বিসিবি সভাপতি ফারুককে সরিয়ে দিল সরকার

মাত্র ৯ মাস আগে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও বোর্ড পরিচালকদের সম্মতিতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি হয়েছিলেন ফারুক আহমেদ। সেই ফারুককেই গতকাল রাতে সরিয়ে দেওয়া হলো। রাতে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরিচালক পদে তাকে দেওয়া মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয় এনএসসি।

ফারুককে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে আট পরিচালকের তার প্রতি অনাস্থা ও বিপিএল নিয়ে সত্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা স্বাভাবিক রাখার কথা উল্লেখ করেছে এনএসসি। সত্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে বিপিএল নিয়ে বেশ কিছু অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, যার দায় বর্তায় বিসিবি সভাপতির ওপর। বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, পরিচালকদের মধ্য থেকে একজন বোর্ড সভাপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। যেহেতু তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, তাই বিসিবি সভাপতি পদে এখন তার আর থাকার কথা নয়।

মনোনয়ন বাতিলের পর যোগাযোগ করা হলে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘চিঠিটি আমি দেখেছি। এ ব্যাপারে আমি এখন কোনো মন্তব্য করব না। আগামীকাল আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’

সরকার চাইছিল না ফারুককে : ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে গত বুধবার একটি বৈঠক হয় ফারুক আহমেদের। সেখানে কী কথা হয়েছে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার সকালে ফারুক বলেন, ‘আমি তো আর যেচে চেয়ারে বসিনি, আপনাদের অনুরোধেই এসেছি। বিনা কারণে পদত্যাগ করাটা নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করার মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘উপদেষ্টা কিন্তু আমাকে পদত্যাগ করতে বলেননি। শুধু বলেছেন, আমাকে আর তারা কন্টিনিউ করাতে চান না।’ তবে কেন এমন সিদ্ধান্ত, সেটি জানতে চাইলে বিস্ময়কর জবাব পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ফারুকের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রীড়া উপদেষ্টা নাকি তাকে বলেছেন, ‘বিপিএল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা আপনার ওপর অসন্তুষ্ট।’

তবে বিসিবিতে ফারুকপন্থিরা তা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের কথা, বিপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ‘রাজস্ব’ এসেছে এবার। হ্যাঁ, দুটি দল পেমেন্ট নিয়ে ঝামেলা করেছে। অনেক পানিঘোলা হয়েছে; কিন্তু তার দায় তো আর পুরো বিসিবির নয়। তাদের দাবি, বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে এমন ছেলেখেলা চলতে পারে না। সরকারের ইচ্ছায় কাউকে বসানো, আবার ইচ্ছামতো সরিয়ে দেওয়া এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠবে।

পরিচালকদের অনাস্থা, ফারুকের পাল্টা অভিযোগ : বিসিবিতে বর্তমানে রয়েছেন ১০ পরিচালক। এর মধ্যে আকরাম খান ও ফারুক আহমেদ ছাড়া বাকি আটজনই গত ২৮ মে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) কাছে অনাস্থার চিঠি দিয়েছেন সভাপতির বিরুদ্ধে। যদিও বেশিরভাগ পরিচালক ‘নো কমেন্টস’ বলে এড়িয়ে যান, একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নো কমেন্ট মানে বুঝে নেন, এমন কিছু হয়েছে। আকরাম ভাই ছাড়া আমরা বাকি সবাই অনাস্থা জানিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নাটক তো এখনো বাকি আছে। দেখেন আগামীকাল (আজ) কী ঘটে।’

এ অবস্থায় নিজের পদে অনড় ফারুক বলেন, ‘আমাকে আমার ব্যর্থতার কথা বলত, তাহলে বুঝতাম আমি কোথায় ভুল করেছি। কিন্তু কিছুই বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, ওপরমহল আমাকে আর চাইছে না। আমি কোনো ক্রিকেটীয় কারণ এর মধ্যে খুঁজে পাইনি। তাই পদত্যাগ করারও কোনো কারণ দেখছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিসিবিতে দুদক ঢোকার পর থেকেই ষড়যন্ত্র চলছে।

তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেটের কেলেঙ্কারিতে পরিচালকদের একাংশের জড়িত থাকার বিষয়টি দুদকের তদন্তে এসেছে। বিপিএলে টিকিট বিক্রির রেকর্ড হয়েছে। অথচ একজন পরিচালক পুরনো সিস্টেমে ফিরতে চেয়েছিলেন, যাতে বিসিবির বড় অঙ্কের রাজস্ব হাতছাড়া হতো। আমি সেটি হতে দিইনি। এখন তারাই ষড়যন্ত্র করছে।’

আইনি পথে যেতে চান ফারুক : পরিচালকদের অনাস্থার চিঠির পর ফারুক আহমেদ আইনি ব্যবস্থার কথাও ভাবছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দেখি, কী করা যায়। কিছু একটা তো অবশ্যই করব। আমি আমার আইনজীবীর সঙ্গেও কথা বলে রাখছি। প্রয়োজন হলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনাস্থার কোনো সুযোগই বিসিবির গঠনতন্ত্রে নেই। তাই অনাস্থায় কিছু আসে-যায় না। হয় এই বোর্ড রাখবে, না হয় ভেঙে দেবে।’

বুলবুলকে নিয়ে ভাবনা, আছে জটিলতা : সরকারের পছন্দ এখন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। যদিও বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তিনি সভাপতি হওয়ার জন্য এখনো যোগ্য নন। কারণ তাকে আগে কাউন্সিলর হতে হবে। বিসিবির কোনো ক্লাব, প্রতিষ্ঠান কিংবা কোটার আওতায় তিনি কাউন্সিলর নন। দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবন ও আইসিসিতে চাকরির কারণে বিসিবির কার্যক্রম থেকেও দূরে রয়েছেন। বুলবুল নিজেই বলছেন, ‘যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক দিন আগে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তারা জানতে চেয়েছে, আমি সার্ভ করতে রাজি কি না। আমি বলেছি, বোর্ডে কাজ করার জায়গা অনেক আছে। তারা আমাকে বিসিবির পরিচালক পদে চায় বলেছে। সভাপতি নিয়ে কোনো কথা হয়নি।’

তবে তিনি বিসিবিতে দীর্ঘমেয়াদে থাকার আগ্রহ দেখাননি ‘আমি আইসিসিতে কাজ করি, ওটাই আমার পেশা। বিসিবি নির্বাচন পর্যন্ত কাজ করতে চাই, তবে নির্বাচন করা বা দীর্ঘ সময় থাকার ইচ্ছে নেই। আইসিসিতে অনুমতি চাওয়ার পর তারা বলেছে, দায়িত্ব শেষে আবার ফিরে গেলে আরও ভালো রোল দেওয়া হবে।’

সভা স্থগিত : এদিকে বিসিবির ৩১ মে’র নির্ধারিত বোর্ডসভাও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। বোর্ডের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সভা করা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, মাত্র ৯ মাসেই সরকার ও পরিচালকদের আস্থার সংকটে পড়েছেন বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ। সরিয়ে দেওয়ার পর তিনি আইনি লড়াইয়ে গেলে জটিলতা আরও বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে বিসিবির ওপর আইসিসির দৃষ্টিও তৈরি হতে পারে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। এক অনাকাক্সিক্ষত অস্থিরতার মুখে দাঁড়িয়ে এখন বিসিবি।