বিগত সরকার পতনের পেছনে সুপ্ত একটি কারণ হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা। এ ছাড়াও দ্রব্যমূল্যের দামের ঊর্ধ্বগতি, দেশে প্রথমবারের মতো দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থা, ডলারের বাজারে অচলাবস্থার কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণপত্র খুলতে না পারা, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার, রিজার্ভ দ্রুত গতিতে কমে যাওয়া, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সক্ষমতার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব, বিনিয়োগ অস্থিরতাসহ নানাবিধ কারণে দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারায় অবস্থান করছিল। ফলে এক চাপা আতঙ্ক কাজ করছিল যার বহিঃপ্রকাশ জুলাই অভ্যুত্থান। অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সুফল নিকট ভবিষ্যতে দেখতে না পেলেও অদূর ভবিষ্যতে দেখতে পাওয়া যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
গত ৫ আগস্ট ২০২৪, বিগত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় দেশের ব্যাংক খাত এতটাই নাজুক ছিল যে, প্রতিনিয়ত টাকা ছাপিয়ে কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট মিটানো হতো। অপরদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকাগুলো বিদেশে পাচার হতো। ফলে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকাতে দাঁড়ায়। এতে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ক্রমেই নুয়ে পড়ছিল। তবুও সরকারের দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ ছিল না। দেশে রিজার্ভ বৃদ্ধির পরিবর্তে দ্রুতই কমতে থাকে এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রিজার্ভ দাঁড়ায় ২০.৩৯ বিলিয়ন ডলারে। ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত কয়লা ও গ্যাসের মূল্য ঠিকমতো পরিশোধ সম্ভব ছিল না। বিগত সময়ে এ কারণেই দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছিল মানুষ। শেয়ারবাজার এতটাই নাজুক ছিল যে, মানুষ প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকৃত মূলধন হারাচ্ছিল। এমন অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। অপরদিকে অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প ও উচ্চভিলাষী বাজেট প্রণয়ন করেছিল বিগত সরকার। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০৩.৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় (দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড, এপ্রিল ১১, ২০২৫)। অর্থনীতি ধ্বংসের আরও একটি কারণ রাজনৈতিক সরকার প্রয়োজনবোধে কখনো মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করেনি। বিপরীত দিকে মুদ্রাস্ফীতি অনেক সুবিধা থাকলেও বড় একটি অসুবিধা হলো দ্রব্যমূল্যের দাম ঊর্ধ্বগতি হয় এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। দলীয় সরকারের জবাবদিহি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ফলে কখনোই মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করে না।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংকালে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘অর্থনীতি একেবারে লাইনচ্যুত হয়ে যায়নি, মন্থর হয়েছে ও গতি হারিয়েছে। আমরা গতি বৃদ্ধি করব। সুবিধা হলো বাংলাদেশের মানুষের অফুরন্ত কর্মস্পৃহা আছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিবৃদ্ধির জন্য সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে।’ তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলেছিলেন কারণ তিনি যদি বলতেন অর্থনীতি লাইনচ্যুত হয়েছে তাহলে মানুষ ব্যাংক থেকে হুমড়ি খেয়ে টাকা তুলত। ফলে দেশের অর্থনীতি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। দেশের বেসামাল অর্থনীতিকে সামাল দেওয়া কঠিন হতো। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার। এছাডাও স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী রয়েছে, যাদের কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে, দেশ ঘুরে দাঁড়াবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দেশে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঘুরে না দাঁড়িয়ে খাদের কিনারায় চলে যাওয়াটা অবশ্যই হতাশার। দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে উত্তরণের জন্য যে সমস্ত চ্যালেঞ্জ নিতে হবে তা হলো : এক. দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে অবশ্যই দেশের জিডিপিতে নজর দিতে হবে। কারণ জিডিপি একটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনকে নির্দেশ করে। জিডিপির ওপর ভিত্তি করেই অর্থনীতিতে অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যদিও অর্থনীতিবিদরা জিডিপিকে ‘কালো বক্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবুও জিডিপি ছাড়া একটি দেশের অর্থনীতি চিন্তা করা যায় না। দেশের জিডিপিতে প্রধান তিনটি খাত হলো সেবা, শিল্প ও কৃষি। যেখানে সেবা খাতে ৫৫.১৮ শতাংশ, শিল্প খাতে ৩৫.২৭ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ১১.৫৫ শতাংশর অবদান। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ। একটি সময় কৃষির অবদান শীর্ষে ছিল। তাহলে কৃষির অবদান এতটা কম হলো কেন? বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে আরও বেশি নজর দিতে হবে কৃষি খাতে। কারণ কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষিকে পাশ কাটিয়ে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে না। কৃষির আধুনিকায়নসহ কৃষি যন্ত্রাংশে ভর্তুকিসহ আরও সহজলভ্য করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কারণ কৃষির সুষম বিন্যাস হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে। দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের সবচেয়ে অবদান রাখা খাতটি হলো তৈরি পোশাক খাত। তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমাদের আমদানি করতে হয় অথচ বাংলাদেশর কৃষি জমিগুলোকে বিশেষত অনুর্বর জমিগুলোকে তুলা চাষে উপযোগী করা হলে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার করা যেত। পুরোটা না হলেও আংশিকভাবে আমদানি নির্ভরতা কমানো যেত। একটি সময় যে খাতটি জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখত আজ সেই খাতটি তুলনামূলক কম অবদান রাখছে। তাই সরকারের উচিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে সুষম জিডিপি উন্নয়ন ঘটানো। তবে হয়তো আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো সম্ভব। যার দৃষ্টান্ত চীনে আম রপ্তানি, নেপাল ও ভুটানে আলু রপ্তানি। দুই. উপযুক্ত মুদ্রানীতি লাইনচ্যুত অর্থনীতিকে সঠিক পথে ঘোরানোর উত্তম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এই সরকার যেহেতু বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাই খুব সহজে মুদ্রা সংকোচের নীতি গ্রহণ করেছে। এছাড়া উপায়ও ছিল না। যার ফলে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হচ্ছে, দেশে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, ব্যাংক সুদহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপরীত দিকে দ্রব্যমূল্যের দাম স্থিতিশীল হচ্ছে যা বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে। যার সুফল পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার ভোগ করবে এটাই স্বাভাবিক। এটি একটি উপযুক্ত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। তিন. বিনিয়োগে বর্তমান সরকার অনেক বেশি মনোযোগী হলেও এ খাতটিতে তেমন সাফল্য লক্ষ করা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের চেষ্টার কমতি আছে বলেও মনে হয় না। তথাপি খাতটিতে দৃশ্যত কোনো উন্নয়ন লক্ষ করা যায়নি। এর দুটি কারণ প্রথমত বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রথম ও প্রধান শর্তই হলো দেশীয় বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করা, দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে এবং দেশীয় বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত হলেই কেবল বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। দেশীয় বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে, অবশ্যই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে তেল-গ্যাসের সংকট যেমন রয়েছে তেমন রাজনৈতিক অস্থিরতাও চরমে। দ্বিতীয়ত সব বিনিয়োগকারী ভাবছেন, এই সরকার তো অল্প কিছুদিনের জন্য অতএব আর কিছুদিন দেখে-বুঝে তারপর বিনিয়োগ করব।
ব্যাপক চেষ্টা করেও গত ৭ এপ্রিল ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট’ শিরোনামে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। কারণ একটাই বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। অপর দিকে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে ঠিক ওই সময় কী করা হলো বাটা, কেএফসি’র মতো প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট করা হলো। চার. বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি সাফল্য হলো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করে ৩৭০ কোটি ডলার, এছাড়াও রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে ২৮ বিলিয়নে উন্নীত হয়। অন্যতম কারণ হলো রেমিট্যান্স বৈধ চ্যানেলে প্রবেশ করা ও সরকারের প্রতি প্রবাসী শ্রমিকদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তবে এতে খুশি হওয়ার মতো কিছু নয়। কারণ দেশে এখন কোনো রাজনৈতিক সরকার বিদ্যমান নেই, দেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার বা সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে বিদেশে অর্থ পাচার করবে এমনটা নয়। অর্থাৎ চাইলেও হুন্ডি এখানে তার দৌরাত্ম্য দেখাতে পারছে না। কারণ যারা অর্থ পাচার করবে তারাই তো নেই, তবুও যে বিষয়টি থেমে আছে তাও নয়। হুন্ডি তার গতিতেই চলছে শুধু গতি মন্থর। এটিকে বন্ধ বা রোধ করার এখনই সময়। পাঁচ, বর্তমান সরকারের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো, আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের শুল্কের প্রভাব যা ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নীতি গ্রহণে সারা বিশ্বে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ হলে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অগ্রাধিকারমূলক ও শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, তা আর পাবে না। এলডিসি হিসেবে দাতা দেশগুলো থেকে যে সহজ শর্তে ঋণ পায়, তাও বন্ধ হবে। প্রযুক্তি খাতে উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের প্রদত্ত বিভিন্ন সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান বন্ধ হবে। ওষুধ খাতে বড় একটি প্রভাব পড়বে। এতে বাংলাদেশ ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব কেনা ছাড়াই ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশকে প্রতিটি ওষুধ উৎপাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট ফর্মুলার মেধাস্বত্ব কিনে নিতে হবে। যার প্রভাব রপ্তানি বাজারেও পড়বে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো ঠিকঠাকমতো করতে পারলে বিপুল জনসংখ্যার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।
লেখক: ব্যাংকার ও লেখক
aktarrofikul@gmail.com