স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বেড়েছে ৫০০ কোটি টাকা

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে এই বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকা বেশি, যা গত বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।

গতকাল সোমবার বাজেট বক্তৃতায় এই প্রস্তাব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বাজেট বক্তৃতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার জন্য ৪ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (এপিআই) জন্য ১ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভালো দিক ৫ শতাংশের ওপরে আছে : স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ শতাংশের ওপরে থাকা ‘ভালো দিক’ বলে মনে করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজেট ভালোমন্দ বলার সুযোগ নেই। এটা নির্ভর করবে সরকার এই বরাদ্দ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিয়ে কতটা সফলভাবে ব্যয় করাতে পারল। বাজেট গত বছরের তুলনায় কমেনি, বরং একটু বেড়েছে। দেখছি যে উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কমেছে, পরিচালনায় বেড়েছে। এতে গত বছর যে সব কর্মসূচি ছিল, এ বছরও সেগুলো করতে পারবে। সরকার নতুন কোনো প্রকল্প নেয়নি। আগের বছর যে সব প্রকল্প ছিল, সরকার সেগুলোর জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। বাজেট যেহেতু গত বছরের তুলনায় আনুপাতিক হারে কমেনি, গত বছর ৫ দশমিক ২ শতাংশ ছিল, এবার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। তার মানে এটা একটা ভালো দিক যে সরকার ৫ শতাংশের ওপরে রেখেছে। এখন সরকারের উচিত হবে বরাদ্দ ব্যয় করতে না পারার পেছনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যেসব বাঁধা, সেই বাঁধাগুলো দূর করা। তা হলে বরাদ্দ ব্যয় বাড়লে ভবিষ্যতে বরাদ্দ আরও বাড়ার পথ তৈরি হবে। মূল কথা হলো সরকার যেন ছয় মাস পর সংশোধিত বাজেটে অর্থ প্রত্যাহার করে না নেয় এবং এই টাকা যেন ঠিকমতো ব্যয় হয়, সেই প্রক্রিয়া যেন সরকার এখন থেকেই শুরু করে।

স্বাস্থ্য সেবায় বেড়েছে, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণে কমেছে : বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত মোট বরাদ্দের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা এবং শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ১০ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। সে হিসেবে এবার এই খাতে বরাদ্দ ৮৯৭ কোটি টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থ বছরে শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে এই খাতে বরাদ্দ ৩৯৭ কোটি টাকা কমেছে।

কমেছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও :  এ বছর স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা কমেছে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ১৯০ কোটি টাকা ও এ বছর প্রস্তাব করা হয়েছে ১৭ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা এবং শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ৫ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।

হাসপাতালের যন্ত্রপাতি আমদানিতে খরচ কমবে : রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং জনস্বার্থে রেফারেল হাসপাতালের পাশাপাশি ৫০ শয্যার অধিক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। পাশাপাশি হাসপাতাল বেড উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপকরণ ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি ও স্থানীয়ভাবে কেনার ক্ষেত্রে সমুদয় ভ্যাট আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহতি প্রদান করে কাস্টমস আইন-২০২৩ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওষুধ শিল্পে কর অব্যাহতি : নতুন বাজেটে সব ধরনের ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও এপিআই তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল রেখেছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়, ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধসহ সব ধরনের ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও এপিআই তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাধারণ ও আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সসহ হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক ভেহিক্যালকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

কেয়ারগিভার ও নার্সদের জন্য সুখবর : প্রস্তাবিত বাজেটে কেয়ারগিভার ও নার্সদের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা বাজেট বক্তৃতায় বলেন, উন্নত দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কেয়ারগিভার খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হলে একদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত হবে এবং একই সঙ্গে প্রবাসী আয় অর্জনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। এ লক্ষ্যে কেয়ারগিভারদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নার্সিং শিক্ষায় পিএইচডি কোর্স চালু এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য একটি নার্স শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠারবিষয় বিবেচনায় রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা : বক্তৃতায় স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে সব নাগরিককে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে সেবার পরিধি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ জনবল নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণে চিকিৎসক, সেবিকা, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্য সহকারীদের নিয়োগ ত্বরান্বিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি জানান, যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, পরিবেশ উন্নয়ন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আওতায় জনগণকে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। আধুনিক নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন শহরে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ও প্রাথমিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।