হারে বাস্তবে ফেরা বাংলাদেশের

ভুটানকে ২-০ তে হারানোর পর বাংলাদেশ চারটি সেশনে প্রস্তুতি নিয়েছিল সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের। যার দুটি হয়েছে ক্লোজড ডোর। এছাড়া বাকি দুটি সেশন মিডিয়ার জন্য উন্মুক্ত ছিল শুরুর ১৫ মিনিট করে। খুব বোঝা গেছে মিডিয়া মারফত নিজের কৌশল প্রতিপক্ষ দলের হাতে পৌঁছতে দিতে চাননি বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। এটুকু কোচ করতেই পারেন। সে অধিকার তার আছে। তবে শেষ পাঁচদিনে দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই ফুটবলারকে যেভাবে বাণিজ্যিক পণ্য হতে দিয়েছিলেন তিনি, তাতে তার পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। ঈদের আমেজে দিব্যি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম মেতে উঠেছিল হামজা চৌধুরী ও শামিত সোমকে নিয়ে। দুই সেরা অস্ত্রকে বারবার মিডিয়ার হাতে তুলে দিতে বাধেনি কাবরেরার। ম্যাচের আগে কোচের এমন আচরণ যেমন প্রশ্ন জাগিয়েছে, ম্যাচেও তার একাদশ নির্বাচন বরাবরের মতোই উসকে দিয়েছে বিতর্ক। আর এ সব কিছুর সম্মিলনে নিজ আঙিনায় বাংলাদেশের খেলায় মন ভরেনি। সিঙ্গাপুরের কাছে হারটা আসলে কাবরেরার দলকে ফিরিয়েছে বাস্তবে।

কাবরেরার সামর্থ্য নিয়ে তার বাংলাদেশ অধ্যায়ের শুরু থেকেই ছিল প্রশ্ন। বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কখনো বড় কোনো দলের মূল কোচের দায়িত্বে ছিলেন না। বিগত কমিটি কাবরেরায় আস্থা রাখেন ব্রিটিশ কোচ জেমি ডে-কে বিদায় করে। কাবরেরা দায়িত্ব নিয়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন ঠিক, তবে তার দল ও একাদশ নির্বাচন বরাবরই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ঘরের মাঠে যেখানে জয়টাই পরম প্রার্থিত, সেই ম্যাচে আক্রমণভাগে দলের অন্যতম অস্ত্র রাকিব হোসেনকে কাবরেরা খেলাননি তার পছন্দের রাইট উইং পজিশনে। বরং তাকে ফলস নাইন পজিশনে পাঠিয়ে রাইট উইংয়ে শুরু করান সৈয়দ শাহ কাজেমকে দিয়ে। ক্যারিয়ারে খুব অল্প সময় এই পজিশনে খেলেছেন কাজেম। ঘরোয়া ফুটবলেও তাকে খুব একটা উইংয়ে খেলতে দেখা যায়নি। অথচ কাবরেরা তাকে খেলিয়ে দেন রাকিবের প্রিয় জায়গায়। এমন যথারীতি সিঙ্গাপুরের মতো দলের বিপক্ষে কিছুই করতে পারেননি কাজেম। সেন্টারব্যাক পজিশনে তিনি তপু বর্মণের সঙ্গে খেলিয়েছিলেন তারেক কাজীকে। অথচ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাধিক চোটের কারণে পুরোপুরি ম্যাচ ফিট ছিলেন না তারেক কাজী। তারপরও কোচ তাকে বসানোর সিদ্ধান্ত নেননি। উল্টো খেলিয়েছেন পুরো ম্যাচ। আর আগের ম্যাচে অভিষিক্ত তাজ উদ্দিন লেফটব্যাক পজিশনে ভালো খেললেও তাকে বসিয়ে সেখানে খেলানো হয় শাকিল আহাদ তপুকে। যে তরুণ মোহামেডানের সেন্টারব্যাক হিসেবে এ মৌসুমে নজর কেড়েছিলেন।

কোচের একাদশ নির্বাচন দেখে মনে হয়েছে, তিনি পিপলস চয়েজকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এই ম্যাচে। গত কয়েক মাস ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত সমর্থকরা প্রবাসী নির্ভর বাংলাদেশ দলের দাবি জানিয়ে এসেছে। কাবরেরাও যেন সে পথেই হেঁটে খেলিয়ে দেন পাঁচ প্রবাসীকে। শামিত সোমকে পুরো ম্যাচ তিনি মাঠে রাখেন। শুরুর দিকের দু-তিনটা অ্যাসিস্টে শামিত নিজেকে আলাদা করে চেনালেও বাকিটা সময় তিনি ছিলেন ছায়া হয়ে। বোঝাই গেছে, বাংলাদেশের অপরিচিত কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে পুরো ম্যাচ খেলার মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। অথচ তাকে তুলে নেওয়ার সাহসটুকু দেখাননি কোচ। তার জায়গায় তিনি আগের ম্যাচেই গোল করা সোহেল রানা অথবা নিয়মিত অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকে খেলিয়ে দেখতে পারতেন।

এই ম্যাচ ঘিরে হাজারো দর্শক-সমর্থকের মতো অনেক আশা ছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদেরও। যদিও মাঠের খেলার চেয়ে ম্যাচ আয়োজনে তাদের বেশি আগ্রহ ছিল। ম্যাচের টিকিট নিয়ে নানা নয়-ছয়ের অভিযোগও উঠেছে বিচ্ছিন্নভাবে। মৌসুমি দর্শকদের মাঠে আসার সুযোগ করে দিতে তারা পোড় খাওয়া সমর্থকদের হাতে পৌঁছে দেননি টিকিট। তারপরও সামগ্রিকভাবে বাফুফের আয়োজনকে ব্যর্থ বলার সুযোগ নেই। এত কিছুর পর যখন কোচের ভুলে এবং ফুটবলারদের শতভাগ মনোযোগের ঘাটতিতে দল হেরে যায়, তখন তো এই বাফুফে কর্তাদেরই নিতে হবে কঠোর সিদ্ধান্ত।

বারবার ‘বাই’ পাওয়া কাবরেরা কি এবারও পার পেয়ে যাবেন? তাবিথ প্রশাসন তার ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার।