ভারতের আহমেদাবাদে ঘটে গেল এক ভয়াবহ বিপর্যয়—আকাশে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই বিধ্বস্ত হলো এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। গন্তব্য ছিল লন্ডন, কিন্তু শুরুতেই সব শেষ। বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের এ বিমানটিতে থাকা ২৪২ জন যাত্রী ও ক্রুর মধ্যে প্রাণে বেঁচেছেন মাত্র একজন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আহমেদাবাদ থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি আছড়ে পড়ে একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ওপর। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এলাকাটি। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও পুলিশের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ২৪০ ছাড়িয়েছে।
দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি রমেশ বিশ্বাসকুমার (৪০), ছিলেন ১১এ সিটে—জরুরি নির্গমন পথের পাশে। হাসপাতালে শুয়ে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’কে তিনি বলেন, "হঠাৎ বিকট শব্দ। চোখ খুলতেই দেখি, চারপাশে শুধু নিথর শরীর। দৌড়ে পালাতে গিয়ে কেউ একজন আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলে।" জানালেন, তার ভাই অজয়ও একই ফ্লাইটে ছিলেন, যার খোঁজ এখনো মেলেনি।
আহমেদাবাদ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিধি চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনার পরপরই ২৯৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। তবে পরে দেখা যায়, অনেক মরদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিভ্রান্তিকরভাবে দ্বিগুণ হিসেবে ধরা হয়েছিল। এখনো নিশ্চিত নয়, কতজন বিমানের যাত্রী আর কতজন মাটিতে থাকা মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
পুলিশ প্রধান জি.এস. মালিক জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে শুধু বিমানের যাত্রীরাই নন, ছাত্রাবাসের বাসিন্দারাও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানির নামও রয়েছে। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর আত্মীয়স্বজনদের ডিএনএ নমুনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সচিব ধনঞ্জয় দ্বিবেদী বলেন, বিমানের বিভিন্ন অংশ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে, লেজ আটকে আছে ছাদে।
দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে উড়ান শুরু করেছিল বিমানটি। এর অল্প পরেই জরুরি সংকেত ‘মে ডে’ পাঠায়, এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিমানটি আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে উড়ছিল, হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যায় স্ক্রিন থেকে। কিছু সময় পর আকাশে জ্বলে ওঠে এক বিশাল আগুনের গোলা।
এক যাত্রী পুনম প্যাটেল জানান, তাঁর ভাবি যাচ্ছিলেন লন্ডন। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে স্থানীয় হাসপাতালে অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে হোস্টেলের এক শিক্ষার্থীর মা রমিলা জানান, ছেলে দুপুরের খাবার খেতে হোস্টেলে ছিলেন, দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচলেও আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ব্রিকহাউস বলেন, উড্ডয়নের সময়ও বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ার খোলা ছিল, যা অস্বাভাবিক। “ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে, বিমানটি যেন উড্ডয়নের চেয়ে অবতরণ করতে যাচ্ছিল।”
ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাম মোহন নাইডু জানান, বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। গঠিত হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি। বোয়িং-এর প্রধান নির্বাহী কেলি অর্টবার্গ জানান, প্যারিস এয়ার শোতে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে তদন্তে সহায়তার জন্য তারা একটি দল পাঠাচ্ছে ভারতে।
এয়ার ইন্ডিয়ার সিইও ক্যাম্পবেল উইলসন বলেন, ‘এই ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তদন্তের জন্য সময় দরকার।’ দুর্ঘটনার পর বোয়িং-এর শেয়ারমূল্য পড়ে গেছে ৫ শতাংশ। জিই অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, ককপিটের তথ্য বিশ্লেষণে তারা একটি দল গঠন করছে।
মার্কিন পরিবহন দপ্তর জানিয়েছে, তারা বোয়িং ও জিই-এর সঙ্গে যৌথভাবে তদন্তে কাজ করছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, তারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে রয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, “এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমি স্তব্ধ। ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।” গুজরাট, তাঁর নিজ রাজ্য, এমন ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সাক্ষী হলো। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার একে বললেন “বিধ্বংসী দৃশ্য।” রাজা চার্লস নিয়মিত আপডেট নিচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে বলেছেন, “ভয়ানক বিপর্যয়”।
২০১১ সালে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর এই প্রথম দুর্ঘটনার শিকার হলো বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। দুর্ঘটনাকবলিত উড়োজাহাজটি ২০১৩ সালে প্রথম আকাশে ওড়ে এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে এয়ার ইন্ডিয়ার বহরে যুক্ত হয়।
দুর্ঘটনার পর পরই বন্ধ করে দেওয়া হয় আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের সব কার্যক্রম। কিছু সময় পর ধীরে ধীরে সীমিত আকারে চালু করা হয় কার্যক্রম। বিমানবন্দরটি পরিচালনা করে আদানি গ্রুপ।
এই দুর্ঘটনার আগে ভারতে সর্বশেষ বড় বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০২০ সালে। তখন এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান দক্ষিণ ভারতের একটি পাহাড়ি রানওয়ে অতিক্রম করে খাদে পড়ে যায় এবং প্রাণ হারান ২১ জন।
প্রসঙ্গত, সরকারি মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়াকে ২০২২ সালে কিনে নেয় ভারতের টাটা গ্রুপ। এরপর ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় তৈরি হয় ‘ভিস্তারা’।