাধার রক্ষায় আইন-কানুনের প্রয়োগ এবং (৩) নদ-নদী, খাল-বিল, সমুদ্র উপকূল, জলাশয় ও জলাধারের ক্ষতিসাধন, দখল কিংবা নাব্যতাহীনতা বা অপমৃত্যু ঘটানোর অপরাধ ও শাস্তির বিধান বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

৯. (১) নদীর প্লাবন ভূমি বন্ধ করে স্থাপনা নির্মাণ (২) ভাঙন রোধ ও টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা (৩) নদ-নদীর ওপর ব্রিজ, কালভার্ট,  স্লুইসগেট, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ (৪) নদীর জায়গায় অবৈধভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ (৫)। নদী বা সমুদ্রবন্দর বা ফোরশোর লিজ/সাবলিজ প্রদান সংক্রান্ত জটিলতা। (৬) ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন ও ব্যবহারের ক্রমবর্ধিষ্ণু চাপ মোকাবিলা (৭) নদ-নদীর ক্ষতিসাধন : (ক) অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ও নদীর ভাঙন (খ) অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ এবং (৮) পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, হাওর-বাঁওড় ও জলাভূমির ক্ষতিসাধন প্রতিরোধে/বন্ধে সংশ্লিষ্ট আইনকানুন ও হাইকোর্ট/সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশ তথা বিশ্বনন্দিত রায়গুলো অনুসরণ ও বাস্তবায়ন স্থিমিত, এক কথায় হতাশাব্যঞ্জক। এক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের ধাক্কা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু সংগঠনের বিভিন্নমুখী কর্মতৎপরতা ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হলেও তা উপযুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে গতিশীল তৎপরতা গ্রহণে সফল হয়নি।

১০. এ অবস্থা আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। তা না হলে পাবলিক সম্পত্তি : নদ-নদী, হাওর, বাঁওড় ও জলাভূমি এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নকে টেকসই করা সম্ভব হয়ে উঠবে না।

১১. (ক) নদীর কাছে আমাদের ঋণ অশেষ, যা পরিশোধযোগ্য নয়। জাতি-বর্ণ-ধর্ম এবং দল-মত-শ্রেণি-পেশা ও ধনী-গরিব নির্বিশেষে নদ-নদীর অধিকার ‘জীবন্ত সত্তা’ ও পাবলিক প্রপার্টিকে যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে সচেতন, সহনশীল ও নদ-নদীর স্বার্থের অনুকূলে কার্যক্রম করতে উদ্বুদ্ধ করবে; নদী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে অগ্রপথিকের ভূমিকা পালনে সৎ সাহসও শক্তি জোগাবে।

 (খ) আশার কথা যে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত আদেশে সমস্ত জলাভূমি (Wetlands) পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি (Public Trust Property) হিসেবে ঘোষিত হওয়ায় আমাদের নদ-নদী, নদ-নদীর পাড়, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নালা, ঝিল, ঝিরি, সব উন্মুক্ত জলাভূমি রক্ষায় আশার প্রদীপ জ¦লে উঠেছে, যদিও তা এখনো কার্যকরী প্রয়োগে পিছিয়ে রয়েছে রাষ্ট্র এবং সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ/বিভিন্ন সংস্থা।

(গ)। পরিবেশ, জলবায়ু, জলাভূমি, তথা সমুদ্র, সমুদ্রসৈকত, নদ-নদী, নদ-নদীর পাড়, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নালা, ঝিল, ঝিরি এবং সকল উন্মুক্ত জলাভূমি, পাহাড়-পর্বত, বন, বন্যপ্রাণী এবং বাতাস যেহেতু পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি (Public Trust Property) তথা জনগণের সম্পত্তি (Refer to HCD writ petition no. 13989/2016 (judgment on 30th January and 3 Feb 2019; and Supreme Court Civil Petition for Leave to Appeal no. 3039 of 2019 Judgment on 17-2-2020).

(ঘ)। আরও আশার কথা যে, জনগণ ও সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের এই পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি (Public Trust Property) বিশেষ করে দেশের জলাভূমি রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও সংগঠিত হচ্ছেন।

(ঙ)। বাংলাদেশের অনেক নদী প্রাকৃতিক ও মনুষ্য-সৃষ্ট নানাবিধ কারণে বিনষ্ট হচ্ছে। সামাজিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে নৌ-পরিবহন ইতিবাচক অবদান রাখে। আগামী প্রজন্মকে বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে নদী সুরক্ষা খুবই জরুরি।

১২. আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী

(১) নদীমাতৃক বাংলাদেশের মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ পানি সম্পদ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও অন্যান্য জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল। দেশের অভ্যন্তরে ১২০৮+টি নদ-নদী (এ সংখ্যা আরও বাড়বে দেশের ৬৪টি জেলা থেকে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই সুসম্পন্ন হওয়ার পর, যা এখনো চলমান রয়েছে)। ৫৭টি আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত সংযোগ নদ-নদীর সংখ্যা মোট ৫৭, যার মধ্যে ৩টি বেসিনে মোট ৫৪টি ভারতের সঙ্গে এবং মাত্র ৩টি মিয়ানমারের সঙ্গে; তবে আরও ১৬টি নদী জে আর সি কর্তৃক এই তালিকার সঙ্গে যোগ করার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ যোগ্য যে, পৃথিবীতে রয়েছে ২৮৬টি আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদী। জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে আমাদের নদ-নদী ও জলাশয় ক্রমে দূষণের কবলে নিপতিত হচ্ছে।

(২) এই আন্তঃদেশীয় সংযোগ নদীগুলোর কারণে দেশের পানি ও নদ-নদীর দূষণ মাত্রা অত্যাধিক বেশি; ভাটির দেশ হওয়ায় বাংলাদেশকে উজান থেকে আসা দূষিত পানির হার ৯০%-এর চেয়েও বেশি; ক্রমান্বয়ে পলি মিশ্রিত আবর্জনার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। (৩) আইনি কাঠামো এবং বেসিনভিত্তিক কর্মকৌশল :bilateral and multilateral approach/protocol  এবং দূষিত পানি ব্যবস্থাপনা নতিমালা এবং কৌশল ও কার্যক্রম ও পরিকল্পনা এবং ৩জ (3R (Reduce, Reuse & Recycle) Technology প্রয়োগ আবশ্যক। ২০০৬ সাল থেকে জাপানি ৩জ (3R (Reduce, Reuse & Recycle) Technology বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক হিসাবে চালু করার কার্যক্রম জাপানি সহযোগিতায় শুরু হলেও তা বেশি দূর এগোতে পারেনি; মাঝ পথেই থেমে যায়।

(৪) যৌথভাবে সমীক্ষার প্রয়োজনীয়তা : আন্তঃসীমান্ত ৫৭টি নদীগুলোর সার্বিক তথ্যাদি, বর্তমান ভৌত অবস্থা, পানি ধারণ ও প্রবাহ, নিষ্কাশন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সমৃদ্ধ রিপোর্ট তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ/দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে সমীক্ষা করা প্রয়োজনীয়তা জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন সভা/পর্যালোচনা/মতবিনিময় ও মূল্যায়ন করে জেআরসি-কে জানিয়ে দিয়েছে। সরকারকে বারবার বলা হলেও গতিশীল ভূমিকা ছিল অনুপস্থিত। (৫) আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর বর্তমান সংখ্যা ৫৭টি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি। এই সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মতভেদ দূরীকরণার্থে জেআরসি, পাউবো, স্পারসো, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন যৌথভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে hydro-morphological  এবং Geo-physical সমীক্ষা/গবেষণা করে নদ-নদীর সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থান ও অবস্থা চূড়ান্ত করবে। উক্ত যৌথ সংস্থাগুলো/কর্তৃপক্ষ এ সব নদীপথের পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত ও থিমেটিক ম্যাপও তৈরি করবে, এক্ষেত্রে BD Delta Plan 2100-এর আওতায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করা ও তার পর্যাপ্ত অর্থায়নও বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন এক্ষেত্রে সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করবে। এসব পরামর্শ ২০১৮-২০২০ সালে প্রদান করা হলেও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়নি। (৬)। আন্তঃসীমান্ত নদ-নদী সুশাসন, সংরক্ষণ ও বণ্টন ব্যবস্থাপনা এবং পাহাড়ি ঢল, বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য যৌথ তথ্যভান্ডার/তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের কার্যকর উদ্যোগ যৌথ নদী কমিশনকে গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হলেও তার বাস্তবায়নে উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়নি; (৭) স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গবেষকগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : নদী রক্ষায় পানি ও পরিবেশগত দূষণের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। পানি সুরক্ষা (Water Security), কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নদী দূষণের প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণের লক্ষ্যে scientific Ges technical studz চালাতে হবে। নদী, জলাশয় এবং পরিবেশের সামগ্রিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে গবেষকগণ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবেষণা করে কর্মপদ্ধতি প্রণয়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের কারিগরি ও প্রযুক্তি বিভাগকে সক্ষম করতে কারিগরি সমাধান নির্ণয় করতে পারেন; (৮)। নাব্যহীনতা এবং নদী-সম্পদের অপব্যবহারের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এ জন্য বর্তমানে আমাদের নদ-নদী ও জলাশয় রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে; (৯) গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়। পানিসম্পদের টেকসই উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সরকার গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীগুলোর অববাহিকাভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে প্রকল্প প্রণয়ন ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ তার পুরোপুরি হিস্যা না পেলেও সহযোগিতা জে আর সির মাধ্যমে চলমান থাকে। যদিও তিস্তা চুক্তি ছলে-বলে অধরাই রয়ে যায়; প্রতিবেশী উজানের দেশের বারবার প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ বাংলাদেশের জনগণের চরম অবিশ্বাস ও অনাস্থার জন্ম দেয়; (১০) উজানের প্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা-অববাহিকায় প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির অধীনে গঙ্গার প্রবাহ হতে শুষ্ক মৌসুমে পানি বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে, তবে তা চুক্তি কিংবা বাস্তব চাহিদার চেয়ে অনেক কম। বাস্তবিক তথ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর ও উত্তর-মধ্য অঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল অববাহিকা শুষ্ক মৌসুমে ক্রমান্বয়ে নাব্যতার গভীর সংকটে নিপতিত হচ্ছে; তবে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ গঙ্গা অববাহিকায় প্রায় ১০% ও যমুনা অববাহিকায় ৩৩% বৃদ্ধি পায় (স্পারসো জরিপ প্রতিবেদন); (১১) প্রায় প্রতি বছরই উজান থেকে অপ্রতিরোধ্য ঢল এবং বন্যা/আকস্মিক বন্যায় দেশের, বিশেষ করে, উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভেসে যায় এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিমজ্জিত হয় জলাবদ্ধতায়; বিপন্ন করে দেয় দেশের অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনপথ ও সম্পদ। নদ-নদীর এ দুরবস্থা আমাদের সভ্যতা, অস্তিত্বের ও প্রজন্মের ধারাকে করে চলেছে জনপদকে বিপন্ন, মানুষ ও প্রাণি সম্পদকে বিপদগ্রস্ত এবং পানি, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে করছে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটাপন্ন। জে আর সির সমন্বয়হীনতা, আগ্রিম সতর্কবার্তা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা, অবহেলা ও অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে ভাটির দেশ বাংলাদেশের। কার্যত বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে এই সব দুর্যোগ, দুর্ভোগ এবং ধ্বংসাত্মক সর্বগ্রাসী প্লাবন ও অপ্রতিরোধ্য ঢলের মরণ ছোবলে পড়ছে। অথচ প্রকৃতির বিরূপ অবস্থার পাশাপাশি উজানের প্রতিবেশীর নির্দয়তা ও মর্মস্পর্শিতা ভাটির জনগণকে করে তুলে দিশেহারা, গৃহহারা, স্বজনহারা, এক কথায় সর্বহারা। এ অবস্থার পরিবর্তনে ভাটির বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী উজানের দেশের আন্তরিক যৌথ কার্যকর টেকসই কর্মপরিকল্পনার বিকল্প নেই।

১৩. আন্তঃনদীপথ ও অববাহিকাঞ্চল ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম :

(ক) আমাদের মৌলিক জাতীয় দর্শন ও দেশের ভূখন্ডের অখ- নদ-নদী সীমানা ও সীমান্তের পানির প্রাকৃতিক ও উজানের উৎসস্থলের পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের অবিচ্ছিন্ন ধারা সমঅধিকার বা ন্যায্য হিস্যার অংশীদারত্ব, যা বাংলাদেশের মৌলিক ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও প্রোটোকল অনুযায়ী প্রাপ্য। (খ) মৌলিক ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও প্রোটোকল অনুযায়ী প্রাপ্য বাংলাদেশর এ ন্যায্য হিস্যা ও অংশীদারত্ব অর্জনে ও আদায়ে আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে সচেষ্ট হতে সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, পারস্পরিক দেন-দরবার, দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বৈঠক, সমঝোতা সমান তালে, সম্মান, সক্ষমতা ও দক্ষতার সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে চালিয়ে যেতে সমর্থ হতে হবে। সবার ওপরে দেশ ও দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে লড়তে হবে।

১৪. নদীর জমির মালিক জনসাধারণ : The State Acquisition and Tenancy Act (SATA) ১৯৫০ এর ৮৬ ও ৮৭ ধারার বিধানাবলি এবং মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন-৩৫০৩/২০০৯ (৩০৩৯/২০১৯ নং রায়ে প্রদত্ত নির্দেশনা) পর্যালোচনায় সুস্পষ্ট যে, নদ-নদীর জমির মালিক জনসাধারণ; নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য নয় ও বন্দোবস্তযোগ্যও নয়।

 প্রণিধানযোগ্য, নদ-নদীর জমি, তীরভূমি ও ফোরশোর রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার আইন ও বিধি-বিধান, খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধি-বিধান/নীতিমালার থেকে ভিন্ন, যা অবশ্যই প্রতিপালনীয়।

 ৮৬[২] : উক্ত সিকস্তিকৃত জমি ৩০ বছরের মধ্যে পূর্বস্থানে পয়স্তি/পুনঃউদ্ভব হলে, উক্ত জোতের মূল মালিক কিংবা তার উত্তরাধিকারীর স্বত্ব ও স্বার্থ বজায় থাকবে।

কার্যত : পাবলিক প্রপার্টি (Public Property) : নদ-নদী, জলাশয়-জলাভূমি, খাল-বিল, বনাঞ্চল, মাটি-পানি-আলো-বাতাসসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য (Rivers and Wetlands, Forests, Environment (Soil-Water-Light & Air), Ecology & Biodiversity) এবং ভূসম্পত্তিসহ জীবন ও জীবিকা (Lands and Populations, Lives & Livelihoods) বিধ্বংসী বহুমুখী সমস্যা ও নানাবিধ প্রতিকূলতার জন্ম দিয়েই চলেছে। এ বিষয়গুলোর রূপান্তরিত/পরিবর্তিত অবস্থা, দুরবস্থা, দুর্দশা ও চরম অব্যবস্থাপনা বাংলাদেশসহ বিশ্বকে/বিশ্ব বিবেককে ভাবিয়ে তুলছে।

 বাংলাদেশে নিম্নেবর্ণিত বিষয়গুলো ঘটে চলেছে বর্ধিষ্ণু হারে; ফলে ক্রমানুক্রমে সার্বিক অবস্থার অবনতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে/প্রকাশিত হচ্ছে :

 (ক) জনসংখ্যা ঊর্ধ্বগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তা সম্পদে রূপান্তরের পরিবর্তে চরম অব্যবস্থাপনায় নিপতিত হচ্ছে। ভূসম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে চাপ পড়ছে।

 (খ) পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদ দ্রুত আয়ত্তে নেওয়ার/রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। নদ-নদী, পানি, পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য নানামুখী জটিল সমস্যার করাল গ্রাসে নিপতিত হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে; এসবই যেন দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে।

 (গ) ভূমি-মানুষ অনুপাত (Land-Man ratio) ক্রমশ নিম্নগামী বা তলানিতে যাচ্ছে; ভূমিহীন হতদরিদ্রের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে; যদিও ভূমিহীন হতদরিদ্রজনদের মধ্যে সরকারি খাসজমি বণ্টন করে চলেছে সরকার ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন আশ্রয়ণ/গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি সরকারি খাসজমি হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে তা বেহাত হয়ে চলেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে/কারণে ভূমিহীন হতদরিদ্রজন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন আশ্রয়ণ/গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত/রূপান্তরিত সরকারি খাসজমি যা মূলত পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি, তা সময়ের ব্যাপ্তি পরিসরে ধনী-ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছে বেচা-বিক্রির কিংবা নানা ছলচাতুরী/অন্যায় প্রভাব বিস্তারের কারণে হস্তান্তরিত হয়ে যায়/যাচ্ছে। এভাবে কার্যত নদনদী, জলাশয়-জলাভূমি, খাল-বিল, বনাঞ্চলের পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি হারিয়ে যাচ্ছে/হ্রাস পাচ্ছে/ফুরিয়ে যাচ্ছে।

 (ঘ) আরও প্রণিধানযোগ্য যে, সিকস্তি-পয়স্তিলব্ধ উক্ত নদ-নদী, জলাশয়-জলাভূমি, খাল-বিল, বনাঞ্চলের পাবলিক প্রপার্টি, প্রাকৃতিক ভূসম্পত্তি ভুলক্রমে কিংবা যোগসাজশের মাধ্যমে কিংবা অন্যায়ভাবে, অবৈধ পন্থায় সংশ্লিষ্ট সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত কিংবা স্থানীয় সরকার বা বেসরকারি কর্তৃপক্ষের কর্তাব্যক্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীর নৈতিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাববলয়ের বা দালাল ও দুষ্ট চক্রের বহুরূপী প্রলোভন এবং নিগ্রহ/অত্যাচারের ফাঁদে বেহাত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ মিলছে।

 (ঙ) এই অব্যবস্থা ও অন্যায় কার্যকারণ স্পষ্টতই বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক-এর আইনি বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদর আইনি বিধানের পরিপন্থি কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক এর আইনি বিধান : ‘নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য।-(১) সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।’ ‘It is the duty of every citizen to observe the constitution and the laws, to maintain discipline to public duties and to protect public property.’

 (২) সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। Public propertyকে জাতীয় সম্পত্তি হিসাবে বাংলা করা হয়েছে। যা সিপি নং-৩০৩৯/২০১৯ ১৭-২-২০২০ তারিখের রায়ের নজীর, পৃষ্ঠা-৩৫ ও ৩৯);

(চ) নদ-নদীর জমি সিএস-পরবর্তী উক্তরূপ কোনো অননুমোদিত/অবৈধ জরিপে ব্যক্তি/গোষ্ঠী/সংস্থার নামে ও মালিকানায় হস্তান্তরিত হবার কিংবা হ্রাস পাবার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। নদ-নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য নয় কিংবা বন্দোবস্তযোগ্যও নয়, কিন্তু পরিবর্ধনযোগ্য। SATA ১৯৫০-এর ১৪৪ক ও ১৪৯(৪) ধারায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক বাতিলযোগ্য (ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২৩-৯-২০১৫ সার্কুলার এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশ)। [Public Right of Easement] : জনঅধিকারভুক্ত ও ব্যবহার্য সম্পত্তি হিসেবে হালনাগাদ করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কালেক্টর ক্ষমতাবান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত।

১৩. নদ-নদী, পানি ও পরিবেশ দূষণ ও প্রতিরোধ : (ক) নদ-নদীর জমি জনঅধিকারভুক্ত ও সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সম্পত্তি হিসাবে আইনে এবং দেশের উচ্চ অদালতের রায়ের অনুসরণে অবৈধ দখল/দূষণ : আইনসমূহের নির্দিষ্ট ধারায় অপরাধ : শাস্তি বা জরিমানার ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা যায়।

(খ) পরিবেশ সংরক্ষণ একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারকে এ দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত কার্যক্রম- সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা পালনে সমর্থ/বাধ্য করতে হবে; নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ ইউনূস (বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা)-এর ৩-শূন্য থিয়োরির (3 Zero Theory) একটি হলো শূন্য কার্বন নিঃসরণ (Zero Emission Theory), যা বিশ্বব্যাপী অনুশীলন হলেও তার সরকারি আমলে তার নিজ দেশেই সঠিক পরিচর্যা / অনুশীলন এবং কার্যকর বাস্তবায়নে যথা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি; এ যেন এক চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার করুণ সুর দেশের তথা ঢাকার আকাশে-বাতাসে অনুরণিত হচ্ছে। (গ) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর ও সংস্থাসমূহ এবং মাঠে কর্মরত অফিসগুলো এক্ষেত্রে কোনো ফলপ্রসূ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারেনি আইনকানুনের প্রয়োগ কিংবা প্রকল্প উন্নয়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় /স্বাক্ষর ফুটে উঠেছে। সচেতন জনগণের বিরূপ মন্তব্য ও সমালোচনা রয়েছে। আইনকানুনের প্রয়োগ কার্যত নেই; বিগত বছরগুলোর মতোই অবহেলা-অযত্নে শূন্য কার্বন নিঃসরণ (Zero Emission Theory) কার্যক্রম চরমভাবে জনগণকে হতাশ করেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক উক্ত মন্ত্রণালয়কে ও অধিদপ্তরকে প্রদত্ত সুশীল সমাজ ও বিশেষ কমিটি কর্তৃক বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশসমূহ অকার্যকরই রয়ে গেছে। এ যেন সেই ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’ কিংবা ‘যত গর্জে, তত বর্ষে না’ বচনের মতোই করুণ দশা-দুর্দশাগ্রস্ত।

 ১৪. জনসচেতনতা সৃষ্টি-যোগাযোগ ও সমন্বয়পূর্বক কার্যকর ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ :

(ক) ইতোমধ্যে নদী ও পরিবেশদূষণ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মোকাবিলায় পরিবেশ কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরিবেশ সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মোবাইল কোর্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিচার কার্যক্রম সফল করার জন্য বিচারপতি/আইনজীবীদের পরিবেশ ও নদীদূষণ, দখল এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য এবং নদী ও পরিবেশ রক্ষায় আইনি প্রয়োগ সম্পর্কিত তথ্য সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। (খ) জনবল, logistic এবং অর্থ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে পরিবেশ ও মোবাইল কোর্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে; (গ) জনসচেতনতার প্রচার ও প্রসারে তরুণ সমাজ ও ছাত্রছাত্রীসহ সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত ও উদ্বুদ্ধ করা সরকারের জরুরি কাজ; এ ক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা কিংবা কালক্ষেপণ পুরো জাতির জন্য বিপর্যয় ঘটাবে, যা জাতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না; এক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, সে যে পর্যায়েরই যত শক্তিশালীই হোক না কেন; (ঘ) নদী, জলাভূমি এবং তদসংলগ্ন পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি সুরক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে চাপ প্রদানকারী সংস্থা (Pressure Group) হিসেবে শক্তিশালী প্রচারণা (Strong Advocacy) চালাতে পারে। জনসচেতনতার প্রচার ও প্রসারে তরুণ ও ছাত্রছাত্রীরা কাজ করতে পারে; (ঙ) বেসরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা : নদীরক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তরা জনগণের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে পারে। নদীরক্ষায় আমজনতা তথা শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, ভূমি মালিকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে; (চ) নীতি, কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন : পরিবেশ নীতি- Polluters Pay Principle  গ্রহণ করতে হবে নদীদূষণ রোধ তথা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও প্রয়োজনে পরিবর্তনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

(জ) জনপ্রতিনিধিদেরও এগিয়ে আসতে হবে নদ-নদীর জমি জনঅধিকারভুক্ত ও সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সম্পত্তি রক্ষায়; দায়ীদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হলে নিরপেক্ষতা ও প্রমাণাদির ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করতে হবে; (ঝ) ফৌজদারি কিংবা দেওয়ানি কিংবা প্রশাসনিক কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হলে; মোবাইল কোর্ট সব জেলা ও উপজেলায় পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নিরপেক্ষতার সঙ্গে; (ঞ) পার্লামেন্টে যে আইন পাস হয় তার বাস্তবায়নে নৈতিক ও প্রায়োগিক সমর্থন জনস্বার্থেই দেওয়া যায়। এ দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে নদ-নদীর জমি জনঅধিকারভুক্ত ও সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সম্পত্তি রক্ষায় সফলতা আসবে না। (ট) দায়ী কর্তৃপক্ষকে কর্মকর্তা-কর্মচারী বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। (ঠ) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (পরিবেশ/ভূমি/পানি সম্পদ/নৌ) কিংবা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধমে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে/করাতে পারে। উচ্চ অদালতের মাধ্যমেও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়/নিতে হবে। দায়ীদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হলে নিরপেক্ষতার ও প্রমাণাদির ভিত্তিতে। সরকারি-বেসরকারি কিংবা জনসাধারণ/নাগরিক কেউই জবাবদিহিতার আওতাবহির্ভূত নয়।

 লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন