বুলবুল ইন ফারুক আউট

ক্রিকেটে অল্প কিছুদিন হয় ‘কনকাশন সাবস্টিটিউট’ নিয়ম চালু হয়েছে। মূলত বাউন্সারে ফিল হিউজের মৃত্যুর পর মাথায় আঘাত পাওয়া ক্রিকেটারের বদলি একই যোগ্যতার আরেকজন ক্রিকেটারকে দলে নেওয়া যায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে ফারুক আহমেদ কি সতীর্থদের বাউন্সারে ‘কনকাশন’ হয়েই বিদায় নিলেন? বিসিবির ১০ পরিচালকের ৮ জন তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন, মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এক রাতেই নেই হয়ে গেছে বিসিবি সভাপতির পদ। তার জায়গায় নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। অস্ট্রেলিয়াতে প্রবাসী জীবন বেছে নেওয়া বুলবুল আইসিসির ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন লম্বা সময়ের জন্য এই দায়িত্ব পালন করতে তিনি অনিচ্ছুক, একটা টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলতে চান বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর গোপনে দেশ ছেড়েছিলেন সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সেই শূন্যপদে ২১ আগস্ট দায়িত্ব নিয়েছিলেন ফারুক আহমেদ। সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন বিসিবিতে সংস্কারের কথা। আর্থিক অনিয়ম তদন্ত, গঠনতন্ত্র সংশোধন, কোচিং স্টাফে স্থানীয়দের অন্তর্ভুক্তিসহ অনেক প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন। কিন্তু ৯ মাসের মাথায় তাকে বিসিবি ছাড়তে হয়েছে নানান অপবাদ দিয়ে। বিসিবির অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে স্থানান্তরে আর্থিক অনিয়ম, অপরাধীকে সফরসঙ্গী বানানো, নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বিপিএলের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ প্রদান, দুর্বার রাজশাহী ফ্র্যাঞ্চাইজিকে বিপিএলে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়াসহ অনেক অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন বিসিবির ৮ পরিচালক। একমাত্র আকরাম খান ব্যক্তিগত কারণে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন থেকে বিরত থাকেন, যার সঙ্গে ফারুকের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে।

যারা অনাস্থা প্রস্তাব এনে ফারুককে সরিয়েছেন, তারাই ভোটে নির্বাচিত করে নতুন বিসিবি সভাপতি বানিয়েছেন আমিনুল ইসলামকে। সভাপতি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তার পাশে বসেছিলেন ইফতেখার আহমেদ মিঠু, মাহবুব আনাম, ফাহিম সিনহা, নজীব আহমেদরা; যারা এক রাত আগেই বিদায় করে দিয়েছেন বুলবুলের এক সময়ের ক্রিকেট মাঠের সতীর্থ ফারুককে। তাদের পাশে নিয়ে বোর্ড সভাপতির পদে বসাটা কতটা নিরাপদ ভাবেন বুলবুল? দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই তার কাছে রাখা হয়েছিল এমন প্রশ্ন, উত্তরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান বলেছেন, ‘আজ ৩০ মে, আজ থেকে আমার শুরু হলো। এই মুহূর্তে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমি চেষ্টা করব সবার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে, সবার এনার্জিটা কাজে লাগিয়ে আমরা যেন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। আমার এই মুহূর্তে যে স্কিলসেট আছে, এটা একটা প্যাকেজ। আমি ছোট্ট দেশ তাজিকিস্তান এবং যেখানে ক্রিকেট নিয়মিত খেলা হয় যেমন ভারত ও পাকিস্তান সেখানেও কাজ করি। আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে কাজ করব, আশা করি ফেল করব না। একজন খেলোয়াড় হিসেবে এখানে বসিনি, আমার যে ভূমিকাটা আছে সেটা পালন করার চেষ্টা করব।’ সদ্য সাবেক হওয়া ফারুক আহমেদের ভাগ্য তাকেও বরণ করতে হতে পারে, এমন আশঙ্কা করেন কি-না এমন প্রশ্ন প্রশ্নে বুলবুল বলেছেন, ‘আজ আমি শুরু করলাম, সামনেই বলে দেবে সবকিছু। আমি এটা বিশ্বাস করি যে, একটা ক্রিকেট দল বা দেশ তখনই এগিয়ে যায় যখন দল হিসেবে কাজ করে। একজন বোলার কিন্তু একলা বল করতে পারে না, তার ফিল্ডার দরকার উইকেটরক্ষক দরকার। আমরা একেকজন একেক ভূমিকা পালন করব, চেষ্টা করব সেটা প্রতিষ্ঠিত করার।’ অন্য পরিচালকরা চাইলেই অনাস্থা প্রস্তাব এনে সরিয়ে দিতে পারেন, সেটা বাড়তি বোঝা কি-না এমন প্রশ্নে তার উত্তর, ‘আমার এই কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়নি কারও কথায় চলতে হতে পারে। ক্রিকেট একটা সংস্কৃতির ব্যাপার, খুবই উচ্চ কৌশলের খেলা। আমি আজ এসেছি, ব্যাপারগুলো দেখব। এই প্রশ্নের উত্তর পরে দিতে পারব।’

আমিনুল ইসলাম এমন সময়ে দায়িত্ব নিলেন,যখন বাংলাদেশের ক্রিকেটে সংকটকাল চলছে। মাঠের খেলায় আরব আমিরাতের কাছে সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের  কাছেও হেরেছে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে। দায়িত্ব নিয়ে বুলবুল জানিয়েছেন আঞ্চলিক ক্রিকেট কাঠামো গঠনের কথা, যে প্রতিশ্রুতি টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সময়ই আইসিসিকে দিয়েছিল বাংলাদেশ কিন্তু এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। বুলবুল বলেছেন  শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নয়, সার্বিকভাবে বাংলাদেশে ক্রিকেটের একটা সংস্কৃতি তৈরি করতে চান, খেলার ভেতর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আসতে চান। ফান ক্রিকেট, কমিউনিটি ক্রিকেট থাকবে, তবে তার পাশাপাশি সার্বিকভাবে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কাঠামো গঠন করতে চান। ক্রিকেটের টাকা ক্রিকেটারদের জন্য খরচ করতে চান।

এই জায়গাতেই হয়তো ফের সংঘাতের শুরু হতে পারে বিসিবিতে দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসে থাকা পরিচালকদের সঙ্গে নতুন সভাপতির। ক্লাব ক্রিকেটে গোষ্ঠীতন্ত্র, পক্ষপাতদূষ্ট আম্পায়ারিং-সহ অনেক কিছুই নাজমুল হোসেন পাপনের সময়ে যারা নীরবে সয়েছেন, তারাই ফারুকের আমলে সরব হয়ে তাকে হটিয়ে দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে নিয়ে বুলবুল কতটা পথ পাড়ি দিতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়। ফারুক বিসিবি সভাপতি হয়েছিলেন শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার দিনে, বুলবুল দায়িত্ব নিলেন জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার দিনে। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ার কুশীলবরা কতদিন এই পদে থাকতে দেবেন তাকে?