ফেনীতে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ফেনীতে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। জেলার ৬ উপজেলায় এবার বসছে ১১২ হাট-বাজার। এবার হাটে দেশি গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের প্রাধান্য রয়েছে। শুক্রবার (৩০ মে) থেকে ইজারাকৃত হাট-বাজারে পশু বেচাকেনা শুরু হয়ে গেছে। পশুর দাম নিয়ে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিক্রেতারা বলছেন, লালনপালনের খরচ বেশি হয়েছে এবার। তাই কম দামে পশু ছাড়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, দাম কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক না, তবে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ বেশি দাম চাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

জেলা প্রাণীসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছরের মতো এবারও স্থানীয় চাহিদার তুলনায় পশু বেশি রয়েছে ফেনীতে। এবার জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৮২ হাজার ৩৩৬টি। তারমধ্যে বাণিজ্যিক ও পারিবারিকভাবে লালন-পালন করা হচ্ছে ৮৭ হাজার ২২৭টি গবাদি পশু। এরমধ্যে ৬৯ হাজার ৩৬০টি গরু, ১ হাজার ৬৬৭টি মহিষ এবং ১৩ হাজার ২৪৩টি ছাগল ও ৩ হাজার ১৪৭টি ভেড়া প্রস্তুত রয়েছে। গত বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ৮৭ হাজার ২০০টি। তারমধ্যে বাণিজ্যিক ও পারিবারিকভাবে লালন-পালন করা হয় ৯০ হাজার ২৫০টি গবাদি পশু।

1000137584

খামারিরা জানান, দেশি জাতের গরু ও ছাগলের চাহিদা বেশি। ফুলগাজীর খামারি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘এবার মাঝারি ও বড় আকারের গরু বেশি এসেছে। দেশি গরুর গুণগত মান ভালো, তবে খাদ্যের দাম বাড়ায় লালনপালনের খরচ বেড়েছে।’

খামারিরা জানান, গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সোনাগাজীর কৃষক শাহাদাত মিয়া বলেন, তিনটি গরু প্রস্তুত করেছি। খরচ বেশি হওয়ায় লাভ ছাড়া বিক্রি সম্ভব নয়। পাচগাছিয়ার ব্যবসায়ীরা রফিকুল হক বলছেন, ক্রেতারা মানসম্পন্ন পশু চাইলেও দাম নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। বাড়িতে লালিত গরুর চাহিদা বেশি, তবে ক্রেতারা দাম কমাতে চা।

ক্রেতারা দাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। আব্দুল মান্নান নামে একজন বলেন, মাঝারি গরুর দাম ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। গত বছরের তুলনায় দাম ১৫-২০ শতাংশ বেশি। তবে কেউ কেউ মনে করেন, গুণগত মান বিবেচনায় দাম যুক্তিসংগত।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাবে, গড়ে প্রতিটি গরুর দাম ৮০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ছাগলের দাম ১৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে। সে হিসেবে এবার কুমিল্লার হাটে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার পশু বেচাকেনা হতে পারে।

মদিনা এগ্রো ফার্মের ম্যানেজার মাহমুদুল হাসান সাব্বির বলেন, খামারে এসে ক্রেতারা গরু কেনা শুরু করেছে। অনেকে আগে এসেই পশু কিনে রাখছে। যা কোরবানির আগের দিন পর্যন্ত খামারে রাখতে পারবেন। এছাড়া ক্রেতা চাইলে খামারে এসে লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে গরুর দৈহিক ওজন মেপেও গরু কিনতে পারছেন। 

এদিকে হাটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি হাটে বর্জ্য অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্থান, মোবাইল ক্লিনিং টিম এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলবে। জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য অপসারণে বিশেষ টিম কাজ করবে। হাট শেষে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা পরিষ্কার করার জন্য বলা হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ফেনীতে এবার কোরবানির পশু সংকটের শঙ্কা নেই। জেলায় অন্তত ৫ হাজার তালিকাভুক্ত খামারির বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে এক বা একাধিক কোরবানির পশু লালন-পালন করছেন। আসন্ন কোরবানি উপলক্ষে পেশাদার ও মৌসুমি কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে অবহিতকরণ কার্যক্রম করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।’

পুলিশ সুপার বলেন কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে সকল প্রকার চাঁদাবাজি ও মারামারি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জেলা পুলিশের পক্ষ-থেকে গ্রহণ করা হবে। কোনো গুজব বা অন্য কোনোভাবে যেন কোরবানির পশুর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করা হয় সে ব্যাপারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হবে। পশু বহনকারী গাড়িতে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, পশুর হাটে পকেটমার, মলম পার্টিসহ ছিনতাই কারীদের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে জেলা পুলিশ গ্রহণ করছে।

ফেনীর ৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে যেন কোনো গরু না আসে সেজন্য সীমান্তে বিজিবি সচেষ্ট রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উল্লেখ্য, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে ফেনীর বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অবৈধপথে ভারত থেকে আসা ১২৩টি গরু আটক করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ফেনী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত বছরের ভয়াবহ বন্যায়  ফেনীর ৬টি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি ইউনিয়নে ৩৮ হাজার ৭৩১টি গরু, ১২৯টি মহিষ, ১৫ হাজার ৬০৪টি ছাগল ও ৩৫৬টি ভেড়া মারা গেছে। ২৯ লাখ ১৩ হাজার ৩১৩টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়াও এক হাজার ৯৯২টি গবাদিপশুর খামারের ১৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার এবং এক হাজার ৬২৩টি হাঁস-মুরগির খামারের ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ফেনীতে ৩৯৬ কোটি ৯ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকার প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে।