তিন বছর বয়সে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে ছোঁয়া মনি (৭)। এখন বড় হচ্ছে তার মায়ের আপন খালা অর্থাৎ নানির কাছে। দুবেলা দুমুঠো খেয়ে কোনোরকমে জীবন চলে যাচ্ছে ছোঁয়া ও তার নানির। থাকেন মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিম পৌরসভার মুসলিমনগর তিলার্দিচর এলাকায়। ছোঁয়া মনির মতো একই এলাকার বোন রাবেয়া বশরী (১০) ও ভাই মোহাম্মদের (৬) মা-বাবা নেই। একটি ডালের মিলে কাজ করে এ দুই ভাই-বোনের মুখে আহার তুলে দিচ্ছেন তাদের দাদি। ছোঁয়া, রাবেয়া ও মোহাম্মদের যেখানে খাবার জোটে না, সেখানে পড়াশোনা তো বিলাসিতা। তবে এমনই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করে যাচ্ছে স্বপ্নজয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।
জেলা সদরের মিরকাদিমের তিলার্দিচর এলাকায় একটি পাঠশালা খুলেছে ফাউন্ডেশনটি। নাম স্বপ্নজয়ী পাঠশালা। ওই পাঠশালায় পড়াশোনা করছে সেখানকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১ জুন মুসলিমনগর তিলার্দিচর এলাকায় স্বপ্নজয়ী পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে স্বপ্নজয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। ওই সময় ১৭ শিশুকে নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪০-এ দাঁড়িয়েছে। ফাউন্ডেশনটি মুন্সীগঞ্জসহ দেশের আটটি জেলায় প্রতিষ্ঠা করেছে এমন পাঠশালা। মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, রাজবাড়ী, মাধবপুর ও গাজীপুরে রয়েছে স্বপ্নজয়ী পাঠশালা। ফাউন্ডেশনটি পরিচালিত হচ্ছে বাগেরহাট জেলা থেকে। মুন্সীগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত এ পাঠশালার প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বই, খাতা, পেনসিল, ব্যাগ, রাবার ফাউন্ডেশন থেকেই সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
তিলার্দিচর এলাকার পাঠশালাটি পরিচালনায় রয়েছেন কামরুজ্জামান কামাল। সেখানে পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা। এদের মধ্যে ২ জন কলেজ পড়–য়া। এদের একজন মো. আসিফ মিরকাদিমের হাজি আমজাদ আলী ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অপরজন পাঠশালার সহকারী শিক্ষক আফিয়া আক্তার একটি কলেজে পড়াশোনা করেন। বাকি ২ শিক্ষকের মধ্যে সাদিয়া আক্তার প্রজ্ঞা একজন গৃহিণী। আরেক গৃহিণী আসমা বেগম এখানে পড়ান আরবি বিষয়।
পাঠশালার শিক্ষক মো. আসিফ জানান, স্থানীয় একটি বেদে পরিবারের ১০ বছরের শিশুসন্তান বাক-প্রতিবন্ধী মো. আব্দুল্লাহ পড়াশোনা করছে এ পাঠশালায়। তার বাবা তালা-চাবি মেরামত করে সংসার চালান। তার মা ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করেন। স্থানীয় শিশু মো. আসিফের বাবা তার মাকে ছেড়ে চলে গেছেন। তার মা প্রতিবন্ধী। এমন অবস্থায় শিশু আসিফ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এ পাঠশালা গড়ে ওঠায় পড়াশোনার সুযোগ হয়েছে শিশু আব্দুল্লাহ ও আসিফের।
প্রধান শিক্ষক সাদিয়া আক্তার প্রজ্ঞা জানান, একটি টিনের ঘরে ৪০ সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে পাঠদান করা হচ্ছে। শুধুমাত্র শিশু ও প্রথম শ্রেণির কার্যক্রম চলছে। এ পাঠশালার কোনো শিক্ষক বেতন নেন না। নিজের তাগিদে সুবিধাবঞ্চিতদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি তিলার্দিচর গ্রামেরই বউ। তার এক ছেলে রয়েছে। তার ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার ছেলেও এ পাঠশালার প্রথম শ্রেণির ছাত্র।