‘প্রায় দেড় দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় এবারই প্রথম বাফুফেতে ঢুকতে হলো পেছনের গেট দিয়ে’, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ভবনের সবুজ ঘাসে ছাওয়া লনে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলছিলেন একজন সাংবাদিক। সদর দরজা দিয়ে ঢোকার উপায় নেই, সেখানে চলছে ‘বাংলাদেশ আলট্রাস’দের অবরোধ। ১০ জুন বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ম্যাচের হাজার তিনেক টিকিটের দাবি তাদের, বাফুফে নাকি ১০০ টিকিট দিতে রাজি হয়েছে। তাই দেশের চলমান ধারা অনুযায়ী অবস্থান ধর্মঘট এবং আন্দোলন।
তার আগে আজ জাতীয় স্টেডিয়ামে ভুটানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। ফিফার র্যাংকিংয়ের ১৮২ এবং ১৮৩ নম্বর দল মুখোমুখি হলে ৯০ মিনিট জুড়ে খুব উঁচু মানের ফুটবলের প্রদর্শনী যে দেখা যাবে না, সেটা জানা কথা। দুই দলে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসি বর্গেরও কেউ নেই যাকে খেলতে দেখার জন্য লোকে হন্যে হয়ে ছুটে আসবে। তারপরও এই ম্যাচের টিকিট নিয়েও মানুষের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। কারণ বাংলাদেশের মানুষই দেখতে চাচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবল ম্যাচ। বিশেষ করে তরুণরা। যাদের একটা সময় নির্ঘুম রাত কেটেছে বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ-ম্যানচেস্টার সিটির খেলা দেখে, পছন্দের পোশাক হয়ে উঠেছিল প্রিয় ফুটবল দলের জার্সি; তারাই এখন দেখতে চাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবল দলের খেলা।
একটা সময় ফুটবলই ছিল বাংলাদেশের প্রধান খেলা। আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথে বিভক্ত হতো গোটা দেশ। কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না, আসলাম, সাব্বিররা ছিলেন মহাতারকা। ক্লাব রাজনীতি, পাতানো ম্যাচ আর তারকার অভাবে ক্রমশ মলিন হয়ে আসা ফুটবল হঠাৎ করেই সিংহাসন হারিয়ে ফেলল ক্রিকেটের কাছে। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগটাই বদলে দিল দেশের প্রধান খেলা। পরের দুই দশক ধরে ক্রিকেটই হয়ে উঠেছিল লাল-সবুজের বৈশ্বিক পরিচয়, ফুটবল তখন দুখিনী দুয়োরাসী।
২৭ বছর পর হারানো সুসময় কি ফিরে পাবে ফুটবল? এমন নয় যে এই তিন দশকে বাংলাদেশ ফুটবলে উন্নতি করেছে অনেক, হারিয়ে দিচ্ছে বড় বড় দলকে। এমন কিছুই হয়নি, বরং যে ভুটানের বিপক্ষে আজ ম্যাচ তাদের কাছে সেপ্টেম্বরেও হেরেছে ১-০ গোলে। ২০১৬ সালের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে ভুটানের কাছে হারের পর বছর দেড়েক আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাইরে থাকতে হয় বাংলাদেশকে। এরপরও বাংলাদেশের ফুটবলে রেনেসাঁর সুর, সেটা দেশের অর্থনীতির মতোই, অর্থাৎ প্রবাসীদের কল্যাণে।
জামাল ভূঁইয়া, তারিক কাজির মতো বিদেশে জন্ম নেওয়া বেশ কয়েকজন লম্বা সময় ধরেই খেলছেন বাংলাদেশের জার্সিতে, তাদের আগমন ততটা শোরগোল ফেলতে পারেনি, যতটা পেরেছে হামজার বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক। হামজার দেখানো পথে কানাডা থেকে উড়ে আসছেন আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি। কানাডার অ্যাডমন্টনে, বাংলাদেশি বাবা-মার ঘরে জন্ম নেওয়া শমিত সোম কানাডার জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন দুটো ম্যাচ। শমিত সোমও চলে আসবেন আজ। ইতালির স্পেজিয়া ও সাম্পদোরিয়ার মতো ক্লাবের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা ফাহামিদুল ইসলামও চলে এসেছেন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে। আসবেন সান্ডারল্যান্ড ও বার্মিংহামের হয়ে খেলা মিডফিল্ডার কিউবা মিচেলও।
ক্রিকেটারদের খেলতে খেলতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে যাওয়া, অন্তঃকোন্দল, সমর্থকদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ এবং সার্বিকভাবে খারাপ ফলের কারণে ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই খেলা থেকে। দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচে দর্শক হচ্ছে হাতেগোনা। প্রবাসীরা অনেক আশা নিয়ে মাঠে গিয়ে ফিরছেন হতাশা নিয়ে। আরব আমিরাত ও পাকিস্তান সফর শেষে লিটন দাশ, মেহেদী হাসান মিরাজরা যখন ফিরলেন; তখন বিমানবন্দরে তাদের সাফাই শুনতে নেই কোনো গণমাধ্যম।
মিরপুর থেকে মতিঝিল, মেট্রোরেলে মিনিট বিশেকের যাত্রা হলেও ক্রীড়া সাংবাদিকদের একটা বড় অংশই এমুখো হননি দীর্ঘদিন। তাদের অনেকেই এখন এই পথের নিয়মিত যাত্রী। মঙ্গলবার বাফুফের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা। সাংবাদিকদের বসতে হয়েছে মেঝেতে। এই দৃশ্য মুঠোফোনে ক্যামেরায় বন্দি করে রেখেছেন ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া আর ভুটানের জাপানি কোচ আতসুশি নাকামুরাও।
বেনো জলে ভেসে আসা কচুরিপানার মতো ফুটবলের ঊর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভিউ বাণিজ্যের ফায়দা লুটতে এখন ফুটবল আঙিনায় ভিড় বেড়েছে ইউটিউবারদেরও। একটা সময় ক্রিকেটারদের গাড়ি, স্ত্রী, পুত্রের ভিডিও করে রিলস বানিয়ে দেদার ডলার কামিয়ে নেওয়াদের নিশানায় এখন হামজা-ফাহামিদুলরা। হামজা অনুশীলন শেষ করে বাসে উঠছেন, এই দৃশ্য ধারণের জন্যই শ’খানেক মুঠোফোনের জটলা!
ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল বিশ্বকাপের দরজা খুলে যাওয়া। ফুটবল রেনেসাঁর অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে মানসম্মত প্রবাসী ফুটবলারদের বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ, যেটা আরও বেড়েছে হামজার আগমনে। বাড়ছে দর্শকের আগ্রহ, বাড়ছে পৃষ্ঠপোষকদের আগ্রহও। এই হাওয়া ফুটবলকে নেবে কতদূরে? হামজা, শমিত, ফাহমিদুল, মিচেলদের দলে নিয়ে অন্তত সাফ পর্যায়ে একটা শিরোপা তো প্রত্যাশা করতেই পারে বাংলাদেশ। তখন হয়তো পুরোদস্তুর দিনবদলের হাওয়াটা টের পাওয়া যাবে। আর জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রত্যাশার পারদ যদি মাঠের খেলায় না মেলে, তখন মৌসুমি সমর্থক আর পৃষ্ঠপোষকরাও মিলিয়ে যাবেন মৌসুমি হাওয়ার মতোই।