বন্যার শঙ্কায় ফেনীবাসীর আতঙ্কের রাত

ফেনীসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় আগামী ৩১ মে পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ। আরেক আবহাওয়াবিদ উদয় রায়হান জানান, সর্বশেষ আপডেটে দেখা গেছে মুহুরী নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ৫.৫ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা অংশে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

এতে ৩০ ও ৩১ তারিখে মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। বর্তমানে অমাবস্যার সময় চলছে। ১ জুন থেকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতিভারী বৃষ্টিপাত হলেও পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।

ফেনী আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চমান পর্যবেক্ষক মুজিবুর রহমান জানান, বুধবার (২৮ মে) সন্ধ্যা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৩৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ভারতের উজানের পানি যুক্ত হলে বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।

সিনিয়র আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপটি বৃহস্পতিবার নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। নিম্নচাপের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্নচাপটি খুলনা হয়ে সাতক্ষীরা অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে ফেনী ও নোয়াখালীতে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে।

আবহাওয়া বিভাগের (বিএমডি) পূর্বাভাসে জানা গেছে, উত্তর-পশ্চিম সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) সর্বশেষ পূর্বাভাস বুলেটিনে জানায়, ওড়িষা সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে শুক্রবার পর্যন্ত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহে এবং হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, সিকিমে অতি ভারী থেকে অত্যধিক ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই অতি বৃষ্টির পানি ঢল আকারে নামতে পারে ভাটিতে বাংলাদেশের দিকে।

এদিকে পাউবো’র বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বুধবার পূর্বাভাসে জানায়, দেশের অভ্যন্তরে অতি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে ভারতের ঢলে ফেনী, সিলেট এলাকা ও উত্তরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, আগামী তিন দিন চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী নদীর পানি বাড়তে পারে। এ সময়ে মুহুরীর পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে ফেনী জেনার নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। ত্রিপুরাসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সম্ভাব্য ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘু চাপ কেন্দ্র করে ফেনীতে সম্ভাব্য বন্যার শঙ্কা আবার জেগেছে। 

গেল বছরের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনও জেলায় দৃশ্যমান। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার প্রশাসন থেকে স্বেচ্ছাসেবক, সেনাবাহিনী থেকে স্থানীয় জনগণ সবাইকে নিয়ে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ফেনী জেলা প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার (২৮ মে) জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতিই আমাদের বড় অস্ত্র।

সভায় সম্ভাব্য ভারী বৃষ্টিপাতে বন্যার আশঙ্কার আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দুর্বল বাঁধ চিহ্নিত করে ব্যবস্থাগ্রহণ, শুকনো খাবারের ব্যবস্থা রাখা, মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ, সরকারি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথি, জেনারেটর, ব্যাটারি, রেডিওসহ যন্ত্রপাতি অক্ষত রাখার ব্যবস্থাগ্রহণ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা এবং উদ্ধার কাজের জন্য সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, রোভার স্কাউটস, রেড ক্রিসেন্ট, সিপিবিসহ স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি যদি হয়, তাহলে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি বাড়বে। ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সম্ভাব্য ভাঙন প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে মেরামত ও প্রতিরোধমূলক কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা, রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রস্তুতিও তদারকির কথা জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে রেড ক্রিসেন্ট, সিপিবি ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রস্তুত রাখা হবে। যাতে একযোগে দুর্যোগ মোকাবেলা সম্ভব হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জরুরি তহবিল থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা এনে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে। একইসঙ্গে প্রতিটি উপজেলাতে জরুরি তহবিল গঠন করে রাখা হচ্ছে, যাতে যেকোনো মুহূর্তে তা কাজে লাগানো যায়।

চলতি বর্ষা মৌসুমেও ফের বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ফুলগাজী-পরশুরামের মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর ১০২টি স্থানে বাঁধ ভেঙে ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিলো ফেনীবাসী। নদী তীরের সেসব বাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়েছিলো সেসব স্থানে মেরামত হয়েছে জোড়াতালি দিয়ে।

স্থানীয়রা বলছেন, টেকসই স্থায়ী বাঁধ ছাড়া তাদের মুক্তি নেই। পানির চাপ পড়লে আবার ভাঙবে।

পরশুরামের নিজ কালিকাপুরের বাসিন্দা শফিক আহম্মদ বলেন, গত বছরের বন্যায় সব হারিয়েছি। বাশেঁর বেড়ার ঘরে জোড়াতালি দিয়ে বসবাস করছি। রাত এলেই ভয়ে থাকি, কখন পানি এসে আবার সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, মুহুরী নদীর বাঁধের যে স্থান দিয়ে পানি ঢুকেছিলো সেই বাঁধটির কাজ এখনো হয়নি। ভারি বৃষ্টি হলেই সেখান দিয়ে ঢুকবে পানি। 

ফুলগাজী উপজেলার স্থানীয় সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম রাজু বলেন, গত বছরের বন্যা আতঙ্কের কারণে গতকাল থেকে বৃষ্টির শুরু হওয়ায় স্থানীয় লোকজন বন্যার শঙ্কায় রাত জেগে ঘরের সামনে বসে থাকে।

গত বছর বর্ষা মৌসুমে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা ফেনী। ভয়াবহ বন্যার আঘাত লাগে জেলার সবকটি উপজেলায়। পানিবন্দি ছিলেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। এই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রাণহানি হয়েছিল ২৯ জনের। গতবারের বন্যায় ফেনীর মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১২২ কিলোমিটারের মোট ভাঙন ১০২ টি। তড়িঘড়ি কওে এসব বাধঁ সাময়িক মেরামত করলেও তাতে আস্থা রাখতে পাছেন না স্থানীয়রা।