জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসের ভেতরে সড়ক ও খেলার মাঠসহ বিভিন্ন অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে উচ্চক্ষমতার বাতি ও হ্যালোজেন বসিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সূর্য ডোবার পর থেকে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত এসব বাতি জ্বালানো থাকে। কৃত্রিম এসব আলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও শিয়ালসহ অন প্রাণীদের খাবার সংগ্রহ, প্রজনন ও ঘুম ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রাণী গবেষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসন বলছে, ক্যাম্পাসের ভেতরে চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন প্রতিরোধসহ সার্বিক নিরাপত্তায় এমন আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবেশের দূষণের বিষয়টিও আমলে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনায় প্রকৌশল অফিস কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠসহ বিভিন্ন সড়কে নতুন করে এলইডি বাতি ও হ্যালোজেন লাগিয়েছে। বিভিন্ন হলসংলগ্ন এলাকাতেও হল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব হ্যালোজেন ও বাল্বগুলো ১০০ ও ২০০ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন।
শিক্ষার্থী ও প্রাণী গবেষকরা বলছেন, ওইসব এলাকার গাছপালা ও ও আশপাশের ঝোঁপঝাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী বাস করে। যেসব বাতি ও হ্যালোজেন ব্যবহার করা হয়েছে তা উচ্চমাত্রার। ১০০ ওয়াটের এলইডি বাতির আলোর মাত্রা হয় প্রায় ১৬০০ লুমেন। তীব্র আলোয় বাদুড় ও শিয়ালসহ অন্যান্য নিশাচর প্রাণীর রাতে খাবার সংগ্রহ ব্যাহত হতে পারে। অনেক প্রাণী আলো দেখে এলাকা ত্যাগ করতে পারে। অনেক এলাকায় পাখি ও শিয়ালের আনাগোনা কমেও গিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘তীব্র আলোয় বন্যপ্রাণীদের খাবার সংগ্রহে ও ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। অনেক প্রাণী মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অপ্রয়োজনীয় অতিমাত্রার আলো বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকিস্বরূপ।’
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আরেক অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘১০ লুমেনের বেশি মাত্রার আলো বন্যপ্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর। যেসব বাতি লাগানো হয়েছে তার মাত্রা কতটুকু তা নিয়ে গবেষণা করা জরুরি।’
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদ সিয়াম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশের দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আলোর পরিবর্তে অন্য কোনোভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা বৃদ্ধি করা যায় কি-না তাও ভেবে দেখতে পারে।’
সম্প্রতি ৬ নম্বর ছাত্রহল সংলগ্ন খেলার মাঠের চারপাশে হ্যালোজেন বসিয়েছে হল প্রশাসন। ওই হলের প্রাধ্যক্ষ সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজাউল রকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিবেশের দিকটিও বিবেচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অরিত্র সাত্তার বলেন, ‘৬ নম্বর ছাত্রহলসংলগ্ন মাঠটি কয়েক বছর আগেও ঘাস ও ঝোঁপে পরিপূর্ণ ছিল। বিভিন্ন রকম পরিযায়ী পাখি যেমন সাইবেরিয়া চুনি কণ্ঠ, শিলা ফিদ্দা, ঝাড়-ভরত ইত্যাদি ধরনের পাখি দেখা যেত এই এলাকায়। বাবুই ও মুনিয়া হাজারে হাজারে একত্র হতো ঘাসের দানা গ্রহণ করতে। কালের বিবর্তনে মাঠ হয়ে যাওয়ার পর এখান থেকে অনেক রকম বন্যপ্রাণী হারিয়ে গিয়েছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে নিশাচর প্রাণী যেমন পেঁচা, বাঘডাশ কিংবা শেয়ালের ক্ষেত্রে যেহেতু মাঝেমধ্যে এক স্থান থেকে অন্যত্র যাওয়া-আসা করতে কিংবা মানুষের খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ খেতে দেখা যায়, সেহেতু অতিরিক্ত আলো তাদের স্বাভাবিক গতিবিধির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত আলোর কারণে একদিকে যেমন বিভিন্ন প্রজাতির প্যাঁচার রাতে সমস্যা হতে পারে তেমনি বাড়তে পারে ফিঙ্গে পাখির বিচরণ যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশিদুল আলম বলেন, ‘রাতে আলোর ব্যবহার নিশাচর প্রাণীদের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে চুরি, ছিনতাই ও মাদক সেবন প্রতিরোধের জন্য এই আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।’