জমির বুক চিরে তোলা হচ্ছে পাথর

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় চা আর প্রকৃতির সৌন্দর্য সবার নজর কাড়লেও এখন সেখানে ক্ষত হিসেবে দেখা দিয়েছে ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন। প্রায় পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর আবারও শুরু হয়েছে পাথর তোলার মহোৎসব। পাথরমহাল ইজারার কার্যাদেশ পাওয়ার আগেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল। পতিত জমি, ফসলি জমি এবং নদীর বুক চিরে দৈনিক কয়েকশ ড্রেজার মেশিন দিয়ে তোলা হচ্ছে পাথর।

জানা গেছে, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন অভিযান শুরু করলেও পেরে উঠতে পারছে না চক্রের সঙ্গে। পথের মোড়ে মোড়ে রয়েছে তাদের সোর্স। অভিযানে বের হওয়া মাত্রই খবর পেয়ে যায় তারা। তবে এবার কোনো ব্যক্তি নয়, পাথর উত্তোলনের এই যজ্ঞে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পঞ্চগড় পাথর-বালু যৌথ ফেডারেশনের নেতারা। দৈনিক সাইটপ্রতি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেন মেশিন মালিকরা। দেড়শ থেকে দুইশ সাইট থেকে পাওয়া বিরাট অঙ্কের টাকা রোজ ভাগবাটোয়ারা হয় বলেও জানান তারা। এই টাকা রাতারাতি পৌঁছে যায় প্রভাবশালী সব মহলে। এভাবেই ড্রেজার দিয়ে পাথর তুলে রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠছেন একটি শ্রেণি। আর অন্যদিকে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, গত ১৫ জানুয়ারি জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে পাথর কোয়ারিগুলোর ইজারার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার নোটিস প্রকাশিত হলে এর অপব্যাখ্যা দিয়ে শুরু হয় পাথর উত্তোলন। জেলা প্রশাসন ইজারার প্রক্রিয়া শুরুর আগে থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে তেঁতুলিয়া উপজেলার একটি শ্রেণির মানুষ। শুরু হয় পাথর উত্তোলনের মহোৎসব। এ কাজে নির্বিচারে ব্যবহার শুরু হয় ড্রেজার মেশিন। পাথর উত্তোলনের জন্য বেছে নেওয়া হয় দুর্গম এলাকাকে। করতোয়া, সাঁও, ডাহুক, তালমা, চাওয়াইসহ নদীর বুকে এখন ড্রেজারের ক্ষত। এ ছাড়া সমতলের পতিত জমি, ফসলি জমি থেকেও একই কায়দায় তোলা হচ্ছে পাথর।

স্থানীয়রা জানান, তেঁতুলিয়ার ভজনপুর, গনাগছ, ভদ্রেশ্বর, শুকানি, নিজবাড়ি, কালীতলা, শালবাহান, কীর্তনপাড়া, ময়নাগুড়ি, প্রধানগছ, পাঠানপাড়া, পাথরঘাটা, দেবনগর, বড়বিল্লাহ, পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাঝিপাড়া, বেঙ্গুপাড়া, হাজিরঘাট, মধুপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, খালপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তোলা হচ্ছে পাথর।

পাথর উত্তোলনকারীরা জানান, জেলার ১৯টি পাথরমহালের মধ্যে ১৬টি ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে জেলা প্রশাসন। সবই নানা ব্যক্তির নামে নিয়েছে জেলা পাথর-বালু যৌথ ফেডারেশন। এর নেতৃত্বে রয়েছেন তেঁতুলিয়া উপজেলা পাথর-বালু সরবরাহকারী সমিতির সভাপতি ও পাথর-বালু যৌথ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক যুবদল নেতা হামিদুল হাসান লাবু এবং তেঁতুলিয়া উপজেলা পাথর-বালু ব্যবসায়ী ও শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নেতৃত্বেই চলছে অবৈধ প্রক্রিয়ায় পাথর উত্তোলন। কার্যাদেশ পাওয়ার আগেই তারা প্রতিটি গাড়ি থেকে তুলছেন টাকা। এই টাকা দিয়েই সব মহলকে ম্যানেজ করা হয়। এ ছাড়া ১৬টি পাথরমহালের নির্ধারিত স্থান চিহ্নিত করা থাকলেও মানছে না কেউ। বেশিরভাগ পাথরের সাইট করা হয়েছে মহালের বাইরেই। এভাবে দৈনিক শতাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিবেশবিদরা জানান, এর আগেই তেঁতুলিয়াসহ পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় হাজার হাজার গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। আবারও ১০০ থেকে দেড়শ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে অবৈধ প্রক্রিয়ায় পাথর উত্তোলনের কারণে। তাই এ জনপদে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলেই ব্যাপক ভূমি ধসের আশঙ্কা করছেন তারা। একই সঙ্গে নদীর বুকে অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন করায় হুমকিতে পড়ছে নদী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমিও।

পাথর শ্রমিক আজিজার রহমান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অন্য কোনো কাজের সুযোগ নেই। পাথরের কাজ করেই আমাদের সংসার চলে। ড্রেজার চললে আমাদের সমস্যা। কারণ ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিক যে কাজ করে তা একাই ড্রেজার দিয়ে করা যায়। আমরা চাই, সনাতন পদ্ধতিতে যেন পাথর তোলা চালু থাকে।’

পাথর উত্তোলনকারী শাহ আলম বলেন, ‘আমরা জমি লিজ নিয়ে পাথর উত্তোলন করছি। প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হয় ফেডারেশনকে। শ্রমিকদের মজুরি দিতে হয়। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ খরচ হয়েছে, সেই টাকাই তুলতে পারিনি।’

পঞ্চগড় পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল বারী বাবু বলেন, ড্রেজার মেশিনের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে আগামীতে এ জনপদের মানুষকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। পঞ্চগড় দেশের দ্বিতীয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে নবগঠিত এ মাটি ধসে যাবে।

তেঁতুলিয়া উপজেলা পাথর-বালু ব্যবসায়ী ও শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা নিজেরাই ড্রেজার মেশিন চালানোর বিপক্ষে। তবে যেসব মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে তা দিয়ে শুধু বালু কাটা ও পানি তোলা হয়। আমাদের সংগঠনের ২ হাজার ২০০ সদস্য রয়েছে। সবার কাছেই টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমরা ইজারার ৫১ লাখ টাকা জমা দিয়েছি।’ কার্যাদেশের আগেই পাথর উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পাথর উত্তোলন বন্ধ ছিল। তাই মানুষজন বাধা-নিষেধ মানছেন না।’

জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, ‘এখনো পাথরমহালগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। যারা অবৈধ প্রক্রিয়ায় পাথর-বালু উত্তোলন করছেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। অভিযানে এর মধ্যে কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-ও দেওয়া হয়েছে। পরিবেশের ক্ষতির বিষয়ে আমরা সচেতন রয়েছি। তাই কখনোই অবৈধ প্রক্রিয়ায় পাথর-বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না।’