দুর্ঘটনায় নিঃস্ব পরিবার, অনিশ্চিত ৩ শিশুর ভবিষ্যৎ

বাবা যে আর কখনো ফিরে আসবে না, সে বোধ জন্মায়নি চার বছরের ছোট্ট ইফতিয়ার হাসান নিহানের মনে। মেঝো ভাই নফিউল ইসলাম অপলক চোখে খুঁজে ফেরে তার প্রিয় বাবা আর দাদাকে। আর তেরো বছরের সানজিদা হোম ইভা এখনো কেবল সেই কথাটিই মনে করছে—তার বাবা বলেছিল কাজ শেষে ফিরে এসে পরীক্ষার ফি আর খাতা-কলম কিনে দেবে। কিন্তু আর ফেরা হয়নি তার। ফিরে এসেছে কেবল বাবার ও দাদার নিথর দেহ।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের পাইকুড়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় নিহত সবুজ মিয়া (৩৬) ও তার বাবা আব্দুস ছোবানকে (৬৫)। 

এর আগের দিন, বুধবার (২৮ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের দত্তপাড়া ১ নম্বর মোড় এলাকায় একটি বাসের চাপায় মাহিন্দ্রার তিন যাত্রী নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন সবুজ মিয়া ও আব্দুস ছোবান।

ঘটনায় নিহত অপর যাত্রী কহিনুর সুলতানা (৩৫), ঈশ্বরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দড়িপাঁচাশি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি রেখে গেছেন স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে তাজিন আহমেদ ফয়েজ পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে, আর মেয়ে ইলমার বয়স মাত্র ৫ বছর।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সবুজ মিয়া ও তার বাবা আব্দুস ছোবান পেশায় স্যানিটারি মিস্ত্রি ছিলেন। প্রতিদিন সকালে কাজের উদ্দেশ্যে ময়মনসিংহ শহরে যেতেন দুজনেই। বুধবারও তারা প্রতিদিনের মতো কাজেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু আর ফেরা হয়নি।

আব্দুস ছোবান ছিলেন ছয় মেয়ের বাবা। পাঁচ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ছোট মেয়ে মোসা. সীমা আক্তার এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। একমাত্র ছেলে সবুজ মিয়াই ছিলেন পুরো পরিবারের একমাত্র ভরসা।

সবুজের স্ত্রী আখলিমা আক্তার (২৮) বলেন, “বেগুন ভাজি, বরবটি ভাজি, মাছ ভুনা করে রাখছিলাম। কাম (কাজ) থেইক্যা আইয়া আমার স্বামী ভাত খাইবো। ফ্যামিলিডা নিঃস্ব অইয়া গেছে। পোলাপানরে কেমনে পড়ালেখা করাইমু? ওদের লইয়া এখন আমি কই যাইয়াম?”

তিন সন্তান ইভা, নফিউল ও নিহান—তাদের চোখে এখন শুধুই হতাশা আর ভয়ের ছাপ। ইভা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছে, “এখন আমরা কাকে বাবা ডাকি? দাদাও নাই। আমাদের দেখার কেউ রইল না।”

স্বামী-সন্তান হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় আব্দুস ছোবানের স্ত্রী নাসিমা খাতুন (৫৫)। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, “কি সর্বনাশ অইলো গো! আমার সব শেষ অইয়া গেছে গো…”—বলে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুল হক ভূঁইয়া মিলন বলেন, “পরিবারের উপার্জনকারী দুজন মানুষ একসঙ্গে চলে গেছেন। বাকি সদস্যদের দেখার কেউ রইল না। শান্তনা দেওয়ার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবায়দুর রহমান জানান, “খবর পেয়ে আমরা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘাতক বাসটি আটক করা হয়েছে এবং একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, “খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। খবর পেয়েই আমি হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। তারা আবেদন করলে সহায়তার বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় দেখা হবে।”