টেস্ট ফাইনালে চোকার্স অপবাদ ঘুচবে কি প্রোটিয়াদের

ক্রিকেটের সংস্করণ যত ছোট হয়ে আসছে, ততই কদর কমছে টেস্ট ক্রিকেটের। পাঁচ দিনের খেলা বলে তেমন একটা দেখা যায় না দর্শক মহলে। তবে অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের দর্শকদের কাছে সাদা পোশাকের ক্রিকেট মানেই অন্যরকম একটা রোমাঞ্চ। হাল জামানায় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ সেখানে নতুন মাত্রা যেন যোগ করেছে। আজ থেকে লর্ডসে শুরু হচ্ছে ক্রিকেটে অভিজাত সংস্করণের চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। যেখানে ক্রিকেটের প্রাচীনতম ও সফল দল অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হচ্ছে ‘চোকার্স’ হিসেবে খ্যাত দক্ষিণ আফ্রিকা।

টুর্নামেন্টের এটা তৃতীয় আসরের ফাইনাল হতে যাচ্ছে। প্রথম দুই আসরের ফাইনালিস্ট ছিল ভারত। তবে তারা একবারও শিরোপার স্বাদ নিতে পারেনি। প্রথমবার নিউজিল্যান্ডের কাছে ও পরেরবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে যায় তারা। এবারের আসরে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনাল খেলছে অজিরা। আর প্রথমবার ফাইনালে উঠেছে প্রোটিয়ারা।

পরিসংখ্যানের কথা মাথায় নিলে অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্স চ্যাম্পিয়ন ভেবে নিতেই পারেন। কারণ অতীত বলে গত ২৭ বছরে প্রোটিয়ারা কখনই শিরোপা জেতেনি ক্রিকেটের কোনো সংস্করণে। সবশেষ গত বছরে তারা ফাইনালে উঠেছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের। কিন্তু ভারতের কাছে হেরে স্বপ্ন ভাঙে হেইনরিখ ক্লাসেনদের। ১৯৯৮ সালে আইসিসি ট্রফি (বর্তমানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) জয়ের পর আর কোনো শিরোপার স্বাদ তারা পায়নি। হয় সেমিফাইনাল নয়তো শেষ আটেই থেমে গেছে তাদের যাত্রা। যে কারণে তাদের বলা হয় ক্রিকেটের ‘চোকার্স’। এবার তাদের সামনে সুযোগ সেই অপবাদ ঘোচানোর। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ঘরে তোলার। যদিও কাজটা সহজ হবে না। কারণ প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া।

যে দলটি গত শতাব্দীর শেষ থেকে এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল দল। ১৯৯৯ সাল থেকে গত ২৬ বছরে তিন ফরম্যাটের বৈশ্বিক আসর মিলিয়ে মোট ৯টি শিরোপা জিতেছে তাসমান সাগর পাড়ের দেশটি। সবশেষ ২০২৩ সালে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসরের শিরোপাও জিতেছে তারা। এবার তাদের সামনে সুযোগ আরও একবার টুর্নামেন্টের মুকুট মাথায় তোলার।

তবে সেই ম্যাচে তৃতীয় আরেকজন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেটা বৃষ্টি। ফাইনালে লর্ডসে বৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টেস্টের পাঁচ দিনই আকাশ মেঘলা থাকবে। দ্বিতীয় দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। বাকি চার দিনও বৃষ্টি হতে পারে। পাঁচ দিনের এই ম্যাচ যদি ভেস্তে যায়, বা ড্র হয় তা হলে কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে? তার জন্য আলাদা নিয়ম রয়েছে আইসিসির।

বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এক দিন রিজার্ভ ডে থাকে। অর্থাৎ, নির্ধারিত পাঁচ দিনে ওভার নষ্ট হলে সেই ওভার ষষ্ঠ দিনে শেষ করার চেষ্টা করা হয়। ২০২১ সালের ফাইনালে বৃষ্টিতে প্রথম দিনের খেলা ভেস্তে গিয়েছিল। ফলে ভারত-নিউজিল্যান্ড ফাইনাল শেষ হয়েছিল রিজার্ভ দিনে। ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নিউজিল্যান্ড।

এবারের ফাইনালও যদি ভেস্তে যায় বা খেলা ড্র অথবা টাই হয় তাহলে দু’দলকেই যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রুপ পর্বে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকার সুবিধা কোনো দল পায় না। যেহেতু সব দেশ একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলে না এবং সিরিজ ও টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা সমান হয় না তাই ফাইনালে কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয় না।

টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৮ বছরের ইতিহাসে দুই দল ১০১ বার মুখোমুখি হয়েছে। শেষ পাঁচ বছরে তারা মাত্র এক সিরিজে অংশ নিয়েছে২০২২-২৩ মৌসুমে তিন ম্যাচের সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ২-০ ব্যবধানে জয়ী হয়। এর আগে ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে। তবে ২০১৬-১৭ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া বাড়িতে ২-১ ব্যবধানে জয় পায়। গত এক দশকে দুই দলের মুখোমুখিতে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা এগিয়ে থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকার গোলাবারুদ এবার ভিন্ন।

দ্বিতীয় আসরের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া এবারও ফেভারিট। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা এবারের চক্রে ১২ টেস্টে ৬৯.৪৪ শতাংশ% পয়েন্ট নিয়ে টেবিল টপ করেছে, অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ১৯ ম্যাচে ৬৭.৫৪%। প্রোটিয়াদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ‘চোকার্স’ অপবাদ থেকে মুক্তি। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল থেকে শুরু করে নানা ইভেন্টে চাপে ভেঙে পড়ার ইতিহাস আছে তাদের।

লর্ডসে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের হার ৪৫% (৪০ টেস্টে মাত্র ৭ হার)। স্টিভ স্মিথ এ মাঠে ৫৮.৩৩ গড়ে ৫২৫ রান করেছেন, ব্র্যাডম্যানকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী হতে মাত্র ১৭ রান দরকার তার। দক্ষিণ আফ্রিকা গত সাত টেস্টে টানা জয় নিয়ে ফাইনালে এলেও তাদের বিপক্ষে ছিল দুর্বল দল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান)। এবারই প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ অস্ট্রেলিয়া। কাগিসো রাবাদা (৪৭ উইকেট, গড় ১৯.৯৭) ও মার্কো ইয়ানসেনের মুখোমুখি হবে স্মিথ-লাবুশেন-হেডের মতো ব্যাটাররা। অস্ট্রেলিয়ার পেস ট্রিও (কামিন্স, স্টার্ক, হ্যাজলউড/বোল্যান্ড) দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংকে চাপে রাখবে।

উসমান খাজা (১,৪২২ রান), স্মিথ (৫ সেঞ্চুরি) ও ট্র্যাভিস হেড (গত ফাইনালের ম্যাচজয়ী ১৬৩) ফর্মে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং নির্ভর করবে এইডেন মার্কাম ও কাইল ভেরেইনের ওপর।